আমি ততক্ষণে হাসতে হাসতে প্রায় কেঁদে ফেলেছি। দাদা আমার গম্ভীর রাশভারি প্রকৃতির লোক, চোখে-মুখে কোনওরকম ভাব প্রকাশ করে না, অবশ্য দরদি লোক বলে মাঝে মাঝে ঠোঁটের কোণে মৃদু হাস্য দেখা যায়– যা-ই হোক, যা-ই থাক, আমার মতো ফাজিল-পঞ্চানন নয়। কোটপাতলুন তুর্কি টুপি পরা সেই লোক খনে এদিক খনে ওদিক ধাওয়া করছে, টুপির ফুন্না বা ট্যাসেল চৈতন্যের মতো খাড়া হয়ে এদিক-ওদিক কম্প্রমান এ দৃশ্যের কল্পনা মাত্রই বাস্তবের বাড়া।
দাদা বলল, ‘তুই তো হাসছিস। আমার তখন যা অবস্থা। শেষটায় দেখি, মাথাটা তাজ্জিম তাজ্জিম করতে আরম্ভ করেছে। এত হুটোপুটি সত্ত্বেও ঘিলুতে খানিকটে ধুঁয়ো ঢুকে গিয়েছে নিশ্চয়ই। তার পর মনে হল বেশ কেমন যেন ফুর্তি ফুর্তি লাগছে, কীরকম যেন চিত্তাকাশে উড়ু উড়ুক্কু ভাব। তার পর দেখি, ম্যানেজারটা আমার দিকে কীরকম বেয়াদবের মতো ফিক ফি করে হাসছে। ওর তা হলে হয়েছে। কিংবা আমার। অথবা উভয়ের।
আর এস্থলে থাকা নয়।
টলটলায়মান, পড়পড়ায়মান হয়ে জিপে উঠলুম। সে-ও এক বিপদ। দেখি দুখানা জিপ। দুটোই ধুয়োটে কিন্তু হুবহু একইরকম। কোনটায় উঠি? শেষটায় দেখি আমার পাশে আমারই মতো কে একজন দাঁড়িয়ে। হুবহু আমারই মতো, আর টুপির ফুন্নাটি পর্যন্ত। দু জনাতে দুই জিপে উঠলুম।’
আমি বললুম, ‘দুটো জিপ না কচু!’
দাদা বলল, ‘বুঝেছি, বুঝেছি, তোকে আর বুঝিয়ে বলতে হবে না। শান্ত হয়ে শোন্। তার পর গাড়ি যায় কখনও ডাইনে ঢাকা, আর কখনও বায়ে মতিহারী। তবে কি ড্রাইভারটা–? সে তো সর্বক্ষণ আমারই পিছনে ছিল। তার পর দেখি সেই অন্য জিপটাও ঢাকা-মতিহারী করছে একদম পাশে পাশে থেকে। ওমা! তার পর দেখি চারটে জিপ। সে ও না-হয় বুঝলুম। কিন্তু তার পর, মোশয়, সে কী কাণ্ড! চারখানাই উড়তে আরম্ভ করল।’
আমি শুধালুম, ‘উড়তে!’
‘হ্যাঁ, উড়তে। জিপটাই তো ছিল ঠায় দাঁড়িয়ে। ধুয়ো খেয়েছিল আমাদের চেয়েও বেশি।
হাওয়ায় উড়তে উড়তে ঘুমিয়ে পড়লুম। এবং শেষপর্যন্ত বাঙলোয় পৌঁছলুম।
ভাগ্যিস বেশি ধুঁয়ো মগজে যায়নি। আপন পায়েই ঘরে ঢুকলুম।
সামনেই দেখি তোর ভাবী। আমার দিকে একদৃষ্টে তাকালেন। বাপ! তার পর অতি শান্ত কণ্ঠে– কিন্তু কী কাঠিন্য কী দার্চ সে কণ্ঠে– শুধালেন, “আপনি কোথায় গিয়েছিলেন?”
‘আমি কিছু বলিনি।’ দাদা থামলেন।
আমি আড্ডাকে বললুম, ‘আমার ভাবী সাহেবা অতিশয় পুণ্যশীলা রমণী, পাঁচ বেকৎ নামাজ পড়েন, রোজা রাখেন, তসবি টপকান। শমসুল-উলেমার মেয়ে।’
রক শুধাল, ‘ওটার মানে কী চাচা?’
