তবু সবাই শুধায়, ‘তার পর?’
চাচা বললেন, ‘এ তো বড় গেরো। তোরা কি ক্লাইমেকস বুঝিসনে? আচ্ছা, বলছি। ভোর হতেই বোম্বাই পৌঁছলুম। ডেকে যাওয়া মাত্রই সবাই আমাকে জাবড়ে ধরে কেউ বলে ফেলিসিতাসিয়ো মসিয়ো, কেউ বলে কনগ্রাচুলেশনস, কেউ বলে গ্রাতুলিয়েরে দুচ্ছাই, এসব কী? কিন্তু কেউ কিচ্ছুটি বুঝিয়ে বলে না।’
শেষটায় ফরাসি উকিলটা বলল, “আ মসিয়ো, কী কেরানিটাই না দেখালে। ওস্তাদের মার শেষ রাতে। মহারাষ্ট্র-গুজরাত দু জনাই হার মানল। জিতল বেঙ্গল। ভিতল্য বাঁগাল! লং লিভ বেঙ্গল!”
আমি যতই আপত্তি করি কেউ কোনও কথা শোনে না।
আর শুধু কি তাই? ব্যাটারা সবাই আপন আপন বাজির টাকা ফেরত পেল- বেনে কিংবা মারাঠা কেউ জেতেনি বলে। কিন্তু আমার দশ শিলিং স্রেফ, বেপরোয়া, মেরে দিল। বলে কি না, আমি যখন ঘোড়ায় চড়ে জিতেছি, আমার বাজি ধরার হক্ক নেই। টাকাটা নাকি তছরূপ হয়ে যায়।’
খানিকক্ষণ চুপ থেকে চাচা বললেন, ‘কিন্তু সেই থেকে আমার চোখ বলে দিতে পারে ইটার্নেল ট্রায়েঙ্গেল কোথায়।’
এমন সময় সেই দুই জর্মন ছোকরায় লেগে গেল মারামারি। সেটা থামাতে গিয়ে আড্ডা সেদিন ভঙ্গ হল।
দিল্লি স্থাপত্য
যারা এই শীতে প্রথম দিল্লি যাচ্ছেন কিংবা যারা পূর্বে গিয়েছেন কিন্তু পাঠান মোগলদের দালান-কোঠা, এমারত-দৌলত দেখবার সুযোগ ভালো করে পাননি, এ লেখাটি তাদের জন্য। এবং বিশেষ করে তাঁদের জন্য যাঁদের স্থাপত্য দেখে অভ্যাস নেই বলে ওই রস থেকে বঞ্চিত। লেখাটিতে কিঞ্চিৎ ‘মাস্টারি মাস্টারি’ ভাব থেকে যাবে বলে গুণীজনকে আগের থেকেই হুঁশিয়ার করে দিচ্ছি তাঁরা যেন এটি না পড়েন।
কোনও কালে যে ব্যক্তি গান শোনেনি সে যদি হঠাৎ উচ্চাঙ্গসঙ্গীত শুনে উদ্বাহু হয়ে মৃত্য না করে তা হলে চট করে তাকে বেরসিক বলা অন্যায়। বাঙলা দেশে এখানে-ওখানে ছিটেফোঁটা স্থাপত্য আছে বটে, কিন্তু একই জায়গায় যথেষ্ট পরিমাণে নেই বলে স্থাপত্যের যে ক্রমবিকাশ এবং সামগ্রিক রূপ তার রস বুঝতে সাহায্য করে তার সম্পূর্ণ অভাব। বিচ্ছিন্নভাবে যে বিশেষ একটি মন্দির, মসজিদ বা সমাধি রসসৃষ্টি করতে পারে না, তা নয়। তাই তুলনা দিয়ে বলতে পারি, জগতের কোনও সাহিত্যের সঙ্গে যদি আপনার কিছুমাত্র পরিচয় না থাকে, তবে সাধারণত ধরে নেওয়া যেতে পারে যে উটকো একখানা ফরাসি উপন্যাসের রস আপনি গ্রহণ করতে পারবেন না। রসবোধের জন্য ঐতিহাসিক ক্ৰমবিকাশ-জ্ঞান অপরিহার্য কি না এ প্রশ্ন নন্দনশাস্ত্রের অন্যতম কঠিন প্রশ্ন। সে গোলকধাঁধার ভিতর একবার ঢুকলে আর দিল্লি যাবার পথ পাবেন না– আর ‘দিল্লি দূর অস্ত’ তো বটেই।
