দিল্লিতে তিনটি বড় দরগা আছে। প্রথমটি কুত্ত্বউদ্দিন বখতিয়ার কাকির। ইনি কুত্বউদ্দীন আইবকের গুরু ছিলেন। অনেকের ধারণা আইবক গুরুর স্মরণে কুতুব মিনার নির্মাণ করেছিলেন। দরগাটি কুতুব মিনারের কাছেই এবং ‘কুতুব সাহেব’ নামে পরিচিত।
দ্বিতীয়টি নিজামউদ্দিন আউলিয়ার এবং তৃতীয়টি নাসিরউদ্দিন ‘চিরাগ দিল্লি’র। দরগাটি দিল্লি থেকে মাইল তিনেক দূরে।
প্রথমটির পত্তন দাস-আমলে, দ্বিতীয়টির খিলজি আমলে এবং তৃতীয়টির তুগলুক আমলে। সেই যুগ থেকে শেষ-মোগল পর্যন্ত এসব দরগাতে বহু ভক্ত নানা ইমারত গড়েছেন বলে অল্পের ভিতর সব স্থাপত্যেরই নিদর্শন পাওয়া যায়। কিন্তু চোখ কিছুটা না বসা পর্যন্ত এসব জায়গায় গবেষণা করা বিপজ্জনক।
কুতুব মিনার পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ মিনার। ইংরেজ পর্যন্ত একথা স্বীকার করেছে। আশ্চর্য মনে হয় যে, এর পূর্ববর্তী নিদর্শন এদেশে নেই, ইরান-তুরানেও নেই। বহু স্থপতির বহু একসপেরিমেন্টের সম্পূর্ণ ফায়দা উঠিয়ে তাজ নির্মিত হল– কিন্তু মিনারের ক্ষেত্রে কুতুব প্রথম এবং শেষ একত্সপেরিমেন্ট। এ ধরনের বিজয়স্তম্ভ পূর্বে কেউ করেনি; কাজেই গুণীজনের বিস্ময়ের অবধি নেই যে, হঠাৎ স্থপতি এ সাহস পেল কোথা থেকে? কানিংহাম, ফার্গুসন, কার স্টিফেন, স্যর সৈয়দ আহমদ অনেক ভেবে-চিন্তেও এর কোনও উত্তর দিতে পারেননি।
কুতুব পাঁচতলার মিনার। প্রথম তলাতে আছে ‘বাঁশি’ ও ‘কোণে’র পর-পর সাজানো নকশা। দ্বিতীয় তলাতে শুধু বাঁশি, তৃতীয় তলাতে শুধু কোণ; চতুর্থ ও পঞ্চম তলাতে কী ছিল জানার উপায় নেই, কারণ বজ্রাঘাতে সে দুটি ভেঙে যাওয়ায় ফিরোজ তুগলুক (যিনি ‘অশোকস্তম্ভ’ দিল্লি আনেন; ইনি যেমন নিজে সোসাহে ইমারত বানাতেন ঠিক তেমনি অকাতরে অন্যের ইমারত মেরামত করে দিতেন– দিল্লির অতি অল্প রাজাতেই এই দ্বিতীয় গুণটি পাওয়া যায়। সে দুটি মার্বেল দিয়ে মেরামত করে দেন। পঞ্চমটিতে নাকি আবার সিকন্দর লোদিরও হাত আছে। মিনারের মুকুটরূপে সর্বশেষে (যেখানে এখন আলো জ্বালানো হয়) কী ছিল সে সম্বন্ধে রসিকজনের কৌতূহলের অন্ত নেই।(৬) দুনিয়ার সবচেয়ে সেরা মিনারকে স্থপতি কী রাজমুকুট পরিয়েছিলেন সেখানেও তিনি তাল রেখে শেষরক্ষা করতে পেরেছিলেন কি না, তার যে অদ্ভুত কল্পনাশক্তি মিনারের সর্বাঙ্গে স্বপ্রকাশ সে-কল্পনাশক্তি দিয়ে তিনি দর্শককে কোন দ্যুলোকে উড়িয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন, কে জানে?
