শ্বশুরমশায়ের সামনে ঘাড় নিচু করে, হাত-পা দিয়ে বায়ু সমুদ্র মন্থন করা কিছুক্ষণের মতো স্থগিত রেখে বলি,
‘আজ্ঞে, রামবাবু বললেন, ওই ব্যাপার নিয়ে আমি যেন দুশ্চিন্তা না করি।’
পিতাকে বলি, রামবাবু বলল, ‘যাও ও-কথা তোমাকে ভাবতে হবে না।’
রকের ইয়ারকে বলি, ‘শ্লা রেমোটা কী বলল জানিস? বলল, “যা যা ছোঁড়া, মেলা ডোঁপোমি কত্তি হবে না; আপনার চরকায় তেল দে গে যা।”
শ’ সর্বোচ্চ উদাহরণ দিয়েছেন তাঁর স্ত্রীকে নিয়ে। সেটা কিছুমাত্র অস্বাভাবিক নয়। তিনি যে তাঁর স্ত্রীকে সমঝে চলতেন, এমনকি ডরাতেনও, সেকথা কারও অজানা নেই। আর ডরায় না কে? ‘পঞ্চতন্ত্র’ পড়ে দেখুন– বিষ্ণুশর্মার লেখাটা নয়, অন্য একজনের। লাইব্রেরি থেকে ধার করে নয়, কিনে। লোকটা অন্নাভাবে আছে।
তাই প্রশ্ন উঠবে, উপরের যে রিপোর্টটি পাত্রভেদে ভিন্ন ভিন্ন রূপ ধারণ করছে, সেটি যদি বউয়ের কাছে নিবেদন করি, তবে সেটা কী রূপ নেবে?
সেটা সম্পূর্ণ নির্ভর করবে, বউ কী শুনতে চান। তিনি যদি শুনতে চান, ‘রামবাবু ওই কাজের ভারটা আপন কাঁধে তুলে নিয়েছেন, আপনাকে তাই নিয়ে আর মাথা ঘামাতে হবে না, তা হলে তো আপনি নিষ্পরোয়া হয়ে গিয়ে তেরিয়া মেরে চড়াকসে বলবেন, “হ্যাঁ, হ্যাঁ গিন্নি, যা কয়েছ।” আমি যতই বলি, “রামবাবু, আপনাকে কিচ্ছুটি চিন্তা করতে হবে না। আমি সব বোঝা কাঁধে নিচ্ছি”, তিনি ততই আমার পিঠে হাত বুলিয়ে বলেন, “না ভায়া, ও কাজ আমার তোমাকে দেখতে হবে না।” কী আর করি? ওঁর হাতেই সব ছেড়ে দিয়ে এলুম।’
আর যদি গিন্নি উল্টোটা আশা করে থাকেন? অর্থাৎ আপনি যদি মিশনে ফেল মেরে এসে থাকেন? তা হলে? তা হলে ঈশ্বর রক্ষতু।
গলা সাফ করে ইদিক-উদিক তাকিয়ে কাঁচুমাচু হয়ে বললেন, ‘–’
আবার বলছি তখন ঈশ্বর রক্ষতু। আমি আর কী বলব। চল্লিশ বছর হল বিয়ে করেছি। এখনও সে ভাষা শিখতে পারিনি।
মূল কথায় ফিরে যাই।
এ তো হল কথাবার্তায়। সাহিত্যে এ জিনিসটি আরও প্রকট।
সেখানে কাকে উদ্দেশ করে লিখছেন সেটা তো আছেই, তার ওপর আছে বিষয়বস্তু।
কালীপ্রসন্ন সিংহ যখন মহাভারতের অনুবাদ করেছেন তখন ব্যবহার করেছেন সংস্কৃত শব্দবহুল ভাষা, কারণ বিষয়বস্তু এপিক, গুরুগম্ভীর। ‘হুতোম প্যাঁচার নক্সা’য় তিনি ব্যবহার করেছেন ‘রকে’র ভাষা। কারণ সেখানে বিষয়বস্তু ‘বেলেল্লাপনা’, অতএব চটুল এবং সেই কারণেই ‘মেঘনাদবধে’র ভাষা এক, ‘একেই কি বলে সভ্যতা’র ভাষা অন্য। ‘কৃষ্ণচরিত্রে’র ভাষা এক, ‘কমলাকান্তে’র ভাষা অন্য।
এমনকি ধরুন, বিষয়বস্তুও এক, কিন্তু সেখানে পরিবেশ এবং পাত্র ভিন্ন বলে ভাষাও ভিন্ন হল। ‘পারস্য ভ্রমণে’ রবীন্দ্রনাথ কথা বলছেন ওই দেশের অভিজাত সম্প্রদায়, গুণীজ্ঞানীদের সঙ্গে– তাই তার ভাষা এক এবং ‘মরুতীর্থ হিংলাজে’র পাত্রপাত্রী অতি সাধারণ জন– এমনকি রিফর্যাফ-–তাই তার ভাষা অন্য; ‘মরুতীর্থ’ ‘পারস্যে’র চেয়ে ভালো না মন্দ সেকথা। উঠছে না। দুটোই রসসৃষ্টি, কিন্তু দুটো আলাদা জিনিস।
