আলতোভাবে ওদের ওপর একটা নজর বুলিয়ে নিয়ে আড্ডা পুনরায় চাচার দিকে তাকাল। চাচা বললেন, ‘খাইছে! আবার সেই ইটারনেল ট্রায়েঙ্গল!’
পাইকিরি বিয়ার খেকো সূয্যি রায় বলল, ‘চাচা হরবকতই ট্রায়েঙ্গল দেখেন। এ যেন ঘামের ফোঁটাতে কুমির দেখা। দ্য ত্রো নিয়ে কি কেউ কখনও বেরোয় না?’
রায়ের গ্রামসম্পর্কে ভাগ্নে, সতেরো বছরের চ্যাংড়া সদস্য লাজুক গোলাম মৌলা শুধাল, ‘মামু, দ্য ত্রো কারে কয়?’
রায় বললেন, ‘পই পই করে বলেছি ফরাসি শিখতে, তা শিখবি নি। ডি, ই দ্য; টি, আর, ও, পি জো-পি সাইলেন্ট। অর্থাৎ একজন অনাবশ্যক বেশি–One too many। এই মনে কর, তুই যদি তোর ফিয়াসেকে– একথাটাও বোঝাতে হবে নাকি?– নিয়ে বেরোস আর আমি খোদার-খামোখা তোদের সঙ্গে জুটে যাই, তবে আমি দ্য ত্রো। বুঝলি?’
গোলাম মৌলা মাথা নিচু করে সেই বার্লিনের শীতের বরাব্বর লজ্জায় ঘামতে লাগল।
আড্ডায় লটবর লেডি-কিলার পুলিন সরকার মৌলাকে ধমক দিয়ে বলল, তুই লজ্জা পাচ্ছিস কেন রে বুড়ব? লজ্জা পাবেন রায়, ডাণ্ডা-গুলি খেলার সময় গুলিকে ভয় দেখা নি ডাণ্ডাকে না ছোঁবার জন্য? তখন কী বলিস? ‘ভাগ্নে বউ দুয়ারে– কোনও কেটে ফালদি যা।’ বরঞ্চ সূয্যি রায় যদি তাঁর ম্যাডামকে নিয়ে বেরোন, আর তুই যদি সঙ্গে জুটে যাস, তবু কিন্তু তুই দ্য ত্রো নস্। রাধা কেষ্ট’র কী হন জানিস তো?’
গোলাম মৌলা এবারে লজ্জায় জল না হয়ে একেবারে পানি।
গোঁসাই বললেন, ‘চাচা, আপনি কিন্তু যেভাবে ঘন ঘন মাথা দোলাচ্ছেন তাতে মনে হচ্ছে, আপনি একদম শোয়ার, এ হচ্ছে দুটো-হুঁলো-একটা-মেনীর ব্যাপার। তা কি কখনও হওয়া যায়?’
চাচা বললেন, ‘যায়, যায়, যায়। আকছারই যায়, অবশ্য প্র্যাকটিস্ থাকলে।’
আজ্ঞা সমস্বরে বলল, ‘প্র্যাকটিস!’
চাচা বললেন, ‘হ। এবারে দেশে যাবার সময় জাহাজে হয়েছে।’
গল্পের গন্ধ পেয়ে আড্ডা আসন জমিয়ে বলল, ‘ছাড়ুন চাচা।’
চাচা বললেন, ‘এবার দেখি, জাহাজভর্তি ইহুদির পাল। জর্মনি, অস্ট্রিয়া, চেকোস্লোভাকিয়া থেকে ঝেঁটাই করে সবাই যাচ্ছে সাংহাই। সেখানে যেতে নাকি ভিসার প্রয়োজন হয় না। কী করে টের পেয়েছে, এবারে হিটলার দাবড়াতে আরম্ভ করলে নেবুকাডনাজারের বেবিলোনিয়ান ক্যাপটিভিটি নয়, এবারে স্রেফ কচুকাটার পালা। তাই সাংহাই হয়ে গেছে ওদের ল্যান্ড অব মিল্ক অ্যান্ড হানি, ননীমধুর দেশ।
আমার ডেক-চেয়ারটা ছিল নিচের তলা থেকে ওঠার সিঁড়ির মুখের কাছে। ডাইনে এক বুড়ো ইহুদি আর বাঁয়ে এক ফরাসি উকিল। ইহুদি ভিয়েনার লোক, মাতৃভাষা জর্মন, ফরাসি জানে না। আর ফরাসি উকিল জর্মন জানে না সে তো জানা কথা। ফরাসি ভাষা ছাড়া পৃথিবীতে যে অন্য ভাষা চালু আছে সে তত্ত্ব জাহাজে উঠে সে এই প্রথম আবিষ্কার করল। এতদিন তার বিশ্বাস ছিল, পৃথিবীর আর সর্বত্র ভাঙা-ভাঙা ফরাসি, পিজিন ফেঞ্চই চলে– বিদেশিরা প্যারিসে এলে যেরকম টুকিটাকি ফরাসি বলে ওইরকম আর কি।
