কিরীটী চোখ মেলে দেখল শয্যার ঠিক সামনেই দাঁড়িয়ে সবিতা। তার চোখেমুখে সুস্পষ্ট উদ্বেগ।
কি হয়েছে সবিতা দেবী?
আপনি শীগগির একবার নিচে চলুন। লক্ষ্মীকান্তবাবু এসেছেন। নায়েব কাকাকে arrest করে নিয়ে যাচ্ছেন—এ সব কি মিঃ রায়! নায়েব কাকাকে arrest করছেন কেন?
কিরীটী শয্যা ত্যাগ করে উঠে দাঁড়িয়ে জামাটা গায়ে দিতে দিতে বলে, কেন লক্ষ্মীকান্ত সাহা নায়েব মশাইকে arrest করেছেন আমি কেমন করে তা বলবো বলুন? তা তিনি কিছু বলেননি কেন ওঁকে তিনি arrest করছেন?
না। কেবল বললেন—এ সব পুলিসের সিক্রেট ব্যাপার, সকলের কাছে বলতে তিনি রাজী নন।
এক্ষেত্রে আমিই বা তাহলে কি করতে পারি বলুন? নির্লিপ্তভাবে কিরীটী জবাব দেয়।
কিন্তু আমাদের তো একটা প্রতিবাদ করা উচিত।
পূর্বের মতই পরম নির্বিকার ও শান্তভাবে জামার বোতামগুলো লাগাতে লাগাতে কিরীটী বলল, পুলিসের কোন কাজে প্রতিবাদ করলে তো তারা আপনাকে সমর্থন করবে না সবিতা দেবী!
তাই বলে অন্যায় জুলুম! সবিতার কণ্ঠস্বর রুদ্ধ হয়ে আসে।
অন্যায় জুলুমই যে তাই বা কি করে আপনি বুঝলেন? চলুন দেখি!
কিরীটী প্রস্তুত হয়ে নিতে নিতে বললে। উভয়ে নিচে বসন্ত সেনের ঘরের মধ্যে এসে প্রবেশ করল।
ঘরের মধ্যে দুখানা চেয়ারে মুখোমুখি নিঃশব্দে বসে আছেন বসন্ত সেন, থানার দারোগা লক্ষ্মীকান্ত সাহা আর একপাশে চুপ করে দাঁড়িয়ে সত্যজিৎ।
ওদের পদশব্দে বসন্ত সেন ও লক্ষ্মীকান্ত দুজনেই মুখ তুলে তাকালেন।
নমস্কার লক্ষ্মীকান্তবাবু। ব্যাপার কি! এত সক্কালেই? প্রশ্ন করে হাসিমুখে কিরীটী আর একটু এগিয়ে যায় ঘরের মধ্যে।
লক্ষ্মীকান্তর মুখখানা অত্যন্ত গম্ভীর। গম্ভীর কণ্ঠেই প্রতিনমস্কার জানিয়ে লক্ষ্মীকান্ত বললেন, মিঃ রায় এসেছেন ভালই হলো। সবিতা দেবী, সত্যজিতবাবু আপনারা অনুগ্রহ করে একটু যদি পাশের ঘরে যান! মিঃ রায়ের সঙ্গে আমার কয়েকটা কথা ছিল।
কিরীটীই নিঃশব্দে চোখের ইঙ্গিতে সত্যজিৎ ও সবিতাকে কক্ষ ত্যাগ করে যেতে ক্ষণেকের জন্য অনুরোধ জানায়।
দুজনেই নিঃশব্দে কক্ষ হতে নিষ্ক্রান্ত হয়ে গেল কিরীটীর চোখের ইঙ্গিতে।
দরজাটা এবারে ভেজিয়ে দিন মিঃ রায়। পূর্ববৎ গম্ভীর কণ্ঠেই লক্ষয়ীকান্ত বললেন।
মৃদু হেসে কিরীটী এগিয়ে গিয়ে ঘরের দরজাটা বন্ধ করে দিয়ে এল।
বসন্তবাবুকে গতরাত্রেই এসে কয়েকটা প্রশ্ন করেছিলাম মিঃ রায়। কিন্তু উনি বলছেন আমার সে-সব প্রশ্নের কোন জবাব দিতেই উনি নাকি বাধ্য নন। তাই এক্ষেত্রে একপ্রকার বাধ্য হয়েই আমাকে আইনের প্রয়োগ করতে হচ্ছে।
