আইনস্টাইন একবার কোনও শহরের বড় স্টেশনে নেমে দেখেন বিস্তর লোক তাঁর দিকে এগিয়ে আসছে– যেন তাঁকে অভ্যর্থনা জানাতে চায়। বিনয়ী আইনস্টাইন শুধু পিছনের দিকে তাকান আর ডাইনে-বাঁয়ে সরে যান। নিশ্চয়ই তাঁর পিছনে কোনও ডাকসাইটে কেষ্টবিষ্ট আসছেন, সবাই এসেছে তাঁকেই বরণ করতে, আইনস্টাইন শুধু আনাড়ির মতো মধ্যিখানে বাধার সৃষ্টি করছেন।
কই? কেউ তো নেই? রাস্তা একদম ভোঁ– কলকাতার রেশনশপের গুদামের মতো। এরা এসেছে আইনস্টাইনের জন্যই।
আমাদের ভ্যাগাবন্ডটিও পিছনে তাকাল। এক্সট্রিমস মিটু। আইনস্টাইন খ্যাতির সর্বোচ্চ ধাপে, চার্লি নিম্নতম মাপে।
ফুল পেয়ে চার্লির মুখের ভাব। স্মিত হাস্যে মুখের দুই প্রান্ত দুই কানে ঠেকে গিয়েছে, শুকনো গাল দুটো ফুলে গিয়ে উপরের দিকে উঠে চোখ দুটো চেপে ধরেছে। চোখের কোণ থেকে রগ পর্যন্ত চামড়া কুঁচকে গিয়ে কাকের পায়ের নকশা ধরেছে, সে চোখ দুটো কিন্তু বন্ধ– আমার যেন মনে হল ভেজা-ভেজা ঠিক বলতে পারব না, কারণ আমার চোখও তখন। ঝাপসা হয়ে গিয়েছে।
সর্বক্ষণ ভয় হচ্ছিল, এইবার না চার্লি ভ্যাক করে কেঁদে ফেলে!
কে বলে সংসারে শুধু অকারণ বেদনা, নিদারুণ লাঞ্ছনা! পকড়কে লে আও উস্কো। এলিসের রানির হুকুম, ‘অফফফ উইদ হিজ হেড।’
মানুষের কলিজায় চার্লি পুকুর খোঁড়েন কী করে? দুঃখ, সুখ, করুণ, কৃতজ্ঞতা এসব রস আমাদের কলিজার গভীরতম প্রদেশে চার্লি সঞ্চারিত করেন কোন্ পদ্ধতিতে?
এক ইরানি কবি বলেছেন, ‘সর্ব জিনিসের হদ্দ– অর্থাৎ সীমা জানাটাই প্রকৃত সৃষ্টিকর্তার লক্ষণ।’
অর্থাৎ তাঁর বর্ণনায়, তাঁর অভিনয়ে চার্লি বাড়াবাড়ি করেন না। কারণ কে না জানে, একঘেয়েমির চূড়ান্তে পৌঁছয় মানুষ যখন ভ্যাচর-ভ্যাচর করে সবকিছু বলতে চায়, সামান্যতম জিনিস বাদ দিতে চায় না!
তাই অভিনব গুপ্ত, আনন্দবর্ধন বলেছেন, ‘ধ্বনি দিয়ে প্রকাশ করবে।’ ধ্বনি বলতে তারা ব্যঞ্জনা, ইঙ্গিত, সাজেসটিভনেস অনেক কিছুই বুঝেছেন।
যথা :
কুলটা রমণী পথিককে বলছে, ‘হে পথিক, এই ঘরে রাত্রিকালে আমার বৃদ্ধ শ্বশুর-শাশুড়ি শয়ন করেন, ওই ছোট ঘরে আমি একা থাকি, আমার স্বামী বিদেশে। তুমি এখন যাও।’
ইঙ্গিত সুস্পষ্ট।
অর্থাৎ চার্লি যেটুকু অভিনয় করেন, সে তো করেনই; সঙ্গে সঙ্গে আমরা সকলেই অনেকখানি অভিনয় করে নিই।
হালে চার্লি সুখবর দিয়েছেন, তিনি আবার সেই ‘লিটল ম্যান, সেই ভ্যাগাবন্ডকে পুনর্জন্ম দেবেন। তার যা বলবার তিনি তারই মারফতে শোনাবেন। শুনে আমরা উল্লসিত হয়েছি। ‘মঁসিয়ো ভের্দু’, ‘লাইম-লাইট’ উৎকৃষ্ট অতুলনীয় রসসৃষ্টি কিন্তু আমরা সেই ভ্যাগাবন্ডকে বড্ড মিস্ করছি।
চার্লি ভ্যাগাবন্ডকে বর্জন করেছিলেন কেন?
