সমস্ত বাড়িটা জুড়ে একটা স্তব্ধতা।
কল্যাণী পা টিপে টিপে সিঁড়ি অতিক্রম করে নিচে নামছে। সিঁড়ির আলোটা অপর্যাপ্ত হওয়ায় সমগ্র সিঁড়ি-পথটা তেমন স্পষ্টভাবে আলোকিত করতে পারছে না। আধো-আলো আধো-ছায়ায় যেন একটা আলোছায়ার রহস্য ঘন হয়ে উঠেছে। নিচে নেমে এসে সোজা কল্যাণী থামের আড়ালে আড়ালে বারান্দা দিয়ে বসন্ত সেনের ঘরের দিকে এগিয়ে গেল, কিন্তু সেখানেও সন্তোষকে দেখতে পেল না। বসন্ত সেনের ঘরের দরজা পূর্বের মতই এখনো বন্ধ।
কে?
মুহূর্তে অন্ধকারেও গলাটা চিনতে কল্যাণীর কষ্ট হয় না। সন্তোষ চৌধুরী।
কে?
আমি কল্যাণী। মৃদুকণ্ঠে জবাব দেয় কল্যাণী।
কল্যাণী দেবী! লাগেনি তো?
না।
এত রাত্রে নিচে যে আপনি? শুতে যাননি এখনো? সন্তোষ প্রশ্ন করে।
না। শুইনি যে এখনো দেখতেই তো পাচ্ছেন। আপনিও তো শোননি এখনো দেখছি? পাল্টা প্রশ্ন করে কল্যাণী।
না। ঘুম আসছিল না তাই অন্ধকার বারান্দায় ঘুরে বেড়াছিলাম।
আমিও তাই। মৃদু হাস্য-তরল কণ্ঠে কল্যাণী প্রত্যুত্তর দিল।
কল্যাণীর কণ্ঠস্বরের মধ্যে যে একটা হাসির চাপা আভাস আছে সন্তোষের কিন্তু বুঝতে সেটা কষ্ট হয় না। অজ্ঞাতেই বোধ হয় ভ্রূ দুটো তার একটু কুঞ্চিত হয়ে ওঠে।
অতর্কিতেই সন্তোষ বলে ওঠে, হাসছেন যে?
হাসছি! কই না তো!
সন্তোষ কোন জবাব দেয় না কল্যাণীর কথায়। চুপ করেই থাকে।
ক্ষণপরে সন্তোষ আবার প্রশ্ন করে, আপনি তো সবিতার মামাতো বোন, তাই না?
হ্যাঁ। রক্তের সম্পর্ক না হলেও আত্মীয়তার সম্পর্কে।
তার মানে?
তার মানে আর কি! রক্তের কোন সম্পর্ক নেই আমাদের পরস্পরের মধ্যে। সবিদির মা আমার বাবার পাতানো বোন ছিলেন, এই আর কি!
ওঃ। একটা স্বস্তির সঙ্গে যেন ও শব্দটি সন্তোষের কণ্ঠে উচ্চারিত হলো।
নিশ্চিন্ত হয়েছেন বোধ হয় মিঃ চৌধুরী, আমি সম্পত্তির একজন দাবীদার নই বলে? ক্ষণপূর্বের সেই হাস্য-তরল কণ্ঠস্বর অন্ধকারে ধ্বনিত হয়ে উঠলো।
আপনি একজন ভাগীদার হলেই বা অসন্তোষের আমার কি কারণ থাকতে পারতো বলুন? সবিতার সম্পত্তির দাবী নিয়ে তো এখানে আমি আসিনি।
কিন্তু সকলের ধারণা তো তাই।
সকলের ধারণাই যে তাহলে ভুল, এইটুকুই আমি বলতে পারি। আমি এসেছি আমার নিজের দেশের বাড়িতে ফিরে, আমার সাত পুরুষের ভিটাতে। সম্পত্তির ওপরে বা কোন টাকা-পয়সার ওপরে আমার কোন লোভই নেই। এদের কারো সঙ্গে আমার কোন বিবাদও নেই, কেবল আমি আমার ন্যায্য অধিকারে এখানে থাকতে চাই। কিন্তু আশ্চর্য, দেখুন তাও এরা দিতে রাজী নয়!
