তদুপরি নজরুল ইসলাম স্কুলে সুবোধ বালকের মতো যে খুব বেশি আরবি-ফারসি চর্চা করেছিলেন তা-ও মনে হয় না। স্কুলে তিনি আদৌ ফারসি (আরবির সম্ভাবনা নগণ্য) অধ্যয়ন করেছিলেন কি না, সে সম্বন্ধেও আমরা বিশেষ কিছু জানিনে। শ্রীযুক্ত শৈলজানন্দ নিশ্চয়ই অনেক কিছু বলতে পারবেন।
তারো পরে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে যোগ দেওয়ার ফলে তিনি যে এসব ভাষায় খুব বেশি এগিয়ে গিয়েছিলেন তা-ও তো মনে হয় না। পল্টনের হাবিলদার যে জাব্বা-জোব্বা পরে দেওয়ানা-দেওয়ানা ভাব ধরে হাফিজ-সাদির কাব্য কিংবা মৌলানা রুমির মসনবি সামনে। নিয়ে কুঞ্জে কুঞ্জে ছন্নছাড়ার মতো ঘুরে বেড়াবে তা-ও তো মনে হয় না। এমনকি রঙিন সদরিয়ার উপর মলমলের বুটিদার অঙ্গরখা পরে হাতে শিরাজির পাত্র নিয়ে সাকির কণ্ঠে ফারসি গজল আর কসিদা-গীত শুনছেন, এ-ও খুব সম্ভবপর বলে মনে হয় না। কসম খেয়ে এ বিষয়ে কোনওকিছু বলা শক্ত, তবে এটা তো স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি যে, কাব্যে যদ্যপি ‘খাকি’ এবং ‘সাকি’ চমৎকার মিল, তবু বাস্তব জীবনে এ দুটোর মিল এবং মিলন সচরাচর হয় না।
তবু নজরুল ইসলাম মুসলিম ভদ্রঘরের সন্তান। ছেলেবেলায় নিশ্চয়ই কিঞ্চিৎ আলিফ, বে, তে করেছেন, দোয়া-দরুদ (মন্ত্র-তন্ত্র) মুখস্থ করেছেন, কুরান পড়াটা রপ্ত করেছেন। পরবর্তী যুগে তিনি কুরানের শেষ অনুচ্ছেদ ‘আমপারা’ বাঙলা ছন্দে অনুবাদ করেন- হালে সেটি প্রকাশিত হয়েছে। সে পুস্তিকাতে তাঁর গভীর আরবি-জ্ঞান ধরা পড়ে না– ধরা পড়ে তার কবি-জনোচিত অন্তর্দৃষ্টি এবং আমপারার সঙ্গে তাঁর যে আবাল্য পরিচয়। বিশেষ করে ধরা পড়ে, দরদ দিয়ে সৃষ্টিকর্তার বাণী (আল্লার ‘কালাম’) হৃদয়ঙ্গম করার তীক্ষ্ণ এবং সূক্ষ্ম প্রচেষ্টা।
এরই ওপর আমি বিশেষ করে জোর দিতে চাই। ফারসি তিনি বহু মোল্লা-মৌলবির চেয়ে কম জানতেন, কিন্তু ফারসি কাব্যের রসাস্বাদন তিনি করেছেন তাদের চেয়ে অনেক বেশি। রবীন্দ্রনাথ নিশ্চয়ই অনেক সংস্কৃত ব্যাকরণবাগীশদের চেয়ে কম সংস্কৃত জানতেন, কিন্তু তিনি লিরিকের রাজা মেঘদূতখানা জীবন এবং কাব্য দিয়ে যতখানি গ্রহণ করতে পেরেছিলেন ততখানি কি কোনও পণ্ডিত পেরেছেন? বহু লোকই বাঙলা দেশের মাটি নিখুঁতভাবে জরিপ করেছে, কিন্তু ওই মাটির জন্য প্রাণ তো তারা দেয়নি। কানাইলাল, ক্ষুদিরাম ভালো জরিপ জানতেন একথাও তো কখনও শুনিনি।
কাজী রোমান্টিক কবি। বাঙলা দেশের জল-বাতাস, বাঁশ-ঘাস যেরকম তাঁকে বাস্তব থেকে স্বপ্নলোকে নিয়ে যেত, ঠিক তেমনি ইরান-তুরানের স্বপ্নভূমিকে তিনি বাস্তবে রূপান্তরিত করতে চেয়েছিলেন বাঙলা কাব্যে। ইরানে তিনি কখনও যাননি, সুযোগ পেলেই যে যেতেন, সেকথাও নিঃসংশয়ে বলা যায় না (শুনেছি, পণ্ডিত হয়েও মাক্সমুলার ভারতবর্ষকে ভালোবাসতেন এবং তাই বহুবার সুযোগ পেয়েও এদেশে আসতে রাজি হননি। কিন্তু ইরানের গুল-বুলবুল, শিরাজি-সাকি তাঁর চতুর্দিকে এমনই এক জানা-অজানার ভুবন সৃষ্টি করে রেখেছিলেন যে গাইড-বুক, টাইম-টেবিল ছাড়াও তিনি তার সর্বত্র অনায়াসে বিচরণ করতে পারতেন। গুণীরা বলেন, প্রত্যেক মানুষেরই দুটি করে মাতৃভূমি– একটি তাঁর আপন জন্মভূমি ও দ্বিতীয়টি প্যারিস। কাজীর বেলা বাঙলা ও ইরান। কিটস-বায়রনের বেলা যেরকম ইংল্যান্ড ও গ্রিস।
