কিন্তু স্থাপত্যের বেলা সেটি হবার জো নেই। স্থাপত্য এমন হবে যে সেটাকে যেন সবদিক থেকে এবং বিশেষ করে যেকোনো দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায়। কোনও জায়গা থেকে যদি, ধরুন, মনে হয়, দুটো মিনার এক হয়ে গিয়ে কেমন যেন দেউড়িটাকে ঢেকে অপ্রিয়দর্শন করে তুলেছে তবে বুঝবেন স্থপতি আর্টের কোনও একটা সমস্যার ঠিক সমাধান করতে পারেননি বলেই এস্থলে তাল কেটেছেন, অর্থাৎ রসভঙ্গ করেছেন।
মসজিদ মাত্রেরই একটা খুঁত, ঠিক এই কারণে থেকে যায়। শাস্ত্রের হুকুম মসজিদের পশ্চিম দিক যেন বন্ধ থাকে, যাতে করে নমাজিদের সামনে কোনও বস্তু তার দৃষ্টিকে আকর্ষণ না-করতে পারে। ফলে বাধ্য হয়ে স্থপতিকে পশ্চিম দিকে দিতে হয় খাড়া পাঁচিল। এটার সঙ্গে আর বাদবাকি তিন দিক কিছুতেই খাপ খাওয়ানো যায় না বলে, মসজিদ শুধু তিন দিক থেকে দেখা যায়। ধর্মতলার টিপু সুলতানের মসজিদ কিছু উত্তম রসসৃষ্টি নয়– দক্ষিণি ঢঙের গম্বুজগুলোই যা দেখবার মতো কিন্তু পাঠক সেটাকে একবার প্রদক্ষিণ করলেই সমস্যাটা বুঝে যাবেন। দিল্লির পুরনো মসজিদে-মসজিদে পাঠক দেখবেন, স্থপতি কতরকম চেষ্টা করেছেন এই সমস্যা সমাধানের।
সমাধি, রাজপ্রাসাদ, বিজয়স্তম্ভ সম্বন্ধে শাস্ত্রের কোনও বাধাবন্ধক নেই। তাই সেগুলোতে এ অপরিপূর্ণতা থাকা মারাত্মক। সচরাচর থাকেও না।
পূর্বেই নিবেদন করেছি সার্থক স্থাপত্য যেকোনো জায়গাতে, যেকোনো দৃষ্টিবিন্দু থেকে দেখা যায়। কিন্তু তবু প্রশ্ন ওঠে, সবচেয়ে ভালো কোন জায়গা থেকে দেখা যায়? উচ্চাঙ্গ মোগলস্থাপত্য মাত্রেই স্থপতি এর নির্দেশ নিজেই দিয়ে গিয়েছেন। স্থাপত্যে পৌঁছবার। বেশকিছুটা আগে যে প্রধান তোরণদ্বার (দেউড়ি-গেটওয়ে) থাকে– এরই উপর নহবতখানা– তার ঠিক নিচে দাঁড়ালেই স্থাপত্যের পরিপূর্ণ সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারবেন। সাধারণত ছবি এ-জায়গা থেকেই ভালো ওঠে। আর যদি নিজের রসবোধ তার সঙ্গে সংযোজন করতে চান, তবে একটু পিছিয়ে গিয়ে দেউড়ির আচঁসুদ্ধ ছবি তুললে তাতে ইসথেটিক ইফেকট” আসবে– যদিও মূল স্থাপত্যের কিছুটা হয়তো তাতে করে কাটা পড়বে।
এ সম্বন্ধে আরও অনেক কিছু বলার আছে, কিন্তু আমার মনে হয় স্থাপত্য দেখার সঙ্গে সঙ্গে প্রসঙ্গত সে আলোচনা তোলাই সঙ্গত।
***
দিল্লির স্থাপত্য তার রাজবংশানুযায়ী ভাগ করা যায়।
॥১॥ দাস বংশ
কুতুব মিনার, কওতুল-ইসলাম মসজিদ, ইলতুতমিশের সমাধি। (কওওতুল-ইসলাম মসজিদের আঙিনায়– সেহন- চন্দ্ররাজা নির্মিত একটি শতকরা নিরানব্বই ভাগের লৌহস্তম্ভ আছে। এটি ও মসজিদের থামগুলো হিন্দুযুগের। –সবকটি কুতুবের গা ঘেঁষে।
॥ ২ ॥ খিলজি-বংশ
আলাউদ্দিন খিলজি নির্মিত ‘আলা-ই-দরওয়াজা’- কুতুবের গা ঘেঁষে। আলাউদ্দিন কিংবা তাঁর ছেলের (‘দেবল-দেবীর’ বল্লভ) তৈরি মসজিদ দিল্লি–মথুরা ট্রাঙ্ক রোডের উপর (নিউ দিল্লি থেকে মাইলখানেক) নিজামউদ্দিন আউলিয়ার(৩) দরগার ভিতর(৪)।
॥ ৩ ॥ তুগলুক-বংশ
