গ্রিস-রোমের কাছে পরাজিত হওয়া এক কথা, আর প্রতিবেশী ‘অনুন্নত’, ‘অর্ধসভ্য’ আরবদের কাছে পরাজিত হওয়া আরেক কথা। তদুপরি গ্রিক-রোমানরা ইরানে যে সভ্যতা এনেছিল, তাতে গরিব-দুঃখীর জন্য নতুন কোনও আশার বাণী ছিল না। যে নবীন ধনবণ্টন পদ্ধতি দ্বারা হজরত মুহম্মদ আরব দেশের আপামর জনসাধারণকে ঐক্যসূত্রে গ্রন্থন করতে সক্ষম হয়েছিলেন, তাঁর বাণী এসে পৌঁছল ইরানে। ফলে মুহম্মদ সাহেবের পরবর্তীগণ যখন একদিন অন্যান্য জাতির মতো দিগ্বিজয়ে বেরোল তখন ইরানি শোষক সম্প্রদায় দেখে মর্মাহত ও স্তম্ভিত হল যে, ইরানের জনসাধারণ আরবের বিরুদ্ধে তাদের সংগ্রামে ঐক্যবদ্ধ হল না। তার পর আরবরা বিজিত দেশের ধর্মজগতে যে সাম্যবাদ ও অর্থের ক্ষেত্রে যে ধনবণ্টন পদ্ধতি প্রচার করল, তাতে আকৃষ্ট হয়ে ইরানের জনসাধারণ মুসলমান হয়ে গেল। জ্ঞানাভিমানী ও ধর্মযাজক সম্প্রদায়ও শেষপর্যন্ত ওই ধর্ম গ্রহণ করল। তখনকার মতো ইরানি সভ্যতা-সংস্কৃতি প্রায় লোপ পেয়ে গেল।
কিন্তু বিদ্রোহ লুপ্ত হল না।
সেটা দেখা দিল প্রায় চার শ বছর পরে ফিরদৌসির মহাকাব্য ‘শাহনামা’তে। রাষ্ট্রভাষা আরবিকে উপেক্ষা করে ফিরদৌসি গাইলেন প্রাক্-মুসলিম যুগের ইরানি বীরের কাহিনী, রাজার দিগ্বিজয়, প্রেমিকের বিরহ-মিলন গাথা– নবীন অথচ সনাতন সেই ফারসি ভাষায়। যে ফারসি কাব্য-সাহিত্য পরবর্তী যুগে বিশ্বজনের বিস্ময় সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়, তার প্রথম সার্থক কবি ফিরদৌসি।
এই নতুন ভাষাতে, নবীন প্রাণে উন্মত্ত হয়ে যেসব কবি কাব্যের সর্ব-বিষয়বস্তু নিয়ে নব নব কাব্যধারার প্রবর্তন করলেন তার কাছে প্রবর্তী যুগের ইউরোপীয় রেনেসাঁসও এতখানি সর্বমুখী বলে মনে হয় না। দু শো বছর যেতে-না-যেতেই বিশ্বের কাব্যজগতে ইরান তার অদ্বিতীয় আসন সৃষ্টি করে নিল।
এঁদের মধ্যে সত্য বিদ্রোহী কবি ওমর খৈয়াম।
***
ইরানে ইসলাম প্রচারিত হওয়ার ফলে শিক্ষিত তথা পুরোহিত সম্প্রদায়ের ভিতর বিভিন্ন আন্দোলনের সৃষ্টি হল। তার প্রথম :
(১) যাঁরা মুসলিম শাস্ত্রের চর্চা করে যশস্বী হলেন। ভাবলে আশ্চর্য বোধহয়, ইরানিরা আরবির মতো কঠিন ভাষা আয়ত্ত করে সে শাস্ত্রে এতখানি ব্যুৎপত্তি অর্জন করল কী করে? মুসলমানদের মনুর নাম ইমাম আবু হানিফা। পৃথিবীর শতকরা আশিজনেরও বেশি মুসলমান আজ নিজকে হানফি অর্থাৎ আবু হানিফার মতবাদে বিশ্বাসকারী বলে পরিচয় দেয়। কিন্তু তাতে আশ্চর্য হবার মতো কীই-বা আছে? শ্ৰীশ্ৰীশঙ্করাচার্য তো শুনেছি ভারতবর্ষের দক্ষিণতম কোণের লোক, এবং তাঁর ধমনীতে