অর্থাৎ বিষয়বস্তু—কনটেন্ট– তার শৈলী এবং ভাষা—স্টাইল– নির্বাচন করে। সেখানে উল্টোপাল্টা করলে রসসৃষ্টি হয় না।
‘বঙ্কিমের ভাষার অনুকরণ করবে’–ছেলেবেলা থেকেই সে উপদেশ শুনেছি এবং ধরে নিয়েছি সে ভাষা ‘রাজসিংহ’, ‘দুর্গেশনন্দিনী’র ভাষা।
ওই ভাষা দিয়ে পাড়ার কানাই-বলাইয়ের কাহিনী লিখতে গেলে ফর্ম ও কন্টেন্টের যে দ্বন্দ্ব উপস্থিত হয়, তার ফলে বারেবারে তাল কাটে। শরৎ চাটুজ্জের প্রথম যৌবনের লেখাতে তার নিদর্শন প্রচুর পাওয়া যায়। প্রৌঢ় বয়সে তিনি তাঁর আপন ভাষা পেয়ে বিষয়বস্তুর সঙ্গে তাল রেখে অদ্ভুত তবলা শোনালেন।
এমনকি ‘গোরা’, ‘যোগাযোগ’, ‘শেষের কবিতা’র ভাষা দিয়ে ‘কচিসংসদ’ লেখা যায় না।
তাই রবীন্দ্রনাথ বা বঙ্কিমের অনুকরণ (ইমিটেশন) সহজেই হনুকরণ (এপিং) হয়ে যেতে পারে।
———–
১. এখানে শ’ ইচ্ছে করেই ‘আই বেগ ইয়োর পাৰ্ডন’ কিংবা ‘এক্সকিউজ মি’ বলেননি। ইঙ্গিত রয়েছে যে, বাড়িতে স্ত্রীকে আমরা পোশাকি আদবকায়দা দেখাইনে।
ত্রিমূর্তি (চাচা-কাহিনী)
বার্লিন শহরের উলান্ড স্ট্রিটের উপর ১৯২৯ খ্রিস্টাব্দে ‘হিন্দুস্থান হৌস’ নামে একটি রেস্তোরাঁ জন্ম নেয়, এবং সঙ্গে সঙ্গে বাঙালির যা স্বভাব, রেস্তোরাঁর সুদূরতম কোণে একটি আড্ডা বসে যায়। আড্ডার চক্রবর্তী ছিলেন চাচা বরিশালের খাজা বাঙাল মুসলমান আর চেলারা গোসাই, মুখুয্যে, সরকার, রায় এবং চ্যাংড়া গোলাম মৌলা, এই ক জন।
চাচার ন্যাওটা শিষ্য গোসাঁই বললেন, ‘যা বল, যা কও, চাচা না থাকলে আমাদের আড্ডাটা কীরকম যেন দড়কচ্চা মেরে যায়। তা বলুন, চাচা, দেশের– না, দ্যাশের– খবর কী? কী খেলেন, কী দেখলেন, বেবাক কথা খুলে কন।’
চাচা বরিশাল গিয়েছিলেন। তিন মাস পরে ফিরে এসেছেন। বললেন, ‘কী খেলুম? কই মাছ এক-একটা ইলিশ মাছের সাইজ; ইলিশ মাছ– এক-একটি তিমি মাছের সাইজ; আর তিমি মাছ– তা সে দেখিনি। তবে বোধহয়, তাবৎ বাকরগঞ্জ ডিসৃটিক্টাই তারই একটার পিঠের উপর ভাসছে। ওই যেরকম সিন্দবাদ তিমির পিঠটাকে চর ভেবে তারই পিঠের উপর রশুই চড়িয়েছিল।’
বাকি কথা শেষ হওয়ার পূর্বে সক্কলের দৃষ্টি চলে গেল দোরের দিকে। দুটি জর্মন চ্যাংড়া একটি চিংড়িকে নিয়ে রেস্তোরাঁয় ঢুকল। ভারতীয় রান্নার ঝালের দাপটে জর্মনরা সচরাচর হিন্দুস্থান হৌসে আসত না। পাড়ার জর্মনরা তো আমাদের লঙ্কা-ফোড়ন চড়লে পয়লা বিশ্বযুদ্ধের ডিসপোজেলের গ্যাস-মাস্ক পরত। তবে দু একজন যে একেবারেই আসত না তা নয়—‘ইন্ডিশে রাইস-কুরি’ অর্থাৎ ভারতীয় ঝোল-ভাতের খুশবাই জর্মনি-হাঙ্গেরি সর্বত্রই কিছু কিছু পাওয়া যায়।
