তার এসব কল-কায়দা করা সত্ত্বেও আমরা তখন পাখা, খবরের কাগজ হাতের কাছে যা পাই তাই দিয়ে মুখ ঢাকি। আমি স্বয়ং ছাতা ব্যবহার করি।
অজনদা বলল, এবারে আপনি আপনার উপাধি-প্রাপ্তির সম্মানার্থে একটি সরেস গুল ছাড়ুন তো, চাচা।’
মশা বলল, ‘কিংবা, গাঁজা।’
আমি বললুম, ‘যদি ছাড়ি গাঁজার গুল?’
ঘেন্টু বলল, ‘চাচাকে নিয়ে তোরা পারবিনে রে, ছেড়ে দে।’ ঘেন্টুর পাড়াদও নাম ঘন্টু। আমি নাম দিয়েছি ঘেন্টু। যবে থেকে আমার চর্মরোগ হয়েছে। ঘেন্টু চর্মরোগের জাগ্রতা দেবী। বিশ্বেস না হলে চলন্তিকা খুলে দেখুন।
আমি বললুম, ‘তবে শোন্। কিন্তু তার পূর্বে টেটেনকে সাবধান করে দিচ্ছি, সে যেন আমার গাঁজার গুল নিয়ে কোনও সোসিয়ো-পোলিটিকো-ইকনমিক-স্টাটিসটিকস সঞ্চয় না করে। সে আজকাল ওই নিয়ে মেতেছে।’
টেটেন নানাবটি কেস পড়ছিল। বলল, ‘আপনি কিসসুটি জানেন না, চাচা। আপনার জানা নেই, এ সংসারে মিথ্যাবাদী আছে এবং তার চেয়ে বড় মিথ্যাবাদীও আছে এবং সর্বশেষে স্টাটিসটিশিয়ানদের কথা ভুলবেন না। ওদের মাল নিয়েই তো সরকার গুল মারে। নিত্যি নিত্যি কাগজে দেখতে পান না? আমি আপনার দোরে যাব কেন?’
‘তবে শোন’, নিশ্চিন্ত হয়ে বলি।
‘পার্টিশেনের বছরখানেক পরের কথা। আমার মেজদা ওপার বাংলার কোথায় যেন কী একটা ডাঙর নোকরি করেন। তাঁর সঙ্গে দেখা। আমরা এখন দুই ভিন্ন ভিন্ন স্বাধীন দেশের অধিবাসী। কিন্তু আমাদের ভিতর কোনও ঝগড়া-কাজিয়া নেই। এই অ্যাদ্দিন বাদে নেহরুজি আর আইয়ুব খান সায়েব সেটা বুঝতে পেরে আমাদের শুভ-বুদ্ধি এক্তেয়ার করেছেন। তা সে যাক গে।
হিন্দুস্থানের বিস্তর দরদ-ভরা তত্ত্বতাবাশ করে মেজদা শুধাল, ‘তোদের দেশে গাঁজার কী পরিস্থিতি?’
আমি একগাল হেসে বললুম, ‘স্বরাজ পেয়ে বাড়তির দিকে।’
মেজদা আশ্চর্য হয়ে শুধাল, ‘সে কী রে! কোথায় পাচ্ছিস? আমি তো চালান দিতে পারছিনে!’
আমিও অবাক। শেষটায় বোঝা গেল, দাদা ছিলিম মেরে শিবনেত্র হওয়ার সত্যিকার গাঁজার কথা বলছে। আমি কী করে জানব? আমি পাষণ্ড বটি, –দাদা ধর্মভীরু, সদাচারী লোক।
দাদা বলল, ‘শোন্।’
পার্টিশেনের ফলে মেলা অচিন্তিত প্রশ্ন, নানা ঝামেলা মাথাচাড়া দিয়ে খাড়া হয়ে উঠল এবং তারই সর্বপ্রধান হয়ে উঠে দাঁড়াল গঞ্জিকা-সমস্যা।
গাঁজার এত গুণ আমি জানতুম না। শুনতে পেলুম, স্বয়ং জাহাঙ্গীর বাদশা নাকি গাঁজা খেয়ে উভয়ার্থে অচৈতন্য হয়েছিলেন। সেটা নাকি তুজুক-ই-জাহাঙ্গিরিতে আছে। গাঁজা ছাড়েন শেষটায় তিনি মনের দুঃখে। এর দাম অতি সস্তা বলে সেটা পোষায় না রাজা-বাদশাদের রাজসিক জাত্যভিমানে। সে কথা যাক।
আমার এলাকায় পৃথিবীর বৃহত্তম গাঁজার চাষ এবং গুদোম। ভারতে গাঁজার চাষ প্রায় নেই। আমি এসব তত্ত্ব জানতুম না– সমস্ত জীবন কাটিয়েছি আসামে, বরঞ্চ চায়ের খবর কিছুটা রাখি; এসব গুহ্য রহস্যের খবর দিয়ে গাঁজা ফার্মের ম্যানেজার আমাকে একদিন দুঃসংবাদ দিল, সে বছরের গাঁজা গুদোমে পচে বরবাদ হব-হব করছে। ইন্ডিয়াতে চালান দেবার উপায় নেই অথচ সেখানেই তার প্রধান চাহিদা।’
আমি শুধলুম, ‘কেন? তুমি নিজে খাও না বলে অন্য লোকেও খাবে না? এ তো বড় জুলুম।’
দাদা বলল, ‘কী জ্বালা! আমি শ্রীঘরবাস পছন্দ করিনে; তাই বলে আমি জেল তুলে দিয়েছি নাকি? সাধে কি বলি তুই একটি চাইল্ড় প্রডিজি– ওয়ান্ডার চাইলড– চল্লিশ বছরে তোর যা জ্ঞানগম্যি হল, আল্লার কুদরতে পাঁচ বছর বয়েসেই সেটা তুই অর্জন করে নিয়েছিলি।’
আমি চটে গিয়ে বললুম, ‘আর তুমি বিয়াল্লিশে।’ দাদা আমার চেয়ে দু বছরের বড়।
দাদা বলল, ‘তোর রসবোধ নেই। ঠাণ্ডা হ।’
রকফেলারদের দিকে তাকিয়ে বললুম, ‘এসব মাইনর বর্ডার ইনসিডেন্ট আমাদের ভিতরে কালে-কস্মিনে হয়, কিন্তু মিটমাট হয়ে যায় ‘আকাশ-বাণী’, ‘ঢক্কা-ডিংডমে’ পৌঁছবার পূর্বেই।’
অজনদা শুধোল, ‘ঢক্কা-ডিংডমটা কী চাচা?’