যে অত্যধিক আর্যরক্ত ছিল তা-ও তো মনে হয় না, অন্তত একথা তো অনায়াসে বলা যেতে পারে যে, আর্য-উত্তর ভারতের তুলনায় মালাবারে সংস্কৃত-চর্চা ছিল অনেক কম। তবু যে তিনি শুধু তাঁর মাতৃভূমি মালাবারে বৌদ্ধদের পরাস্ত করতে সক্ষম হয়েছিলেন তাই নয়, আর্য উত্তর-ভারতেও তিনি তার বিজয়পতাকা উড্ডীয়মান করতে সক্ষম হয়েছিলেন। ইরানি আবু হানিফার মতবাদও একদা ইসলামের জন্মভূমি মক্কা-মদিনা তথা আরব দেশ জয় করতে সক্ষম হয়েছিল। এরকম উদাহরণ পৃথিবীতে আরও আছে।
(২) যারা ক্রিয়াকাণ্ড, টীকা-টিপ্পনী, মন্ত্রতন্ত্রে সম্পূর্ণ আস্থা না দিতে পেরে ‘রহস্যবাদ’ বা সুফিতত্ত্বের প্রচার এবং প্রসার করতে লাগলেন; এঁরা ভগবানের আরাধনা করেন রসের মাধ্যমে এবং বাঙলার বৈষ্ণব তথা ‘মরমিয়া’দের সঙ্গে এঁদের তুলনা করা যেতে পারে।
মরম না জানে ধরম বাখানে
এমন আছয়ে যারা
কাজ নাই, সখী তাঁদের কথায়
বাহিরে থাকেন তারা।
***
ওই চাহনিতে বিশ্ব মজেছে
পড়িয়াছে কত অশ্রুধার
পাগল করলি এ প্রমত্ত আঁখি
কুলমান রাখা হৈল ভার।
এ ধরনের কবিতা সুফি ও বৈষ্ণবদের ভিতর এতই প্রচলিত যে, কোনটি সুফি কোনটা বৈষ্ণব ধরে ওঠা অসম্ভব। যদি বলি,
প্রেম নাই, প্রিয় লাভ আশা করি মনে
রাধিকার মতো ভ্রান্ত কে ভব-ভবনে।
তবে চট করে কেউ আপত্তি করবেন না। অথচ আসলে আছে,
প্রেম নাই, প্রিয় লাভ আশা করি মনে
হাফেজের মতো ভ্রান্ত কে ভব-ভবনে।
(‘সদ্ভাব-শতক’– কৃষ্ণচন্দ্র মজুমদারের অনুবাদ)
বৈষ্ণবদের সঙ্গে এঁদের আরও বহু মিল আছে। এঁদের সুফিবাদ পরবর্তী যুগে তথাকথিত ‘তুর্কি’রা গ্রহণ করে। বাঙলা দেশে প্রথম যে মুসলমানরা আসেন তাঁদের আমরা ‘তুর্ক’, ‘তুরুক’ নাম দিই (প্রাচীন বাঙলায় ‘মুসলমান’ শব্দের প্রতিশব্দ ‘তুর্ক’,– তামিলে এখনও ‘তুরস্কম’) এবং তাঁদের চক্রাকারে নৃত্য করে আল্লার নাম জপ (‘জিকর’–যার থেকে বাঙলা ‘জিগির’ শব্দ এসেছে) করা দেখে ‘তুর্কি-নাচন-নাচা’ প্রবাদটি এসেছে। বৈষ্ণবদের মতো এঁরাও জপ করতে করতে ‘হাল’ (‘দশা’) প্রাপ্ত হন– অর্থাৎ অজ্ঞান হয়ে পড়েন, ও মুখ দিয়ে তখন প্রচুর ফেনা বেরোয়। পূর্ব ইয়োরোপে এই নাচ দেখে ইয়োরোপীয়রা এদের নাম দিয়েছিল ‘ডানসিং দরবেশ’। ইংরেজিতে কথাটা এখনও চালু আছে। কিন্তু এ সম্বন্ধে অত্যধিক বাগাড়ম্বর নিষ্প্রয়োজন, কারণ আউল-বাউল, ভাটিয়ালি-মুর্শিদিয়া গীত যাঁরাই শুনেছেন, তাঁরাই এই ফারসি, সুফি ভক্তিবাদের কিঞ্চিৎ গন্ধস্পর্শ পেয়েছেন।
(৩) দার্শনিক সম্প্রদায়। আর্যগোষ্ঠীর দুই সম্প্রদায় ভারতীয় ও গ্রিকরাই প্রধানত দর্শনের চর্চা করেছেন।