আরবভূমির সঙ্গে কাজী সায়েবের যেটুকু পরিচয়, সেটুকু প্রধানত ইরানের মারফতেই। কুরান শরিফের ‘হারানো ইউসুফের’ যে করুণ কাহিনী বহু মুসলিম-অমুসলিমের চোখে জল টেনে এনেছে তিনি কবিরূপে তার সঙ্গে পরিচিত হয়েছেন ফারসি কাব্যের মারফতে।
দুঃখ করো না, হারানো য়ুসুফ
কাননে আবার আসিবে ফিরে।
দলিত শুষ্ক এ-মরু পুনঃ
হয়ে গুলিস্তাঁ হাসিবে ধীরে ॥
ইউসুফে গুমগশতে বা’জ আয়দব কিনান
গম্ ম-খুর।
কুলবয়ে ইহজান শওদ রুজি গুলিস্তান
গম, ম-খুর ॥
কাজী সায়েবের প্রথম যৌবনের রচনা এই ফারসি কবিতাটির বাঙলা অনুবাদ অনেকেরই মনে থাকতে পারে। ‘মেবার পাহাড়, মেবার পাহাড়ে’র অনুকরণে ‘শাতিল আরব শাতিল আরব’ ওই যুগেরই অনুবাদ।
কোনও কোনও মুসলমান তখন মনে মনে উল্লসিত হয়েছেন এই ভেবে যে, কাজী ‘বিদ্রোহী’ লিখুন আর যা-ই করুন, ভিতরে ভিতরে তিনি খাঁটি মুসলমান। কোনও কোনও হিন্দুর মনেও ভয় হয়েছিল (যাঁরা তাঁকে অন্তরঙ্গভাবে চিনতেন তাঁদের কথা হচ্ছে না) যে কাজীর হৃদয়ের গভীরতম অনুভূতি বোধহয় বাঙলার জন্য নয়–তাঁর দরদ বুঝি ইরান-তুরানের জন্য। পরবর্তী যুগে–পরবর্তী যুগে কেন, ওই সময়েই কবিকে যাঁরা ভালো করে চিনতেন, তাঁরাই জানতেন, ইরানি সাকির গলায় কবি যে বারবার শিউলির মালা পরিয়ে দিচ্ছেন তার কারণ সে তরুণী মুসলমানি বলে নয়, সে সুন্দরী ইরানের বিদ্রোহী কবিদের নর্ম-সহচরী বলে–ইরানের বিদ্রোহী আত্মা কাব্যরূপে, মধুরূপে তার চরম প্রকাশ পেয়েছে সাকির কল্পনায়।
সে বিদ্রোহ কিসের বিরুদ্ধে?
এস্থলে কিঞ্চিৎ ইতিহাস আলোচনার প্রয়োজন।
ইরানি ও ভারতীয় একই আর্যগোষ্ঠীর দুই শাখা। দুই জাতির ইতিহাসেই অনেকখানি মিল দেখতে পাওয়া যায়, কিন্তু ইরানিরা যেরকম দিগ্বিজয়ে বেরিয়ে একদিকে মিশর-প্যালেস্টাইন, অন্যদিকে গ্রিস পর্যন্ত হানা দিয়েছিল, ভারতীয়েরা সেরকম করেনি। দ্বিতীয়ত বিদেশি অভিযানের ফলে ইরানভূমি যেরকম একাধিকবার সম্পূর্ণ লণ্ডভণ্ড হয়েছে, ভারতবর্ষের ভাগ্যে তা কখনও ঘটেনি। এসব কারণেই হোক বা অন্য যেকোনো কারণেই হোক, ইরানিরা সভ্যতার প্রথম যুগ থেকেই সে এক উগ্র স্বাজাত্যাভিমানের সৃষ্টি করে। ভারতবর্ষ যেখানে শান্তভাবে বিদেশির ভালো-মন্দ দেখে-চিনে নিজেকে মেলাবার, পরকে আপন করার চেষ্টা করেছে, ইরান সেখানে আদৌ সে চেষ্টা করেনি এবং শেষটায় যখন বাধ্য হয়ে সবকিছু মেনে নিতে হয়েছে তখন করেছে পরবর্তীকালে, তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ।
