সাহিত্য বলুন, সঙ্গীত বলুন, চিত্রকলা বলুন, ভাস্কর্য বলুন, এরকম একটি তাজমহলের সামনে-দাঁড়িয়ে-নটরাজ পৃথিবীতে আর কখনও উদয় হয়নি। এঁর প্রতিভা অতুলনীয়। বাপ্লেবী এর কণ্ঠে, উর্বশী পদযুগে, এঁর দক্ষিণ হস্তে বিষ্ণুর চক্র (গ্রেট ডিকটেটর), বাম হস্তে দাক্ষিণ্যের বরাভয় (সিটি লাইট)। ইনি বিশ্বকর্তা। (মডার্ন টাইমস), ইনি নীলকণ্ঠ (মসিয়ো ভেরদু)। ‘অতি বড় বৃদ্ধ’ বলেই ইনি ‘সিদ্ধিতে নিপুণ’ এবং লগ্ন এলে শঙ্করের মতো নবীন বেশে সজ্জিত হতে জানেন (লাইম লাইট)।
রবীন্দ্রনাথকে উদ্দেশ করে শরৎচন্দ্র একদা বলেছিলেন, ‘তোমার দিকে চাহিয়া আমাদের বিস্ময়ের অন্ত নাই।’ সেই রবীন্দ্রনাথ সিন্ধুপারের হিস্পানি বিদেশিনীকে দেখে মুগ্ধ কণ্ঠে বলেছিলেন,
‘সুনীল সাগরের শ্যামল কিনারে
দেখেছি পথে যেতে তুলনাহীনারে।’
চার্লির দিকে তাকিয়ে সর্বক্ষণ এই দোহাটি মনে পড়ে।
সর্বশ্রেষ্ঠ ঔপন্যাসিক হিসেবে জগদ্বিখ্যাত হওয়ার পর টলস্টয় একখানি প্রামাণিক অলঙ্কার-শাস্ত্রের গ্রন্থ লেখেন। পুস্তকের প্রথম এবং শেষ প্রশ্ন, ‘হোয়াট ইজ আর্ট?’ অর্থাৎ ‘রস কী’, মধুর সঙ্গীত শুনে, উত্তম কাব্য পাঠ করে, দেবীর মূর্তি দেখে আমরা যে আনন্দরসে নিমজ্জিত হই সে বস্তুটি কী?
তার সংজ্ঞা দেওয়ার পর টলস্টয় বলেন, গুটিকয়েক উন্নাসিককে যে রস আনন্দ দান করে। সে রস হীন রস। আচণ্ডাল, (আ-সেনসর বোর্ড?)(১) জনসাধারণকে যে কাব্য আনন্দ দেয় সেই কাব্যই প্রকৃত কাব্য, উত্তম কাব্য। যথা, মহাভারত। পণ্ডিত-মূর্খ, বৃদ্ধ-বালক, পাপী-পুণ্যবান সকলেই এ কাব্য শুনে আনন্দ পায়।
অবশ্য সব পাঠক যে একই কাব্যে একই বস্তুতে আনন্দ পাবে এমনটা না-ও হতে পারে। বালক হয়তো কাব্যের কাহিনী বা পুট শুনে মুগ্ধ, বলদৃপ্ত যুবা হয়তো কর্ণার্জুনের যুদ্ধবর্ণনা শুনে বীর রসে লুপ্ত, বৃদ্ধ হয়তো শ্রীকৃষ্ণে অর্জুনের আত্মসমর্পণ দেখে ভক্তিরসে আপুত, এবং উদারচরিত সর্বরসে রসিকজন হয়তো প্রতি ঝঙ্কারে প্রতি মীড়ে প্রকৃত কাব্যরসে নিমজ্জিত।
তা হলে প্রশ্ন, মানুষের বর্বর রুচিকে কি মার্জিত করা যায় না? হয়তো যায়, কিংবা হয়তো যায় না, কিন্তু চেষ্টা আলবৎ করা যায়। সে চেষ্টা ভরত, দণ্ডিন, মম্মট, আরিস্ততেল, রবীন্দ্রনাথ, ক্রোচে করেছেন, কিন্তু এদের গলা কেটে ফেললেও এঁরা কোনও বোর্ডের মেম্বর হতে রাজি হতেন না। মানুষের রুচিপরিবর্তন এঁরাই করিয়েছেন– কোনও বোর্ড কখনওই কিছু পারেনি।
বর্তমান যুগে চার্লি সেই রসই সর্বজনকে উপহার দিয়েছেন। এ যুগের সাহিত্যে, কাব্যে, ভাস্কর্যে, রঙ্গমঞ্চেও কুত্রাপি কেউই চার্লির বৈচিত্র্য, বিস্তার, গভীরতা সর্বজনমর্মস্পর্শদক্ষতা দেখাতে পারেননি। এ যুগে শার্লক হোমস পৃথিবীর সর্বত্রই সম্মান পেয়েছেন, কিন্তু মানুষের কোমলতম স্পর্শকাতরতাকে তিনি তার চরম মূল্য দিতে পারেননি; ওমর খৈয়ামও প্রকৃত ধর্মভীরুকে বিচলিত করতে পারেননি।
চার্লিকে বিশ্লেষণ করি কী প্রকারে?
