একটু হেসে বললেন, ‘আপনার মুখে “লায়লী” বেশ মিষ্টি শোনায়।’
সববোনাশ! সববোনাশ!! এ যে ডবল এটাক! পিনসার মুভমেন্ট!
ওড়নাটি ভালো করে গায়ে জড়িয়ে নিয়ে চেয়ারে যেভাবে চেপে বসলেন তাতে বুঝলুম যে এর গায়ে কাবুলি রক্ত আছে। উত্তর না নিয়ে উঠবেন না।
মুখের দিকে তাকিয়ে দেখি, চোখ দুটি বন্ধ– বড় শান্ত প্রশান্ত নিস্তব্ধ ভাব। ওই বেশ পরা না থাকলে মনে হতো তপস্বিনী, কঠোর ব্রতচারিণী সুফি রমণী।
আমি আস্তে আস্তে বললুম, ‘আমার মনে হয়–,’ থামলুম। কোনও উত্তর নেই।
কিছুক্ষণ পর ফের বললুম, ‘আমার মনে হয়–’
অল্প একটু ‘উ’ শুনতে পেলুম।
‘–যে পুণ্যবান লোকের কোনও কামনা আল্লাতালা অপূর্ণ রাখেন না।’
***
আমি জানি, চতুর্দিকে তখন হই-হুল্লোড়। কিন্তু আমার মনে হল যেন আমি মরুভূমির মাঝখানে দুপুররাত্রে জেগে উঠেছি। দিবাভাগের আতপতাপে দগ্ধ সর্ব কাফেলার মানুষ উট গাধা মোড়া সবাই অকাতরে ঘুমুচ্ছে। আকাশের নৈস্তব্ধ্যকেও যেন মরুভূমির নৈঃশব্দ্য হার মানিয়েছে। কোথা থেকে এল এ শান্তি, এ বিধান? তাকিয়ে দেখি, লায়লার মুখ থেকে।
ততক্ষণে জভেরি শ্যাম্পেন নিয়ে ফিরেছে।
লায়লা উঠে বললেন, ‘আপনার কথা ঠিক।’
তার পর জভেরিকে রাজেশ্বরীর কণ্ঠে বললেন, ‘তুমি থাকো। আমি এঁকে বাড়ি পৌঁছে দিচ্ছি।’
গাড়িতে একটি কথাও হয়নি।
আমি নামবার সময় তাঁকে ‘আদাব আরজ, খুদা হাফিজ’ বললুম। তিনি সযত্নে আমার ডান হাত আপন দু হাতে ধরে মৃদু চাপ দিলেন। সে চাপে ছিল বন্ধুত্ব, সহৃদয়তা। ফি-স্টারের হাতের চাপ আমি এর আগে, এখন এবং এর পরেও কখনও পাইনি।
মধ্যরাত্রি অবধি খাটে শুয়ে শান্তি অনুভব করেছিলুম।
রাত তিনটেয়, বোধহয়, একবার ধড়মড় করে জেগে উঠে ফের শুয়ে পড়েছিলুম।
***
সকালে উঠে দেখি, জভেরি ব্যাঙ্কে চলে গিয়েছে।
তার পর দেখি, পূর্বরাত্রির প্রসন্নতা মন থেকে সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছে।
কী যেন এক অজানা অস্বস্তির ভাব সর্বদেহমন অসাড় বিকল করে দিয়েছে।
ফোন বাজল। জভেরি চিৎকার করে কী বলছে।
‘শোনো, কাল রাত তিনটেয় শমশাদ আত্মহত্যা করেছে। দুটো চিঠি রেখে গিয়েছে। একটা পুলিশকে, একটা তোমাকে। তোমার চিঠিটার নকল যোগাড় করেছি। লিখেছে, ‘মাই ডিয়ার এম, তোমার কথাই ঠিক। আমি চললুম। দেখা যখন তার সঙ্গে হবেই তখন আর দেরি করে লাভ কী? আমি জানি আত্মহত্যা পাপ। আমার পুণ্যের বদলে এটা মাফ হয়ে যাবে।’
এখন মনে পড়ছে সন্ধ্যার সময় জভেরি বাড়ি এসে আমার হাত থেকে ফোন নামিয়েছিল।
এ-জীবনে এই প্রথম ধর্মোপদেশ দিয়েছিলুম। আর এই শেষ।
গাঁজা
কিংবা গুলও বলতে পারেন। সদাশয় ভারত সরকার যখন আমাকে কিছুতেই ‘পদ্মশ্রী’ ‘পদ্মবিভূষণ’ জাতীয় কোনও উপাধিই দিলেন না, এবং শেষপর্যন্ত শিশির ভাদুড়ী পেয়েও সেটি বেয়ারিং চিঠির মতো ফেরত দিলেন তখন হাজরা রোডের রকফেলাররা (অর্থাৎ যাঁরা রকে অন্তত এক লক্ষ গুল মেরে লক্ষপতি রক্ফেলার হয়েছেন) সাড়ম্বরে আমাকে ‘গুলমগির’ উপাধি দিলেন।
হালের কথা। বর্ষার ছদ্মবেশ পরে শরৎ নেমেছেন কলকাতার শহরে। বাড়ির আঙিনায় হাঁটুজল, রাস্তায় কোমর। সেই জল ভেঙে ভিজে জগঝম্প হয়ে তাবৎ ‘ফেলাররাই’ উপস্থিত, এসেই বসলেন টেলিফোনটি মাঝখানে রেখে। তার পর সবাই আপন আপন আপিস আদালত কারখানা-শুড়িখানাতে খবর পাঠালেন, কী ভয়ঙ্কর জল দাঁড়িয়েছে রাস্তায়। বাড়ি থেকে বেরুনো সম্পূর্ণ অসম্ভব। নৌকো ভাড়ার চেষ্টা করছি। আপিসে আজ না আসতে পারলে কয়েকটা ভিজিটার ফিরে যাবে। সর্বনাশ হবে। কী করি বলুন তো?