তিনজনাতে তিনখানা বই পড়ার ভান করে এক-একবার সিঁড়ি দিয়ে উঠনে-ওলা নামনে-ওলা চিড়িয়াগুলোর দিকে তাকাই, তার পর বইয়ের দিকে নজর ফিরিয়ে আপন আপন সুচিন্তিত মন্তব্য প্রকাশ করি।
একটি মধ্যবয়স্কা উঠলেন। জর্মন ইহুদি বলল, ‘হালব-উনট-হালব’–অর্থাৎ ‘হাফাহাফি’। ফরাসি বলল, “অ’ প্যো আঁসিয়েন’–‘একটুখানি এনশেন্ট’। জর্মন আমাকে শুধাল, ‘ফ্রেঞ্চি, কী বলল?’ আমি অনুবাদ করলুম। জর্মন বলল, ‘চল্লিশ-পঁয়তাল্লিশ হবে। তা আর এমন কী বয়স- নিষট ভার–নয় কি?’ ফরাসি আমাকে শুধাল, ‘ক্যাস কিল দি—‘কী বলল ও?’’ উত্তর শুনে বলল, ‘মঁ দিয়ো– ইয়াল্লা– চল্লিশ আবার বয়স নয়! একটা কেথিড্রেলের পক্ষে অবশ্য নয়। কিন্তু মেয়েছেলে, ছোঃ!’
এমন সময় হঠাৎ একসঙ্গে তিনজনার তিনখানা বই ঠাস করে আপন আপন উরুতে পড়ে গেল। কোর্ট মার্শালের সময় যেরকম দশটা বন্দুক এক ঝটকায় গুলি ছোড়ে। কী ব্যাপার? দ্যাখ তো না দ্যাখ, সিঁড়ি দিয়ে উঠল এক তরুণী।
সে কী চেহারা! এরকম রমণী দেখেই ভারতচন্দ্রের মুণ্ডুটি ঘুরে যায় আর মানুষে-দেবতাতে ঘুলিয়ে ফেলে বলেছিলেন, ‘এ তো মেয়ে মেয়ে নয়, দেবতা নিশ্চয়।’
ইটালির গোলাপি মার্বেল দিয়ে কোঁদা মুখখানি, যেন কাজল দিয়ে আঁকা দুটি ভুরুর জোড়া পাখিটি গোলাপি আকাশে ডানা মেলেছে, চোখ দুটি সমুদ্রের ফেনার উপর বসানো দুটি উজ্জ্বল নীলমণি, নাকটি যেন নন্দলালের আঁকা সতী অপর্ণার আবক্ররেখা মুখের সৌন্দর্যকে দু ভাগে করে দিয়েছে, ঠোঁট দুটিতে লেগেছে গোলাপফুলের পাপড়িতে যেন প্রথম বসন্তের মৃদু পবনের ক্ষীণ শিহরণ।
চাচা বললেন, ‘তা সে যাক গে! আমার বয়েস হয়েছে। তোমাদের সামনে সব কথা। বলতে বাধো বাধো ঠেকে। কিন্তু সত্যি বলতে কী! অপূর্ব, অপূর্ব।’
দেখেই বোঝা যায়, ইহুদি প্রাচ্য-প্রতীচ্য উভয় সৌন্দর্যের অদ্ভুত সম্মেলন।
জর্মন এবং ফরাসি দু জনেই চুপ! আমো।
আর সঙ্গে সঙ্গে দুটি ছোকরা জাহাজের দু প্রান্ত থেকে চুম্বকে টানা লোহার মতো তার গায়ের দু দিকে যেন সেঁটে গেল। স্পষ্ট বোঝা গেল, এতক্ষণ ধরে দু জনাই তার পদধ্বনির প্রতীক্ষায় ছিল।
জাহাজে প্রথম দু একদিন ঠিক আঁচা যায় না, শেষ পর্যন্ত কার সঙ্গে কার পাকাপাকি দোস্তি হবে। কোন্ মঁসিয়ে কোন মাদৃমোয়াজেলের পাল্লায় পড়বেন, কোন হার কোন ফ্রাউ বা ফ্রলাইনের প্রেমে হাবুডুবু খাবেন, কোন মিসিস কোন মিস্টারের সঙ্গে রাত তেরোটা অবধি খোলা ডেকে গোপন প্রেমালাপ করবেন। এ তিনটির বেলা কিন্তু সবাই বুঝে গেল এটা ইটার্নেল ট্রায়েঙ্গল। আমি অবশ্য গোসাঁইয়ের মতো প্রথমটায় ভাবলুম, হার্মলেস ব্যাপারও হতে পারে।
