সৈয়দ-লোদি বংশদ্বয়ের অর্থ ও প্রতিপত্তি দুই-ই ছিল সামান্য। তাই এঁদের কলা-প্রচেষ্টা ছোট ইমারতের আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছিল। ওদিকে ইরান-তুরানের সঙ্গে যোগসূত্র ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল বলে সে-দিক থেকে নব নব অনুপ্রেরণাও আসছিল না। ফলে তাদের স্থাপত্যে হিন্দুপ্রাধান্য বেশি এবং ছোট ইমারতে অলঙ্কারের প্রয়োজন বড় ইমারতের চেয়ে বেশি। কম্পজিশনেও এই প্রথম হিন্দুপ্রভাব স্পষ্ট হয়ে এল। বস্তুত এই আটকোণওলা ইমারত এবং আটদিকের ঘেরা বারান্দা বৌদ্ধস্তূপ এবং তার প্রদক্ষিণচক্রের কথাই মনে করিয়ে দেয়। হিন্দুরা স্তম্ভ-নির্মাণে চিরকালই দক্ষ, ছত্রিও তাদেরই সৃষ্টি। হিন্দু ছজ্জা (ড্রিপস্টোন এগিয়ে আসা কার্নিসের মতো) ছাতের বৃষ্টি ছড়িয়ে দেবার জন্য এদেশে প্রয়োজন–ইরানে দরকার নেই বললেও চলে– সে-সব এসে এখানে ইমারতের সৌন্দর্য বাড়িয়েছে। তুগলুক প্রভাব এখানে অতি সামান্য কেবলমাত্র ট্যারচা স্তম্ভে কিছুটা পাওয়া যায়। সৈয়দ-লোদি স্থাপত্য দেখে মানুষ হতবাক হয় না সত্য, কিন্তু এর এমন একটা কমপেক্টনেস বা ঠাস-বুনুনি আছে যা অন্য স্থাপত্যে বিরল। অল্প দিয়ে রসসৃষ্টিতে সৈয়দ-লোদি প্রথম না হলেও প্রধানদের একজন।
মোগল-যুগ আরম্ভ হল হুমায়ুনের কবর দিয়ে। সেখানে ইরান-তুরানের প্রাধান্য। কিন্তু ছবি এবং পদ্মফুলের ডিজাইন এখানে প্রচুর এবং কারুকার্যেও হিন্দুপ্রাধান্য বেশি। কিন্তু এতে ইরানি ভাব এত কমে গিয়েছে যে, কোনও কোনও ইমারতে কার প্রাধান্য বেশি কিছুতেই স্থির করা যায় না। সেকেন্দ্রার গম্বুজ শেষ করার পূর্বেই আকবর ইহলোক ত্যাগ করেন– তাই বলা শক্ত সম্পূর্ণ সমাধি মনে রসের কোন ভাবের উদয় করে দিত। দিওয়ান-ই-খাস্ ও আম্ যে অলঙ্কারের চূড়ান্তে পৌঁছে গিয়েছে সে সত্য তো পৃথিবীর সবাই স্বীকার করে নিয়েছে। এতদিন বলা হত, পাঠান স্থাপত্যে স্থপতি ও স্বর্ণকার একজোটে কাজ করেছেন। দিওয়ান-ই-খাস ও আম দেখে লোকে বলল, এইবারে এসে জহুরিও যোগ দিয়েছেন। মোগল-কলা এত বিচিত্র ও ভিন্নমুখী যে, তাকে গুটিকয়েক সূত্রে ফেলা প্রায় অসম্ভব। তবে স্থাপত্যের বিকাশ দেখতে হলে সবচেয়ে উত্তম পন্থা হুমায়ুনের কবর ও তাজ দুটি মিলিয়ে দেখা। দুটোর গম্বুজ মিলিয়ে দেখুন, ছত্রিগুলো কার ভালো (এখানে বলা উচিত হুমায়ুনের ছত্রিগুলো নীল টাইলে ঢাকা ছিল; এখন উঠে গিয়ে কালো হয়ে গিয়েছে– তাই আগে ছিল গম্বুজ মর্মরের সাদা, পুরো ইমারত লাল পাথরের আর ছত্রিগুলোর গম্বুজ নীল; তাজে তিনই মার্বেলের); হুমায়ুনের ভিত্তিতে এক সার আর্চ (তার ভিতর দিয়ে নিচে যাওয়া যায়), তাজে তার ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে মাত্র; গুলদন্তাজ (মিনারিকারও ছোট মিনারিকা যার শেষ হয় অধস্কুট পদ্মকোরকে) দুই ইমারতেই একরকম; নির্মাণকালে হুমায়ুনে ছিল লাল-সাদা-নীলের সামঞ্জস্য, তাজ শুভ্র-ধবল এবং সবচেয়ে বড় পার্থক্য– হুমায়ুনে মিনারিকা নেই, তাজের চার কোণে চারটি। আপনার কোনটি ভালো লাগে? আর এই শৈলীর অধঃপতন দেখতে হলে দেখুন সফদরজঙ্গের কবর ওয়েলিংডন অ্যারোড্রামের কাছে।
