ইতোমধ্যে উপস্থিত হল আরেক সঙ্কট।
গেল বছরের গাঁজাতে গুদোম ভর্তি। এদিকে হাল বছরের গাঁজা ক্ষেতে তৈরি। তুলে গুদোমজাত করতে হবে। নতুন গুদোম এক ঝটকায় তৈরি করা যায় না– শেষটায় হয়তো জিনিভা কোনও পারমিটই দেবে না, কিংবা এত অল্প দেবে যে বেবাক ব্যবসাই গুটোতে হবে। নয়া গুদোমের কথাই ওঠে না।
তখন নানা চিন্তা, বহু ভাবনা, ততোধিক কর্তৃপক্ষকে আলোচনা করে স্থির করা হল, ‘গেল বছরের গাঁজা পোড়াও–’
আড্ডার কেউই গঞ্জিকা-রসিক নয়। তবু সবাই– টেটেন ছাড়া– এক কণ্ঠে হায় হায় করে উঠল। খাই আর না-ই খাই, একটা ভালো মাল বরবাদ হতে দেখলে কার না দুঃখ হয়! রায়টের সময় পার্ক সার্কাসের মদের দোকানে বোতল ভাঙা হচ্ছে দেখে এক টেম্পারে পাদ্রিকে পর্যন্ত আমি শোক করতে দেখেছি।
স্টাটিসটিশিয়ান টেটেন বলল, ‘আপনারা এতে এমন কী নতুন শোক পাচ্ছেন? মার্কিনরা যে দু দিন অন্তর অন্তর অঢেল গম লিটুরিলি অ্যান্ড মেটফরিক্লি দরিয়ায় ভাসিয়ে দেয় সে বুঝি জানেন না?’ টেটেনই আমাদের মধ্যে ইংরেজিতে এম-এ। ওর উচ্চারণ আমাদের বুঝতে কষ্ট হয়।
সবাই হ্যাঁ হ্যাঁ বলার পর আমি গল্পের খেই ধরে এবং সিগারেট ধরিয়ে বললুম, ‘তার পর?’ দাদা বলল, ‘গুদোমেতে নতুন মাল পোরা হবে। ম্যানেজারকে বললুম, আমি অমুক দিন যাব, সেদিন পুরনো মাল পোড়ানো হবে। কারণটা তাকে আমি আর বললুম না। সেই যে তুই জানিস নাকি? বড়দা তোকে বলেছেন, তিনি যখন জাপানি বোমার সময় ট্রেজারি অফিসার ছিলেন তখন হুকুম এল জাপানি বোমা পড়লে, ব্যাপক বিপদের সম্ভাবনা দেখা দিলে ট্রেজারির তাবৎ করেনসি নোট পুড়িয়ে ফেলবে। ভাইজাগা না কোথাকার এক সুবুদ্ধিমান একটিমাত্র বোমা পড়ামাত্রই সরকারকে খবর দিল সে সব নোট পুড়িয়ে ফেলেছে। তার পর দু বছর বাদে তাজ্জবকি বাত, বাজারে সেসব নোটের দর্শন পাওয়া যেতে লাগল। পোড়ায়নি। সরিয়ে ফেলেছিল। আমার তাই ভয়, গাঁজার বেলাও ওই যদি হয়।
আগেভাগে দিনক্ষণ দেখে অর্থাৎ টুর প্রোগ্রাম যথা-যথাস্থানে পাঠিয়ে দিয়ে বেরোলুম গাঁজা পোড়াতে।’
আমি আঁতকে উঠে বললুম, ‘কী বললে?’