কবিতা, সঙ্গীত, স্থাপত্য, ভাস্কর্যের মূল রস একই ইংরেজিতে যাকে বলে ইসথেটিক ডিলাইট। কিন্তু এক রসের চিন্ময় রূপ (যথা কাব্যের) যদি অন্য রসের মৃন্ময় রূপে (যথা ভাস্কর্য, স্থাপত্যে) টায় টায় মিলছে না দেখেন তবে আশ্চর্য হবেন না। এদের প্রত্যেকেই মূল রস প্রকাশ করে আপন আপন ‘ভাষায়’, নিজস্ব শৈলীতে এবং আঙ্গিকে। একবার সেটি ধরতে পারলেই আর কোনও ভাবনা নেই। তার পর নিজের থেকেই আপনার গায়ে রসবোধের নতুন নতুন পাখা গজাতে থাকবে, আপনি উড়তে উড়তে হঠাৎ দেখবেন তাজমহলের গম্বুজটিও আপনার সঙ্গে আকাশপানে ধাওয়া করেছে– নিচের দিকে তাকিয়ে দেখবেন ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল যেন ক্রমেই পাতালের দিকে ডুবে যাচ্ছে।
স্থাপত্যের প্রধান রস– প্রধান কেন, একমাত্র বললেও ভুল বলা হয় না, অন্যগুলো থাকলে ভালো, না থাকলে আপত্তি নেই তার কম্পজিশনে, অর্থাৎ তার অঙ্গপ্রত্যঙ্গ, যেমন ধরুন, গম্বুজ, মিনার, আর্চ (দেউড়ি), ছত্রি (কিয়োসক, পেভিলিয়ন), ভিত্তি এমনভাবে সাজানো যে দেখে আপনার মনে আনন্দের সঞ্চার হয়। তুলনা দিয়ে বলতে পারি, সঙ্গীতেও তাই। কয়েকটি স্বর– সা, রে, গা, মা, ইত্যাদি এমনভাবে সাজানো হয় যে শোনামাত্রই আপনার মন এক অনির্বচনীয় রসে আপুত হয়।
এই সামঞ্জস্য যখন সর্বাঙ্গসুন্দর হয়, তখনই স্থাপত্য সার্থক। এবং স্থাপত্যের এই অনিন্দ্য সামঞ্জস্য যদি কাব্যে কিংবা উপন্যাসে পাওয়া যায় তবে বলা হয়, কাব্যখানিতে আরকিটেক্টনিকাল মহিমা আছে– মহাভারতে আছে, ফাউষ্টে আছে এবং উয়োর অ্যান্ড পিসে আছে; জ্যাঁ ক্রিস্তফ উত্তম উপন্যাস কিন্তু এ-গুণটি সেখানে অনুপস্থিত। লিরিক বা গীতিকাব্যে যদিও কম্পজিশন থাকে– তা সে যতই কম হোক না কেন, তাতে আরকিটেক্টনিকাল বৈশিষ্ট্য থাকে না।(১)
স্থাপত্যের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে তার পর গুণীরা বলেন, এবং সার্থক স্থাপত্যে স্থপতি অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলোর নিখুঁত সামঞ্জস্য করার পর সেগুলোকে অলঙ্কার সহযোগে সুন্দর করে তোলেন। অধম একথা সম্পূর্ণ স্বীকার করে না। কিন্তু এ গোলকধাঁধায়ও সে ঢুকতে নারাজ। দিল্লির দিওয়ান-ই-খাস ও দিওয়ান-ই-আমে অলঙ্কারের ছড়াছড়ি, তুগলুক যুগের স্থাপত্যে অলঙ্কার প্রায় নেই– পাঠক দিল্লি দেখার সময় এই তত্ত্বটি সম্বন্ধে সচেতন থাকবেন।(২) অথচ দুই-ই সার্থক রসসৃষ্টি।
এই সামঞ্জস্য যদি খাড়াই-চওড়াই– অর্থাৎ মাত্র দুই দিক নিয়ে হয় তবে সেটা ছবি। শুধু সামনের দিক থেকে দেখা যায়। তিন দিক নিয়ে–তিন ডাইমেনশনাল–হলে সেটা ভাস্কর্য কিংবা স্থাপত্য। কিন্তু অনেক সময় মূর্তির পিছনদিকটা অবহেলা করা হয় বলে সেটাকে শুধু সামনের দিক থেকে দেখতে হয়। গড়ের মাঠের যেসব মূর্তি ঘোড়সওয়ার নয় সেগুলো পিছন থেকে দেখতে রীতিমতো খারাপ লাগে (বস্তুত এই সমস্যা সমাধানের জন্যই অনেক নিরীহ লোককে ঘোড়ায় চড়ানো হয়েছে) এবং বাসটগুলো পিছন থেকে রীতিমতো কদাকার বলে সেগুলোকে দেওয়ালের গায়ে ঠেলে দেওয়া হয় যাতে করে পিছন থেকে দেখবার কোনও সম্ভাবনাই না-থাকে। বিদ্যাসাগরের মূর্তিটি জলের কাছে রয়েছে বলেই ওই সমস্যাটির সমাধান হয়েছে– জলে সাঁতরাতে সাঁতরাতে মূর্তির পিছনদিকে তাকাবে কজন লোকে?
