মেয়েটা ফরাসিস, ছেলে দুটোর একটা মারাঠা, আরেকটা গুজরাতি বেনে! প্যারিস থেকেই নাকি রঙ্গরস আরম্ভ হয়েছে। বোম্বাই অবধি গড়াবে। উপস্থিত কিন্তু আমাদের তিনজনারই মনে প্রশ্ন জাগল, আখেরে জিতবে কে?
শুনেছি এহেন অবস্থায় দু জনাই স্পানিয়ার্ড হলে ডুয়েল লড়ে, ইতালীয় হলে একজন আত্মহত্যা করে, ইংরেজ হলে নাকি একে অন্যকে গম্ভীরভাবে স্টিফ বাও করে দু দিকে চলে যায়, ফরাসি হলে নাকি ভাগাভাগি করে নেয়।
প্রথম ধাক্কাতেই গুজরাতি, গেলেন হেরে। মারাঠা চালাকি করে ডবল পয়সা খর্চা করে দু খানি ডেক-চেয়ার ভাড়া করে রেখেছিল পাশাপাশি। বেনের মাথায় এ বুদ্ধিটা খেলল না কেন আমরা বুঝে উঠতে পারলুম না। মারাঠা নটবর সেই হুরীকে নিয়ে গেল জোড়া ডেক-চেয়ারের দিকে স্যর ওয়ালটার র্যালে যেরকম রমণী ইলিজাবেথকে কাদার উপর। আপন জোব্বা ফেলে দিয়ে হাত ধরে ওপারের পেভমেন্টে নিয়ে গিয়েছিলেন।
দু জনা লম্বা হলেন দুই ডেক-চেয়ারে। বেনেটা ক্যাবলাকান্তের মতো সামনে দাঁড়িয়ে খানিকটা কাঁই-কুঁই করে কেটে পড়ল।
আমার পাশের ফরাসি বলল ‘ইডিয়ট!’ জর্মন শুনে বলল, ‘নাইন, আখেরে জিতবে বেনে।’ ‘অ্যাঁপসিবল!’ ‘বেট?’ ‘বেট’ ‘পাঁচ শিলিঙ? ‘পাঁচ শিলিঙ’!
আড্ডার দিকে ভালো করে একবার তাকিয়ে নিয়ে চাচা বললেন, ‘বিশ্বাস কর আর না-ই কর, আস্তে আস্তে জাহাজের সবাই লেগে গেল এই বাজি ধরাধরিতে! বুকিরও অভাব হল না। আর সে বেট কী অদ্ভুত ফ্লাকচুয়েট করে। কোনওদিন ভোরে এসে দেখি জর্মনটা গুম্ হয়ে বসে আছে– যেন জাহাজ একটা কনসানস্ট্রেশন ক্যাম্প আর ফরাসিটা উল্লাসে ক্রিং ব্রিং করে পলকা নাচ নাচছে। ব্যাপার কী? পাক্কা খবর মিলেছে, আমাদের পরীটি কাল রাত দুটো অবধি মারাঠার সঙ্গে গুজুর-গুজুর করেছেন। বেনে মনের খেদে এগারোটাতেই কেবিন নেয়। ফরাসি এখন সক্কলের গায়ে পড়ে থ্রি টু ওয়ান অফার করছে। সে জিতলে পাবে কুল্লে এক শিলিং, হারলে দেবে তিন শিলিং। নাও, বোঝ ঠ্যালা! আর কোনওদিন বা খবর রটে, বেনের পো জাহাজের ক্যাম্বিসের চৌবাচ্চায় হুরীর সঙ্গে দু ঘণ্টা সাঁতার কেটেছে মারাঠা জলকে ভীষণ ডরায়। ব্যস, সেদিন বেনের স্টক স্কাই হাই!