স্পষ্ট দেখছি হুমায়ুনে দার্ঢ্য, তাজে মাধুর্য।
তার কারণ, অনেক ভেবে আমি মন স্থির করেছি, হুমায়ুনের সমাধি নির্মাণ করেছেন তার বিধবা স্বামীর জন্য। তাই তাতে পৌরুষ সমধিক। তাজ নির্মাণ করেছেন বিরহকাতর স্বামী– প্রিয়ার জন্য। তাই সেটিতে লালিত্য বেশি।
————
১. ‘আধেক ঘুমে নয়ন চুমে’ গানটি সার্থক, এবং এই নীতির প্রকৃষ্টতম উদাহরণ।
২. ‘তুলসীর মূলে যেন সুবর্ণ দেউটি উজলিল দশ দিক’– এবং পিকবরবর নব-পল্লব মাঝারে দুটিই সার্থক। প্রথমটিতে অলঙ্কার নেই। অলঙ্কারের বাড়াবাড়ি হলে কাব্য দুর্বল হয়ে পড়ে। মেঘদূতের তুলনায় যেরকম গীত-গোবিন্দ।
৩, ৪. ‘দৃষ্টিপাতে’ উল্লিখিত ‘দিল্লি দূর অস্ত’ কাহিনীর নায়কদ্বয়। গিয়াসের ছেলে ‘পাগলা’ রাজা মহম্মদ তুগলুকের তৈরি ‘আদিলাবাদ’-এর ভগ্নাবশেষে বিশেষ কিছু দেখবার নেই। মুহম্মদ এবং নিজামউদ্দিনের মিত্র কবি-ম্রাট আমির খুসরৌ (দেব-দেবীর প্রেমের কাহিনী ইনিই প্রথম ফারসিতে লেখেন) এবং প্রসিদ্ধ ঐতিহাসিক জিয়াউদ্দিন বরনির কবর নিজামউদ্দিনের দরগার ভিতর।
৫. ইলতুতমিশের কন্যা সম্রাজ্ঞী রিজিয়ার যে কবর দিল্লিতে আছে সেটি সম্বন্ধে ঐতিহাসিকেরা সন্দেহ প্রকাশ করেন।
৬. গেল শতকের গোড়ার দিকে এক ইংরেজ মেজরের হাতে কুতুবের মেরামতির ভার পড়ে। ব্যালকনি (গ্যালারির) রেলিঙগুলো ছিল বলে তিনি সেখানে চারপাপড়ির নিজস্ব নকশা দিয়ে রেলিঙ বানান নিচের হানিকুম্ অর্থাৎ মৌমাছির চাকের নকশা মূল স্থপতির এবং মাথায় নিজস্ব কল্পনাপ্রসূত একটা মুকুট পরান। সেইটে দেখে দিল্লি-ওলারা সত্রাসে তারস্বরে চিৎকার করেছিল। বহু বৎসর পরে লর্ড কার্জন সেই মুণ্ডটি কেটে নিচে নামিয়ে দূরে সরিয়ে রাখেন।
৭. অক্টরলনি মনুমেন্টে কোনো কলাপ্রচেষ্টা নেই বলে সেটাকে কুতুবের সঙ্গে তুলনা করা অন্যায়– সেটাকে চটকলের চোঙার সঙ্গে তুলনা করা যায়। বড়বাজারের দালানকোঠার সঙ্গে কেউ তাজের। তুলনা করে না।
৮, ইঞ্জিনিয়ারিঙ স্থাপত্যের অংশ বটে কিন্তু বিশুদ্ধ স্থাপত্য-রস আস্বাদনের সময় তার স্থান অতি নিচে। আর্চ, ডোম বানাতে ‘কি-স্টোন’ ইত্যাদি ইঞ্জিনিয়ারি ব্যাপার পাঠক চেম্বার অভিধান দেখেই বুঝে নিতে পারবেন। এসব স্থাপত্যের পশ্চাতে কী অদ্ভুত ইঞ্জিনিয়ারিং স্কিল আছে তার আলোচনা আমি আদপেই করিনি। যেমন, কুতুবের আসল কেরামতি যে এত অল্প গোড়া (বেস্) নিয়ে এত উঁচু মিনার আর কোথাও হয়নি। অদ্ভুত ভারসাম্যই (ব্যালান্স) তার কারণ। এ যেন বাজিকর হাতের আঙুলের ডগায় বিশগজি বাঁশ খাড়া করে রেখেছে। ইঞ্জিনিয়ারি হিসেবে কণামাত্র ভুল থাকলে কুতুব হুড়মুড়িয়ে পড়ে যেত।
নজরুল ইসলাম ও ওমর খৈয়াম
পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ, রাজমহল, শ্রীরামপুর, হুগলী এবং পরবর্তী যুগে কলকাতায় অনেকখানি আরবি-ফারসির চর্চা হয়েছিল বটে, কিন্তু গ্রামাঞ্চলে এ চর্চা খুব ছড়িয়ে পড়তে পারেনি। তার প্রধান কারণ অতি সরল– ইসলাম পশ্চিমবঙ্গের গ্রামাঞ্চলে পূর্ববাংলার মতো ছড়িয়ে পড়তে পারেনি, কাজেই অতি সহজেই অনুমান করা যায়, চুরুলিয়া অঞ্চলে পীর দরবেশদের কিঞ্চিৎ সমাগম হয়ে থাকলেও মৌলবি-মৌলানারা সেখানে আরবি-ফারসির বড় কেন্দ্র স্থাপনা করতে পারেননি।