হয়তো ভেবেছিলেন সব কথা ওই একইজনের মারফতে বলা চলে না। আমাদের ভ্যাগাবন্ডের পক্ষে সবাইকে তো বিষ খাইয়ে খাইয়ে ‘বিজনেস্ ইস্ বিজনেস্’ বলে এলোপাতাড়ি বিধবাহনন করা যায় না– তাই ভের্দুর সৃষ্টি।
ঠিক এই কারণেই কোনান ডয়ল শার্লক হোমসকে মেরে ফেলে প্রফেসর চ্যালেঞ্জার সৃষ্টি করেছিলেন।
রবীন্দ্রনাথও তাই গদ্য কবিতা ধরেছিলেন। এই উদাহরণটাই ভালো।
কিন্তু রবীন্দ্রনাথ পদে পদে দেখলেন তাঁর কবিতায় পদে পদে মিল এসে যাচ্ছে, ছন্দ এসে যাচ্ছে। যাবেন কোথায়? পঞ্চাশ বছরের অভ্যাস। নাচার হয়ে মিলগুলো লাইনের শেষে না এনে মাঝখানে ঢুকিয়ে দিতে লাগলেন– শাক ঢাকা দিয়ে মাংস খাওয়ার মতো।
শেষটায় বললেন, ‘দুত্তোচ্ছাই! যাই ফিরে ফের মিল ছন্দে।’ রবীন্দ্রনাথের গবিতা নিকৃষ্ট নয়, রবীন্দ্রনাথের গবিতা উত্তম কবিতা, এই বাঙলা দেশে একমাত্র তিনিই সার্থক ‘গবি’, কিন্তু সোজা কথা তিনি বুঝে গেলেন যে কবিতার মিল ছন্দ বজায় রেখেও তাঁর যা বক্তব্য তা তিনি বলতে পারবেন। ফিরে গেলেন কবিতায়।
চার্লি যখন ভের্দু করছেন, তখন আমরা পদে পদে দেখতে পাচ্ছি তাঁর পিছনে ভ্যাগাবন্ডকে। তিনি আপ্রাণ চেষ্টা করছেন তাকে লুকোবার জন্যে– রবীন্দ্রনাথ যেরকম মিল লুকোবার চেষ্টা করেছিলেন গবিতায়– কিন্তু আমরা তাকে বারবার দেখতে পাচ্ছি। বারবার মনে হয়েছে, ‘আহা এ জায়গায় যদি আমাদের ভ্যাগাবন্ডটি থাকত তবে সে সিচুয়েশনটা কী চমৎকারই না একসপ্লয়েট করতে পারত!’
চার্লিও সেটা বুঝেছেন। যে ভ্যাগাবন্ডকে এতদিন একটুখানি জিরিয়ে নিলেন, তাকে চার্লি আবার ঘরের ভিতর থেকে টেনে আমাদের চোখের সামনে তাকে দিয়ে বাউণ্ডুলেপনা করাবেন।
সুসংবাদ!!
————
১. পাঠক ভাববেন না, আমি কলকাতা বা দিল্লির বোর্ডের কথা ভাবছি। আমি সর্ববিশ্বের জীবিত ও মৃত সর্ব বোর্ডের কথা ভাবছি। শ’ যেরকম ‘কুইনজ রিডার অব প্লেজ’-এর স্মরণে আপন মন্তব্য বিশ্ব-বোর্ডের উদ্দেশে লিখেছিলেন।
ছুছুন্দর কা সিরপর চামেলি কা তেল
লিঙ্গোয়াফোন রেকর্ডের কথা অনেকেই শুনেছেন। এ রেকর্ডগুলোর সাহায্যে দেশি-বিদেশি যেকোনো ভাষা অতি চমৎকার রূপে শেখা যায়। রেকর্ডগুলোতে বড় বড় ভাষা এবং উচ্চারণবিদরা গোড়ার দিকে খুব সহজ ভাষায় কথাবার্তা বলেছেন ক্রমে কঠিন থেকে কঠিনতর হয়ে শেষের রেকর্ডগুলোতে এমনি বেগে বলেছেন যে, সেটা আয়ত্ত করতে পারলে আপনি সে ভাষায় নিজেকে ওকিবহাল বলে পরিচয় দিতে পারবেন। প্রথম একখানা রেকর্ড নিয়ে বারবার সেটা শুনতে হয়। তার পর প্রশ্নকর্তা ও উত্তরদাতার সঙ্গে গলা মিলিয়ে, সামনে পাঠ্যপুস্তকের দিকে চোখ রেখে উচ্চারণ করে যেতে হয়। পাঠ্যপুস্তকে আবার ‘অনুশীলন’ও থাকে। সঙ্গে সঙ্গে সেগুলোও করতে হয়। ‘কি’ দেওয়া আছে। তাই দিয়ে ভুলগুলো মেরামত করে নিতে হয়।