মশাদা’র এরকম সকরুণ বেদনার গন্ধটলা আপিস-প্রীতি এর পূর্বে আমি কখনও দেখিনি। রকে আসতে তাকে বুক ভেজাতে হয়েছে, এখন তার চোখ ভেজা অথচ তার বাড়ি থেকে যেদিকে আপিস সেদিকে যেতে হাঁটু পর্যন্ত ভেজাতে হয় না।
আমাদের রকটি সংমিশ্রিত; অর্থাৎ দু-চারটি চিংড়ি সদস্যও আছেন। আবার ফণি-কাকার বয়স ষাট পেরিয়েছে, গুড়গুড়ির বয়স পাঁচ পেরোয়নি। এরা মাঝে-মধ্যে থাকলে আমাদের একটু সামলে-সুমলে কথা কইতে হয়।
মশাদার প্যাঁচটা দেখে টেটেন মারল ডবল প্যাঁচ। অজন সেনকে বলল, ‘অজনদা, আমার আপিসকে ঝপ করে একটা ফোন করে দিন তো, আমি আপিসে বেরিয়ে গিয়েছি, পৌঁছেছি কি না!’
অজনদা আরও তৈরি মাল। নম্বর পেয়ে খবরটা দিয়ে কী একটা শুনে আঁতকে উঠে বললে, ‘কী বললেন? পৌঁছয়নি? বলেন কী মশাই? বড় দুশ্চিন্তায় ফেললেন তো!’
নিশ্চিন্ত হওয়া গেল।
অজনদার নিজের কোনও ভাবনা নেই। তার আপিসে মাত্র একটি কল। সেটা সে প্রায়ই আপিস ছাড়ার পূর্বে বে-কল করে আসে।
এবারে আমরা শান্ত মনে সমাহিত চিত্তে কর্তব্যকর্মে মন দিলাম।
অজন বুঝিয়ে বলে, ‘আলম অর্থাৎ দুনিয়া জয় করে পেলেন বাদশা আওরঙ্গজেব ওই আলমগির নাম। সেই ওজনে আপনি গুলমগির।’
আমি বললুম, ‘হাসালি রে হাসালি! এ আর নতুন কী শোনালি? প্রথম আমি পরীস্তানে ছিলুম গুল্-ই-বকাওলি, তার পর লন্ডনে নেমে হলুম ডিউক অব গুলস্টার, তার পর ফ্রান্সে হলুম দ্য গুল, তার পর পাকিস্তানে হলুম গুল মুহম্মদ, এখানে এসে হলুম গুলজারিলাল নন্দ। তা ভালো, ভালো। গুলমগির! বেশ বেশ।’
বড়দা উপর থেকে রকে নামেন ক্বচিৎ-কস্মিন। বললেন, ‘ল্যাটে– ল্যাটে বুঝলেন।’ বড়দার মুখ হামেহাল পানের পিকে ভর্তি। তারই মহামূল্যবান একফোঁটা পাছে বরবাদ হয়, সেই ভয়ে তিনি আকাশের দিকে মুখ তুলে স্বর্গের দিকে ঠোঁটদুটি সমান্তরাল করে সেই দুটিকে মুখের ভিতরের দিকে বেঁকিয়ে দিয়ে ‘ত’, ‘দ’-কে ‘ট’, ড’, করে কথা বলেন– অল্পই।