‘ডিংডম্ মানে জগঝম্প, বিরাট ঢাক, যার থেকে ইংরেজি ‘টমটম’ ‘টমটমিং’ শব্দ এসেছে। অর্থাৎ ঢাকার বেতার কেন্দ্র। তার পর শোনো :
দাদা বলল, ‘ভয়ংকর পরিস্থিতি। ভারতের ষাট হাজার সন্ন্যাসী নাকি রাষ্ট্রপতির কাছে সই, হাতের টিপ দিয়ে আবেদন জানিয়েছেন, গাঁজার অভাবে তাঁদের নানাবিধ কষ্ট হচ্ছে, আত্মচিন্তার ব্যাঘাত হচ্ছে।–’
আমি গোশা করে বললুম, ‘দেখো দাদা, পিতা গত হওয়ার পর অগ্রজ পিতৃতুল্য। কিন্তু তুমি যদি আমাদের সন্ন্যাসীদের নিয়ে মশকরা করো—’
বাধা দিয়ে দাদা বেদনাতুর কণ্ঠে বলল, ‘দেখ ভাই, তুই কখনও দেখেছিস যে আমি কাউকে নিয়ে–’
এবারে আমি বাধা দিয়ে বললুম, ‘থাক থাক। তুমি বলো।’ দাদার ওই গলাটা আমি বড়ই ডরাই। ওটা দাদা ব্যবহার করে পঞ্চাশ বছরে একবার। দাদার বয়স তখন বিয়াল্লিশ।
দাদা তো আমাকে মাফ করবার জন্য তৈরি। চশমার পরকলা দুটো পুঁছে নিয়ে বলল, ‘পূর্বেই বলেছি, পার্টিশেনের ফলে বিস্তর অভাবিতপূর্ব সমস্যা দেখা দিল– এটা তারই একটা। পার্টিশেনের পূর্বে সান্তাহারের গাঁজা যেত হরিদ্বারে অক্লেশে, বাঙালোরের বিয়ার আসত ঢাকায় লাফিয়ে লাফিয়ে। এখন মধ্যিখানে এসে দাঁড়াল এক দুশমন। জিনিভাতে কবে কে আইন করেছিল বিশ্বজনের কল্যাণার্থে কল্যাণ না কচু তার সারমর্ম এই : আপন দেশে তুমি সার্বভৌম রাজা, যা খুশি করতে পার, যত খুশি তত আফিঙ ফলিয়ে বিক্রি করতে পার, গাঁজা চালাতে পার– কিন্তু ভুলো না, আপন দেশের চৌহদ্দির ভিতর। এস্পোর্ট করতে গেলেই চিত্তির। তখন জিনিভার অনুমতি চাই। যেমন মনে কর, ফিনল্যান্ড জিনিভার মারফতে তোদের কাছে চাইল দু মণ আফিঙ– ওষুধ বানাবার জন্য। জিনিভা সন্দেহে গোয়েন্দা লাগাবে জানবার জন্যে, সত্যি ওষুধ বানাবার জন্য ফিনল্যান্ডের অতখানি প্রয়োজন কি না, কিংবা ওরই খানিকটে আক্ৰা দরে বাজারে বিক্রি করে, দেশের লোককে আফিঙখোর বানিয়ে দু পয়সা কামিয়ে নিতে চায় কি না। কারণ কোনও কোনও দেশ নাকি বিদেশের ওষুধ বানানেওয়ালাদের সঙ্গে ষড় করে ওষুধের অছিলায় বেশি বেশি হশিশ, ককেইন রপ্তানি করে সেসব দেশের বহু লোকের সর্বনাশ করেছে। আইনগুলো আমি পড়ে দেখিনি, তাই ঠিক ঠিক বলতে পারব না– নির্যাসটি জানিয়েছিল গাঁজা ফার্মের ম্যানেজার। এখন নাকি জিনিভার পারমিশন চাই, সেটা পেতে কতদিন লাগবে তার ঠিকঠিকানা নেই, কতখানি পাঠানো যাবে তার স্থিরতা নেই।