মিথ্যে কথা বাড়িয়ে কোন লাভ নেই লক্ষ্মীকান্তবাবু। আমি প্রস্তুত, আপনি চলুন। শান্ত দৃঢ়কণ্ঠে সহসা কথা বললেন বসন্ত সেন।
কাল আপনি আমাকে আপনার সঙ্গে থানায় গিয়ে দেখা করতে বলেছিলেন, কিন্তু পরের দিক থেকেই শরীরটা কেমন ভাল লাগছিল না তাই
গেলে ভালই করতেন মিঃ রায়। অনেক interesting কথা শুনতে পারতেন।
তাই নাকি? কি রকম? কাল রাত্রে যখন আপনি এসেছিলেন টের পেয়েছিলাম কিন্তু ভাবলাম বসন্তবাবুর সঙ্গে হয়ত কোন গোপনীয় জরুরী। কথা আছে তাই আর বিরক্ত করিনি আপনাকে।
হ্যাঁ, আপনি হয়ত শুনে সুখীই হবেন, কাল সন্তোষবাবুকে থানায় নিয়ে গিয়ে তাঁর সঙ্গে আলাপ-আলোচনায় অনেক রহস্যই উৎঘাটিত হয়েছে যার ফলে সম্পূর্ণ কেসটাই একটা definite shape নিয়েছে। প্রথমে অবশ্য ভদ্রলোক মুখ খুলতে চাননি কিন্তু জানেন তো মুখ খুলবার দাওয়াই আমাদের জানা আছে—চাপে পড়ে সব প্রশ্নের জবাব শেষ পর্যন্ত দিয়েছেন।
বটে! কৌতূহলী দৃষ্টিতে তাকায় কিরীটী লক্ষ্মীকান্তর সাফল্যে গদগদ মুখের দিকে।
সহসা এমন সময় বসন্ত সেন তাঁর নিস্তব্ধতা ভঙ্গ করে কথা বললেন, কিন্তু আমি আপনাকে বলছি, সন্তোষবাবু যে সব চিঠি আপনাকে দেখিয়েছেন। একটাও তার সত্য নয়; কারণ গত চব্বিশ বৎসর একখানা চিঠিও মৃত্যুঞ্জয় চৌধুরী কাউকে লেখেননি। এমন কি তাঁর মেয়েকেও তিনি নিজহাতে চিঠি কোনদিন লেখেননি। চিঠি যা লেখা হতো তাঁরই জবানীতে আমার হাত দিয়েই।
প্রশ্ন করল এবারে কিরীটীই, কেন তিনি নিজহাতে চিঠি লিখতেন না তার কোন কারণ ছিল কি?
হ্যাঁ ছিল।
সেই কারণটাই তো আপনার কাছে আমি জানতে চেয়েছিলাম। লক্ষ্মীকান্ত বলে ওঠেন, কিন্তু উনি বলতে রাজী নন।
রাজী নন কেন? প্রশ্নটা কিরীটীই করে।
না, রাজী নই। আপনাদের বর্তমান তদন্তের ব্যাপারের সঙ্গে আমার ও প্রশ্নের জবাবের কোন সংস্পর্শ আছে বলেই আমি মনে করি না। তাছাড়া মৃত্যুঞ্জয়ের হাতের লেখা আমার যথেষ্ট পরিচিত, চিঠিগুলো আমাকে দেখালেই আমি দপ্তরের খাতাপত্রে তাঁর হাতের যে সব লেখা আছে তার সঙ্গে মিলিয়ে সত্য মিথ্যা প্রমাণ করে দিতে পারবো, কিন্তু দারোগা সাহেব চিঠিগুলো আমাকে দেখাতেই রাজী নন!
কিরীটী বসন্ত সেনের কথায় লক্ষ্মীকান্ত সাহার দিকে মুখ ফিরিয়ে তাকাল এবং বললে, সে চিঠিগুলো আপনার কাছেই আছে বুঝি মিঃ সাহা?
হ্যাঁ। আসবেন আপনি থানায়, দেখাবোখন।
চিঠিগুলো সেন মশাইকে দেখাতে আপনার সত্যিই আপত্তি আছে নাকি?
বর্তমানে আছে, কারণ আপনি চিঠিগুলো পড়লেই জানতে পারবেন।
হুঁ। শুধু, এই জন্যই কি আপনি ওঁকে arrest করেছেন?