আমি বললুম, ‘পণ্ডিত-ভাস্কর। তোদের মহামহোপাধ্যায়ের অপজিট নাম্বার।’
রক শুধাল, ‘তার পর?’
আমি বললুম, ‘তদনন্তর কী হল জানিনে। বউদি দাদার হাল থেকে কতখানি আমেজ করতে পেরেছিলেন তা-ও বলতে পারিনে, কারণ ঠিক সেই সময়ে ভাবী সায়েবা তাঁর স্পিশিলাটি চারপতি পরোটা ও দেখতে বজ্রের মতো কঠোর খেতে কুসুমের মতো মোলায়েম শবৃডেগ নিয়ে ঢুকলেন। আমরা খেতে পেলুম বটে কিন্তু কাহিনীটি অনাহারে মারা গেল।’
.
মশাদা বলল, ‘বিলকুল গুল।’
আমি পরম পরিতৃপ্তি সহকারে বললুম, ‘সাকুল্যে। তাই না বলেছিলুম, গাঁজার গুল। অর্থাৎ গুলের রাজা গুলমগির। তোরা আমাকে আজ ওই টাইটেলটি দিলি না?’
চার্লি চ্যাপলিন
আমার ছেলেবেলায় বায়স্কোপও ছেলেমানুষ ছিল। হরেকরকম ফিলিম তখন আসত; ছোট, বড়, মাঝারি– এখনকার মতো স্টান্ডার্ডাইজড নয়। সেনসর বোর্ড-ফোর্ডও তখন শিশু, এখনকার মতো ‘জ্যাঠা’ হয়ে ওঠেনি—’এটা অশ্লীল’, ‘ওটা কদর্য’, ‘সেটা বড়কর্তাদের নিয়ে মশকরা করেছে’ বলে দেশের-দশের রুচি মেরামত করার মতো হরিশ মুখুয্যে দি সেকেন্ড হয়ে ওঠেনি। কাজেই হরেক রুচির ফিলিম তখন এদেশে অক্লেশে আসত এবং আমরা সেগুলো গোগ্রাসে গিলতুম। তার ফলে আমাদের চরিত্র সর্বনাশ হয়েছে, একথা কেউ বলেনি। এবং আজ যে সেনসর বোর্ডের এত কড়াক্কড়ি, তার ফলে এযুগের চ্যাংড়া-চিংড়িরা যিশুখস্ট কিংবা রামকেষ্ট হয়ে গিয়েছে এ মশকরাও কেউ করেনি। তবু শুনেছি সেনসর বোর্ডের বিশ্বাস, বিস্তর ছবি ব্যান করলে শেষটায় ভালো ছবি বেরুবে। তাই যদি হয়, সাহিত্যের ক্ষেত্রেও একটা সেনসর বোর্ড লাগাও না কেন? কাকা-মামা-শালাদের চাকরি তো হবেই এবং সুবো-শাম হুদোহুদো বই ব্যান করার ফলে একদিন ইয়া দাড়িগোঁফ সমেত আরেকটি সমুচা রবিঠাকুর বেহেশত থেকে টুকুস্ করে ঢসকে পড়বেন– এই যেরকম হাওড়া ইস্টিশানের কল থেকে প্ল্যাটফর্ম টিকিট মিনস-ফর্সেপসে বেরিয়ে আসে।
আমি মাঝে মাঝে ভাবি, এরা কার রুচি রিফর্ম করতে চায়? আমার? সাবধান! পাড়ার ছোঁড়ারা আমায় মানে (ওরাই আমাকে মাঝেমধ্যে বায়স্কোপে নিয়ে যায়), শুনলে ক্ষেপে উঠবে। বোর্ডেরও প্রাণের ভয় আছে। তবে কি টাঙাওলা বিড়িওলাদের? ওহ! কী দম্ভ! ওদের রুচিতে ভণ্ডামি নেই। ওইটে পেলে আমি বর্তে যেতুম।
কিন্তু সে কথা থাক। এই সেনসরিং ব্যাপারটা দেশে-বিদেশে কী প্রকারে সমাধান হয় সে সম্বন্ধে আরেকদিন সবিস্তর আলোচনা করব। ইতোমধ্যে ছোট হিটলারদের স্মরণ করিয়ে রাখি বড়া হিটলাররা জার্মানিতে ‘অলকোয়ায়েট’ ফিলিম ব্যান করেছিল।
সেই যুগে হঠাৎ দেখা দিলেন মহাকবি চার্লি চ্যাপলিন– ভগবান তাঁকে দীর্ঘায়ু করুন।