গিয়াসউদ্দীন তুগলুক(৫) নির্মিত আপন সমাধি–-কুতুব থেকে মাইল তিনেক দূরে তাঁরই নির্মিত তুগলুকাবাদের সামনে। তুগলুকাবাদ।
ফিরোজ তুগলুক নির্মিত হাউজ খাস– দিল্লি থেকে কুতুব যাবার পথে রাস্তার ডানদিকে। ফিরোজ নির্মিত ফিরোজশাহ-কোটলা– দিল্লি এবং নয়াদিল্লির প্রায় মাঝখানে (অন্যান্য দ্রষ্টব্যের ভিতর এখানে আছে একটি অশোকস্তম্ভ; ফিরোজ এটাকে দিল্লিতে আনিয়ে উঁচু ইমারত বানিয়ে তার উপরে চড়ান)।
৪. সৈয়দ এবং লোদি-বংশ
লোদি গার্ডেনস নয়াদিল্লির লোদি এসটেটের গা ঘেঁষে– ভিতরে আছে, (ক) মুহম্মদ শাহ সৈয়দের কবর, (খ) সিকন্দর লোদির তৈরি মসজিদ এবং মসজিদের প্রবেশগৃহ, (গ) অজানা কবর এবং (ঘ) সিকন্দর লোদির কবর।
ইসা খানের কবর– হুমায়ুনের কবরের বাইরে। যদিও পরবর্তী যুগের, তবু লোদিশৈলীতে তৈরি।
॥ ৫॥ মোগল-বংশ
বাবুর কিছু তৈরি করার সময় পাননি। কেউ কেউ বলেন, পালম অ্যারপোর্টের সামনে যে দুর্গের মতো সরাই এটি তাঁর হুকুমে তৈরি। এতে দ্রষ্টব্য কিছুই নেই।
হুমায়ুনও এক পুরনো কিলা (ন্যাশনাল স্টেডিয়ামের পিছনে) ছাড়া কিছু করে যেতে পারেননি। পুরনো কেল্লারও কতখানি তার, কতখানি শের শা’র, বলা শক্ত। কেল্লার ভিতরে মসজিদটি কিন্তু শের শা’র তৈরি এবং এর শৈলী পাঠান-মোগল থেকে ভিন্ন। সাসারামে শেরের কবর সৈয়দ-লোদি শৈলীতে।
হুমায়ুনের বিধবার– আকবরের মাতার– তৈরি হুমায়ুনের কবর। নিজামউদ্দিন আউলিয়ার দরগার সামনে, দিল্লি-মথুরা রোডের ওপাশে।
আকবরের কীর্তি-কলা আগ্রাতে– সেকেন্দ্রা ফতহ্-পুর সিক্রি, আগ্রা দুর্গ। ওই সময়ে তৈরি দিল্লিতে আছে আৎকা খান, আজিজ কোকলতাশ, আব্দুর রহীম খান-খানা ও আদহম্ খানের কবর।
শাহাজাহান– দিল্লি দুর্গ বা লাল কিলা। তার-ই সামনে চাঁদনি চৌকের কাছে জাম-ই মসজিদ।
ঔরঙ্গজেব– লাল কিলার ভিতর মোতি মসজিদ।
ঔরঙ্গজেবের ভগ্নী রৌশনারার নিজের তৈরি সমাধি– রৌশনারা-গার্ডেনসের ভিতর।
ঐতিহাসিক মাত্রেই জানেন, ঔরঙ্গজেবের পরের বাদশাদের অর্থ ও প্রভাব দুই-ই কম ছিল বলে এঁরা প্রায় কিছুই করে যেতে পারেননি। যেটুকু আছে তাতে আলঙ্কারিক সৌন্দর্য যথেষ্ট বটে, কিন্তু স্থাপত্যের লক্ষণ প্রায় নেই– স্থপতি সে-চেষ্টা করেনওনি। এর ভিতর উল্লেখযোগ্য জাহানারা, মুহম্মদ শাহ বাদশাহ রঙ্গিলা, এবং দ্বিতীয় আকবরের (ইনি রাজা রামমোহনকে ‘রাজা’ উপাধি দিয়ে বিলেত পাঠিয়েছিলেন) কবর। তিনটিই নিজামউদ্দিনের দরগার ভিতরে। মোগল স্থাপত্যের ‘শেষ নিশ্বাস’ সফদর-জঙ্গের সমাধি ও তৎসংলগ্ন মসজিদ– কুলোকে বলে এটার মার্বেল আব্দুর রহীম খানখানার কবর থেকে চুরি করা। ইমারতটি যদিও অপেক্ষাকৃত বৃহৎ তবু তার সৌন্দর্য নিম্নশ্রেণির, রুচির বিলক্ষণ অধোগতি এতে স্পষ্ট ধরা পড়ে। ছবিতে হুমায়ুনের কবর, তাজমহল, এমনকি আকা খানের ছোট কবরটির সঙ্গে তুলনা করলেই পাঠক আমার বক্তব্য বুঝতে পারবেন। আকা খানের কবরটি আমার বড় প্রিয় স্থাপত্য। দিল্লির লোক এ কবরটির খবর রাখে না, কারণ এটি নিজামউদ্দিনের দরগার এক নিভৃত কোণে পড়ে আছে।
