মাহমুদ বাদশার সভাপণ্ডিত ‘ভারতবর্ষ’ পুস্তকের (প্রাচীন তথা অর্ধার্বাচীন ভারতের বহুমুখী কার্যকলাপ, চিন্তা, অনুভূতির সঙ্গে যাঁরা পরিচিত হতে চান তাঁদের পক্ষে এ পুস্তক অপরিহার্য; বস্তুত বর্তমান লেখক ব্যক্তিগতভাবে এ পুস্তককে মহাভারতের পরেই স্থান দেয়) লেখক পণ্ডিত অল-বিরুনি মুক্তকণ্ঠে বলেছেন, ‘দর্শনের চর্চা করেছেন গ্রিক এবং ভারতীয়েরা– আমরা (অর্থাৎ আরবি লেখকেরা) যেটুকু দর্শন শিখেছি তা এঁদের কাছ থেকেই।’ কথাটা মোটামুটি সত্য, যদিও পণ্ডিতজনসুলভ কিঞ্চিৎ বিনয় প্রকাশ এতে রয়েছে, কারণ আরবরা গ্রিকদর্শনের আরবি অনুবাদ দিয়ে দর্শন-চর্চা আরম্ভ করেছিলেন সত্য কিন্তু পরবর্তী যুগে আভিচেন্না (বু আলি সিনা), আভেরস (আবু রুশদ) ও গজজালি (অল-গাজেল– এঁর ‘সৌভাগ্য স্পর্শমণি’ প্রায় পঞ্চাশ বৎসর পূর্বে বাঙলায় অনূদিত হয়ে রাজশাহীতে প্রকাশিত হয়) বহু মৌলিক চিন্তা দ্বারা পৃথিবীর দর্শনভাণ্ডার সমৃদ্ধ করতে সক্ষম হয়েছিলেন। কিন্তু স্মরণ রাখা ভালো, এঁদের দর্শন শঙ্কর-দর্শনেরই ন্যায় ধর্মাশ্রিত এবং যে-স্থলে কুরানের বাণীর সঙ্গে গ্রিকদর্শনের দ্বন্দ বেঁধেছে সেখানে তারা আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন সে দ্বন্দ্বের সমাধান করার এবং সময়ে সময়ে তখন তারা নিও-প্লাতোনিজম অর্থাৎ ভারতের উপনিষদসম্মত অন্তর্দৃষ্টির ওপর নির্ভর করেছেন। এদের বিশেষ নাম ‘মুতকল্লিমুন’ এবং পরবর্তী যুগে এদেশের রাজা রামমোহন তাঁর বিশ্বদর্শন (ভেল্টানশাউউঙ) নির্মাণে এঁদের পরিপূর্ণ সাহায্য নিয়েছেন।
(৪) ঐতিহাসিক ও কবিগোষ্ঠী। ইতিহাস-চর্চায় আরবদের দক্ষতা সর্বজনমান্য, তবে ইরানিরাও এ শাস্ত্র তাঁদের কাছ থেকে শিখে নিয়ে এর অনেক উন্নতিসাধন করেন। কিন্তু আমরা যে যুগের আলোচনা করছি তখনও ইরানিদের কাছে ইতিহাস ও পুরাণের পার্থক্য সুস্পষ্টরূপে ধরা দেয়নি। ফিরদৌসির শাহনামা (রাজবংশ) কাব্যের রাজা-মহারাজা, নায়ক-নায়িকারা অধিকাংশই কবিজনসুলভ কল্পনাপ্রসূত অন্তত তাদের কীর্তিকলাপ তো বটেই। কিন্তু সবচেয়ে লক্ষ করার বিষয়, প্রাক ইসলামি এইসব অগ্নিউপাসক নায়ক-নায়িকাদের নিয়ে ফিরদৌসির কী গগনচুম্বী গরিমা দম্ভ এবং সময় সময় আস্ফালন। এ যেন বিজয়ী আরবদের বারবার শুনিয়ে শুনিয়ে বলা, ‘কালনেমির বিরূপাবর্তনে আজ আমাদের পতন ঘটেছে বটে, কিন্তু এই কাব্যে দেখ, আমরা একদিন সভ্যতার কত উচ্চ শিখরে উঠেছিলুম। সে দিকে একবার ভালো করে তাকিয়ে দেখো। ওখানে তোমরা কখনও পৌঁছওনি, পৌঁছবেও না।’ এ সুর কেমন যেন আমাদের চেনা চেনা মনে হয়। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে হিন্দু এবং মুসলমান উভয়েই ইংরেজকে শুনিয়ে বারবার এই গান গেয়েছে। (‘অন্য জাতি দিশ্বসন পরিত যখন। ভারতে ঋগ্বেদ পাঠ হইত তখন’) কিন্তু, আফসোস। শাহনামার মতো মহাকাব্যের মাধ্যমে প্রকাশ করতে পারেনি। হেমচন্দ্র ও ইকবালকে ফিরদৌসির আসনে বসানো কঠিন এবং অন্যান্য কবিরা যে ‘নির্লজ্জতা’ দেখালেন (‘নির্লজ্জতা’ শব্দটি ভেবেচিন্তেই কোটেশনের ভিতর ফেললুম, কারণ কাব্যে রসস্বরূপে প্রকাশ পেলে চরম নির্লজ্জতাও পাঠকের মনে বিদ্রোহ সঞ্চার করতে পারে না। আমাদের দুই মাইডিয়ার হিরো পবননন্দন ভীমসেন ও হনুমান যেসব দম্ভ এবং আস্ফালন করেছেন তা স্বকর্ণে শুনতে হলে ‘রাম রাম’ বলতে হত, কিন্তু কাব্যে পাঠ করে আনন্দাশ্রু বিগলিত হয়, মনে হয়, ওই সময়ে, ওই অবস্থায় এ বাক্য ছাড়া অন্য কিছুই এদের মুখে মানাত না, বলতে ইচ্ছে করে, ‘ধন্য ধন্য যুগ্ম-কবি যাঁরা দম্ভকে বিনয়, লজ্জাকে শ্লাঘায় পরিণত করতে পারেন!’) সেটা ঢাকবার প্রয়াস আজও ইরানে-তুরানে সহজেই চোখে পড়ে। সকলেই জানেন, মুসলমান ধর্মে মদ খাওয়া মানা আর সেই মদও যদি খাওয়া হয় তন্বঙ্গী তরুণী সাকির সঙ্গে– যার সঙ্গে ‘বে-থা’ হয়েছে কি না সে সম্বন্ধেও কবিরা বড় মারাত্মক স্মৃতিশক্তিহীন– তায় আবার ঝরনাতলায়, নির্জনে, সাঁঝের ঝোঁকে, যখন কি না ‘মগরিবের আইন ওকতে’ নামাজ পড়ার কথা, আল্লা-রসুলের নাম স্মরণ করার আদেশ– এবং মনে মনে আওড়ানো,
‘মত্ত, মাতাল ব্যসনী আমি গো আমি কটাক্ষ বীর’
তা হলে অবস্থাটা কী রকমের হয়?
কথা সত্য, মোল্লারা সুবো-শাম ভালো ভালো কেতাবপুঁথি পড়েন, কিন্তু মাঝে-মধ্যে, নিতান্ত কালে-কম্মিনে দু একখানা কাব্যগ্রন্থের পাতাও তো তারা ওলটান। কবি হাফিজ অবশ্য বিস্তর ঢলাঢলির পর ওকিবহাল হয়ে অভয়বাণী বলেছিলেন,
‘মোল্লার কাছে কোরো না কিন্তু মোর পিছে অনুযোগ,
তারো আছে, জেনো, আমারি মতন, সুরামত্ততা রোগ।’
তবু, একথাও তো অজানা নয় যে, মোল্লারাই নীতিবাগীশ সাজে আর পাঁচজনের তুলনায় বেশি।
এবং কার্যত দেখা গেল তারা এবং তাদের চেলাচামুণ্ডার দল ঝোপে-ঝাপে বসে আছে, শরাব-কবাব জান-কি-সাকি সুদ্ধ কবিদের বমাল গ্রেপ্তার করার জন্য।
কবিরা এবং বিশেষ করে আমাদের মতো তাঁদের গুণগ্রাহীরা, উচ্চকণ্ঠে তখন বললেন, এসব কবিতা রূপকে নিতে হয়। মদ্য অর্থ ভগবদ্প্রেম, সাকি অর্থ যিনি সে প্রেম আমাদের কাছে পৌঁছিয়ে দেন, অর্থাৎ পীর, গুরু, মুরশিদ, পয়গম্বর। এবং এ বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই যে, হাফিজ, আত্তার, এমনকি ওমর খৈয়ামের বহু কবিতার কোনও অর্থই করা যায় না, যদি সেগুলো রূপক দিয়ে অর্থ না করা যায়। কিন্তু বাদবাকিগুলো?