দাদা ঈষৎ চিন্তা করে বলল, ‘হ্যাঁ তা তো বটেই।’ “গাঁজা পোড়ানো” কথাটার অর্থ “গাঁজা খাওয়া”ও হয়। তাই শুনেছি, ছোকরা নাতির হাতে সিগারেট দেখে যখন ঠাকুরদা গম্ভীরকণ্ঠে তাকে বলল, ‘জানিস, সিগারেট মানুষের সবচেয়ে বড় শত্রু’– সে তখন শান্ত কণ্ঠে উত্তর দিয়েছিল, ‘তাই তো ওকে পোড়াতে যাচ্ছি।’
মোকামে পৌঁছে দেখি বিরাট ভিড়। বিশখানা গাঁয়ের বাছাই বাছাই লোক জমায়েত হয়েছেন সেখানে গাঁজা পোড়ানো দেখবেন বলে। আমি তো অবাক। বাঁশ-পাতা পোড়ানো আর গাঁজা-পাতা পোড়ানোতে এমন কী তফাত যে দুনিয়ার লোক হদ্দমুদ্দ হয়ে জমায়েত হবে? তা সে যাক গে।
হুদো হুদো গাঁজা ওজন করে হিসাব মিলিয়ে ডাঁই ডাঁই করে মাঠের মধ্যিখানে রাখা হল। তার পর চোখের জল মুছতে মুছতে ম্যানেজারই মুখাগ্নি করল। সে-ই তার জনক– একে দিয়ে তার বহু পয়সা কামাবার কথা ছিল।
সেদিন বাতাসটা ছিল একটু এলোমেলো। গাঁজার ধুঁয়ো ক্ষণে এদিকে যায়, ক্ষণে ওদিকে যায়। আর তখন দেখি অবাক কাণ্ড! পাতা পোড়াবার সময় যেদিকে ছুঁয়ে যায় মানুষ সেদিক হতে সরে যায়। আজ দেখি উল্টী বাত। জোয়ান-বুড়ো, মেয়েমদ্দে– হ্যাঁ, কয়েকটি মেয়ে-ছেলেও ছিল– ছোটে সেদিকে।
আর সে কী দম নেওয়ার বহর! সাঁই সাঁই শব্দ করে সবাই নাভিকুণ্ডুলী পর্যন্ত ভরে নিচ্ছে সেই নন্দন-কাননের পারিজাত-পাপড়ি পোড়ানোর খুশবাই– অন্তত তাদের কাছে তাই। আমার নাকে একবার একটুখানি ঢোকাতে আমি তো কেশে অস্থির। আর ওরা ফেলছে কী পরিতৃপ্তির নিশ্বাস—‘আহ, আহ্!’ কেউ খাড়া হয়ে দাঁড়িয়ে, কোমরে দু হাত রেখে, আকাশের দিকে জোড়া মুখ তুলে নাসারন্ধ্র স্ফীত করে নিচ্ছে এক-একখানা দীর্ঘ দম, আর ছাড়ছে দীর্ঘতর ‘আহ্–!’ শব্দ। কেউ-বা মাটিতে বসে ক্যাবলাকান্তের মতো মুখ হাঁ করে আস্য মার্গ দিয়ে যৌগিকধূম্র গ্রহণ প্রশস্ততর মনে করছে।
হঠাৎ হাওয়া ওলটাল। তখন পড়িমড়ি হয়ে সবাই ছুটল সেদিকে। আমি, ম্যানেজার, সেরেশতাদার ততোধিক পড়িমড়ি হয়ে ছুটলুম অন্যদিকে। দু একটি চাপরাসি দেখি মনস্থির করতে পারছে না। তাদের আমি দোষ দিইনে।
ভেবে দেখ, পৃথিবীতে এ ঘটনা ইতিপূর্বে আর কখনও হয়েছে? গাঁজা তো আর কোথাও ফলানো হয় না। তারই মণ মণ পুড়িয়ে একচ্ছত্র গঞ্জিকাযজ্ঞ। চতুর্দিকে গরিব-দুঃখী বিস্তর। এক ছিলিমের দম বাজারে কিনতে গেলে এদের দম বেরিয়ে যায়। আর এখানে লক্ষ লক্ষ তাওয়া পোড়ানো হচ্ছে আকাশ-বাতাস টইটম্বুর করে। হয়তো ধরণীর সুদীর্ঘ ইতিহাসে এই শেষ যজ্ঞ।
আমি তো সায়েন্সের ছাত্র ছিলুম। তোদের কোনও এক ঔপন্যাসিক নাকি সদর রাস্তায় মদের পিপে ফেটে যাওয়ার বর্ণনা দিয়েছে। আমি তার ট্রেলার বাইস্কোপে দেখেছি। কিছু না। ধুলোখেলা। সেখানে সবাই করছে মালের জন্য হুটোপুটি একই দিকে। এখানে বিরাট জিরগা-জলসার জনসমাজ দিকনির্ণয় যন্ত্রের অষ্টকোণ চষে ফেলছে– ধুয়ো যখন যেদিকে যায় সেদিকে। এবং সঙ্গে সঙ্গে উল্টোদিকে ছুটছি আমরা কয়েকজন। রবীন্দ্রনাথ নাকি “জাগ্রত ভগবান”কে ডেকেছিলেন তাঁকে “জনসমাজ-মাঝে” ডেকে নেবার জন্যে! আমি পরিত্রাহি চিৎকার ছাড়ছি, অবশ্য মনে মনে– আল্লাতালা যেন এই আমামুন্নাস, এই “জনসমাজ” থেকে আমাকে তফাত রাখেন।