তাঁর সৃষ্টি, কিংবা তিনি নিজে, এই যে ‘লিটল ম্যান’, সামান্য জন, যেন পাড়ার জগা, টম্, ডিক, হ্যারি; ‘কেউ-কেটা’ তো নয়ই এক্কেবারে, ‘কেউ-না’ কী করে সকলকে ছাড়িয়ে এক অসাধারণ জন হয়ে সকলের হৃদয়ে এমন একটি আসন গ্রহণ করল যে আসন পূর্বে শূন্য ছিল এবং সেখানে আর কেউ কখনও আসতে পারবে না?
কোনটা ছেড়ে কোনটা বলি?
ভ্যাগাবন্ড চার্লি একটা শুকনো ফুল দেখতে পেয়ে সেটি তুলে নিয়ে শুঁকতে লাগল। ঝাঁট-দিয়ে-ফেলে-দেওয়া ফুল– তার ফুল্ল যৌবন গেছে, সে পথপ্রান্তে অবহেলিত, পদদলিত। সামান্য যেটুকু গন্ধ এখনও তার অঙ্গে সুষুপ্ত ছিল চার্লি তাই যেন তার ‘সহৃদয়’ নিশ্বাস দিয়ে জাগিয়ে তুলে বুক ভরে নিচ্ছে। এ ফুল কি কখনও বিশ্বাস করতে পেরেছিল যে মৃত্যুর পূর্বমুহূর্তে– রবীন্দ্রনাথের কবি যেরকম আত্মহত্যার পূর্বমুহূর্তে রাজকন্যার বরমাল্য পেল– সে তার চরম সম্মান পাবে?
এমন সময় রাস্তার দুষ্ট ছোঁড়ারা মোকা পেয়ে পিছন থেকে চার্লির ছেঁড়া পাতলুনের ভিতর হাত ঢুকিয়ে শার্টে দিল টান। চচ্চড় করে ছিঁড়ে গেল পাতলুনের অনেকখানি– এই তার শেষ পাতলুন, এটাও গেল– আর বেরিয়ে এল ছেঁড়া শার্টের শেষ টুকরো।
আস্তে আস্তে ঘাড় ফিরিয়ে ভ্যাগাবন্ড চার্লি ছোঁড়াদের দিকে তাকাল। তারা তখন ‘শুভকর্ম’ সমাধান করে ছুটে পালাচ্ছে।
তখন ভ্যাগাবন্ডের চোখে কী বেদনাতুর করুণ ভাব!
ভিয়েনা, বার্লিন, প্যারিস-প্রাগে আমি বিস্তর থিয়েটার প্রচুর অপেরা দেখেছি, কাব্যে সাহিত্যে টন মণ করুণ রসের বর্ণনা পড়েছি, কিন্তু ভ্যাগাবন্ডের সে করুণ চাউনি এদের সবাইকে কোথায় ফেলে কহাঁ কহাঁ মুল্লুকে চলে যায়।
আর সেই নীরব চাউনিতে বলছে, ‘কেন, ভাই, তোরা আমাকে জ্বালাস? আমি তো তোদের সমাজের উজির-নাজির হতে চাইনে। কুকুর-বেড়ালটাকে পর্যন্ত আমি পথ ছেড়ে দিয়ে কোনও গতিকে দিন গুজরান করছি। আমায় শান্তিতে ছেড়ে দে না, বাবারা!’ তারপরে যেন দীর্ঘনিশ্বাস– হে ভগবান!
এখানেই কি শেষ? তা হলে চার্লি দস্তয়েফস্কির মতো শুধুমাত্র করুণ রসের রাজা হয়ে থাকতেন।
অন্ধ ফুলওয়ালি মিষ্টি হেসে চার্লিকে একটি তাজা ফুল দিতে যাচ্ছে। তাকে? চার্লিকে? অবিশ্বাস্য!