ইতোমধ্যে একদিন বেনের বাজার যখন বড্ড ঢিলে যাচ্ছে তখন ঘটল এক নবীন কাণ্ড। হুরী ও মারাঠা তো বসত পাশাপাশি কিন্তু লাইনের সর্বশেষ নয় বলে হুরীর অন্য পাশে বসত এক অতিশয় গোবেচারি ভালো মানুষ নিগ্রো পাদ্রি। সে গিয়ে তার ডেক-চেয়ারের সঙ্গে বেনের ডেক-চেয়ারের বদলাবদলির প্রস্তাব করেছে। বেনে নাকি উল্লাসে ইয়াল্লা বলে আকাশ-ছোঁয়া লম্ফ মেরেছিল। বেটিঙের বাজার আবার স্টেডি হয়ে গেল।
ইতোমধ্যে প্রশ্ন উঠল, এ বেটিঙের শেষ ফৈসালা হবে কী প্রকারে? বহু বাক-বিতণ্ডার পর স্থির হল, যেদিন হুরী মারাঠা কিংবা বেনের সঙ্গে তার কেবিনে ঢুকবেন সেদিন হবে শেষ কৈলা। যার সঙ্গে ঢুকবেন তার হবে জিত।
দু একজন রুচিবাগীশ আপত্তি করেছিলেন কিন্তু ফরাসি উকিল হাত-পাত চোখ-মুখ নেড়ে বুঝিয়ে দিল, ‘C’est, c’est–, এটা, এটা হচ্ছে একটা লিগাল ডিসিশন, একটা আইনগত ন্যায্য হক্কের ফৈসালা। ঢলাঢলির কোনও কথাই হচ্ছে না।
রেসের বাজি তখন চরমে। কখনও বেনে, কখনও মারাঠা। সেই যে চতুখোর গল্প বলেছিল, পাখিকে গুলি মেরে সঙ্গে সঙ্গে শিকারি কুকুরকেও দিয়েছে লেলিয়ে। তখন বুলেটে কুকুরে কী রেস– ভি কুত্তা, কভি গুলি, কভি গুলি, কভি কুত্তা।
এমন সময় আদন বন্দর পেরিয়ে আমরা ঢুকলাম আরব সাগরে। আর সঙ্গে সঙ্গে আমাদের আঠারো হাজার টনের জাহাজকে মারলে মৌসুমি হাওয়া তার বাইশ হাজারি টনের থাবড়া। জাহাজ উঠল নাগর-বেনাগর সবাইকে নিয়ে নাগরদোলায়। আর সঙ্গে সঙ্গে কী সি-সিকনেস! বমি আর বমি! প্রথম ধাক্কাতেই মারাঠা হল ঘায়েল। রেলিঙ ধরে পেটের নাড়ি-ভুঁড়ি বের করার চেষ্টা দিয়ে টলতে টলতে চলে গেল কেবিনে। বেনের মুখে শুকনো হাসি, কিন্তু তিনিও আরাম বোধ করছেন না। পরদিন সমুদ্র ধরল রুদ্রতর মূর্তি। এবারে হুরী পড়ে রইলেন একা। তাঁর মুখও হরতালের মতো হলদে। তার পরের দিন ডেক প্রায় সাফ। নিতান্ত বরিশালের পানি-জলের প্রাণী বলে দাঁতমুখ খিঁচিয়ে কোনওগতিকে আমি টিকে আছি আর কি! খাবার সময় পেটে যা যায় সেসব রিটার্ন টিকিট নিয়ে মোকামে পৌঁছবার আগেই ফিরি-ফিরি করছে। হুরী নিতান্ত একা বলে ফরাসি বন্ধু তাকে আদর করে ডেকে এনে আমাদের পাশে বসাল।
সে রাত্রে জাহাজ থেলো ঝড়ের মোক্ষমতম থাবড়া। ফরাসি গায়েব। হুরী এই প্রথম ছুটে গিয়ে ধরল রেলিঙ। আমিও এই যাই কি তেই যাই। তবু ধরলুম গিয়ে তাকে। হুরী ক্ষীণকণ্ঠে বলল, ‘কেবিন’। আমি ধরে ধরে কোনওগতিকে তাকে তার কেবিনের দিকে নিয়ে চললুম। দু জনাই টলটলায়মান। আমার কেবিনের সামনে পৌঁছতেই ঝড়ের আরেক ধাক্কায় খুলে গেল আমার কেবিনের দরজা। ছিটকে পড়লুম দু জনাই ভিতরে। কী আর করি? তাকে তুলে ধরে প্রথম বিছানায় শোয়ালুম। তার পর কেবিন-বয়কে ডেকে দু জনাতে মিলে তাকে চ্যাংদোলা করে নিয়ে গেলুম তার কেবিনে। বাপস!
চাচা থামলেন। একদম থেমে গেলেন।
আড্ডার সবাই একবাক্যে শুধাল, ‘তার পর?’
চাচা বললেন, ‘কচু, তার পর আর কী?’