ইমারত তৈরি করা কত সোজা! কারিগরের হাতে সেখানে কত অজস্র মাল-মশলা! গম্বুজ, থাম, আর্চ, ছত্রি, মিনারেট, ছজ্জা (ড্রিপস্টোন), কার্নিস, ব্র্যাকেট কত কী! তার তুলনায় একটা সোজা খাড়া স্তম্ভে সৌন্দর্য আনা কত শক্ত! এখানে শিল্পী সফল হয়েছেন শুধু সেটাকে কয়েকটি তলাতে বিভক্ত করে, সামঞ্জস্য রেখে প্রতি তলায় তাকে একটু ছোট করে করে, গুটিকয়েক ব্যালকনি লাগিয়ে দিয়ে এবং মিনারের গায়ে কখনও ‘বাঁশি’, কখনও ‘কোণে’র নকশা কেটে। ‘প্রপশনে’র এরকম চূড়ান্ত পৃথিবীর আর কোনও মিনারে পাওয়া যায় না।
আর তার গায়ের কারুকার্যও অতি অদ্ভুত। বাঁশি এবং কোণের উপর দিয়ে সমস্ত মিনারটিকে কোমরবন্ধের মতো ঘিরে রয়েছে সারি সারি লতা-পাতা, ফুলের মালা, চক্রের নকশা। এগুলো জাতে হিন্দু এবং এর সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে একসারি অন্তর অন্তর আরবি লেখার সার– সেগুলো জাতে মুসলমান। কিন্তু উভয় খোদাইয়ের কাজই যে হিন্দু শিল্পী করেছেন সে বিষয়ে কণামাত্র সন্দেহের অবকাশ নেই। গোটা মিনারটির পরিকল্পনা করেছে মুসলমান, যাবতীয় কারুশিল্প করেছে হিন্দু ভারতবর্ষে মুসলমানদের সর্বপ্রথম সৃষ্টিকার্যে হিন্দু-মুসলমান মিলে গিয়ে যে অদ্ভুত সাফল্য দেখিয়েছিল সে-মিলন পরবর্তী যুগে কখনও ভঙ্গ হয়নি, কভু-বা মুসলমানের প্রাধান্য বেশি, কোনও ইমারতে হিন্দুর প্রাধান্য বেশি। আটশত বৎসর একসঙ্গে থেকেও হিন্দু-মুসলমান চিন্তার ক্ষেত্রে, রাজনীতির জগতে সম্পূর্ণ এক হয়ে যেতে পারেনি, কিন্তু কলার প্রাঙ্গণে (স্থাপত্য, সঙ্গীত এবং নৃত্যে) প্রথমদিনেই তাদের যে মিলন হয়েছিল আজও সেটি অটুট আছে।
কুতুবের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে আর কোনও মিনার কখনও মাথা খাড়া করেনি। দীর্ঘ আট শতাব্দী ধরে বহু বাদশা বহু ইমারত গড়েছেন কিন্তু ‘কুতুবের চেয়েও ভালো মিনার গড়ব’ এ সাহস কেউ দেখাননি। যে ইংরেজ দিল্লিতে সেক্রেটারিয়েট, রাজভবন গড়ে, কলকাতায় ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল বানিয়ে নিজেকে অতুল বিড়ম্বিত করেছে সে-ও বিলক্ষণ জানত কুতুবের সঙ্গে পাল্লা দেওয়া কোনও স্থপতির কর্ম নয়। (৭)
আলাউদ্দিন খিলজির মতো দুঃসাহসী রাজা ভারতবর্ষে কমই জনেছেন। একমাত্র তিনিই চেয়েছিলেন, কুতুবের সঙ্গে পাল্লা দিতে। তাই কুতুবের দ্বিগুণ ঘের দিয়ে তিনি আরেকটি মিনার গড়তে আরম্ভ করেন– বাসনা ছিল মিনারটি কুতুবের দ্বিগুণ উঁচু হবে। ইমারত মাত্রেরই একটা অপটিমাম সাইজ আছে– অর্থাৎ যার চেয়ে বড় হলে ইমারত খারাপ দেখায়, ছোট হলেও খারাপ দেখায় (সর্ব কলাতেই এ সূত্র প্রযোজ্য; কিন্তু স্থাপত্যের বেলা এটা অন্যতম মূলসূত্র)– কাজেই আলাউদ্দিনের চূড়া ডবল হলে ফল কী ওতরাতো বলা কঠিন। তা সে যা-ই হোক, মিনারের কাঠামোর কিছুটা শেষ হতে-না-হতেই ওপারের ডাক খিলজির কানে এসে পৌঁছল, যে পারে খুব সম্ভব মিনার হাতে নিয়ে লাঠালাঠি চলে না।