কল্যাণী সন্তোষের কথার কোন জবাবই দেয় না। জবাব দেবার মত তার কি-ই বা আছে।
সন্তোষ আবার বলতে শুরু করে, এ বাড়ির উপরের তলায় পর্যন্ত নায়েব বসন্ত সেন আমাকে প্রবেশাধিকার দেয়নি। অথচ শুনলেন তো আজ সকালে, বসন্ত সেন নিজের মুখেই স্বীকার করল কাকার উইলে স্পষ্ট লেখা আছে আমি ফিরে এলে আমি আমার ভাগের সম্পত্তি পাবো।
আমাকে এসব কথা বলছেন কেন? এতক্ষণে কোনমতে কল্যাণী কথা কয়টি বলে।
না, না-রক্তের সম্পর্ক না থাকলেও সবিতার তো আপনি আত্মীয়ের মতই। অতঃপর সহসা যেন আলোচনার মধ্যে একটা পূর্ণচ্ছেদ টেনে দিয়ে সন্তোষ বলে ওঠে, আচ্ছা চলি। রাত অনেক হলো। বলতে বলতে সন্তোষ তার ঘরের দিকে পা বাড়াল।
শয়নকক্ষে প্রবেশ করতে গিয়ে কল্যাণী থমকে দাঁড়াল। পিতা নিত্যানন্দ সান্যাল হাত দুটি পশ্চাতের দিকে নিবদ্ধ করে অত্যন্ত গম্ভীরভাবে নিঃশব্দে কক্ষমধ্যে পায়চারি করছেন।
কল্যাণীর পদশব্দে নিত্যানন্দ কন্যার দিকে ফিরে দাঁড়িয়ে তাকালেন। মুখখানা থম থম করছে—চোখের দৃষ্টিতে সুস্পষ্ট অসন্তোষ। গম্ভীর ঘরে প্রশ্ন করলেন নিত্যানন্দ, এত রাত পর্যন্ত কোথায় ছিলে?
নিচে বাগানে বেড়াচ্ছিলাম।
এই মাঝরাত্রে নিচের অন্ধকার বাগানে বেড়াচ্ছিলে! বেড়াবার চমৎকার সময়! কন্ঠে শ্লেষ।
কল্যাণী পিতার মুখের দিকে চোখ তুলে তাকাল।
এ সেই নিত্যানন্দ সান্যাল নন, যিনি সর্ব ব্যাপারেই নির্লিপ্ত নির্বিকার। যিনি শান্ত সহিষ্ণু, অমায়িক।
দুই চোখের দৃষ্টিতে যেন একটা ক্রুদ্ধ আক্রোশ ঝকঝক করছে। ক্ষণকাল সেই আক্রোশ-ঝরা দৃষ্টিতে কন্যার আপাদমস্তক নিরীক্ষণ করে সহসা যেন ক্রুদ্ধ কণ্ঠে বিষোদ্গার করলেন, মিথ্যুক! লজ্জা করলো না তোমার মিথ্যা কথা বলতে! নিচের বারান্দায় থামের আড়ালে দাঁড়িয়ে ঐ বখাটে ছোকরার সঙ্গে গল্প করছিলে না?
কল্যাণী নিশ্চুপ। মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকে। কথার জবাব দিতেও তার ঘৃণা হয়। সমস্ত মন সঙ্কুচিত হয়ে ওঠে।
এত রাত্রে ঐ ছোকরাটার সঙ্গে কি তোমার এমন কথা হচ্ছিল শুনি?
তথাপি কল্যাণী নিরুত্তর। এতটুকু স্বরও ওর কণ্ঠ হতে বের হয় না।
আক্রোশে ও জ্বালায় নিত্যানন্দ চাপা কণ্ঠে আবার তর্জন করে ওঠেন,
কি? চুপ কেন? জবাব দাও?
নিরুত্তর। কল্যাণী এখনো নিরুত্তর।
কল্যাণী! কটু তিক্ত কণ্ঠে আবার তর্জন করে উঠলেন নিত্যানন্দ।
কিছুই আমার বলবার নেই। এতক্ষণে ধীরে সংযত কণ্ঠে কল্যাণী জবাব দেয়।
কিছুই তোমার বলবার নেই?
না।
বেশ। কালই তোমাকে আমি লুধিয়ানায় পাঠিয়ে দেবো। গ্রীষ্মের ছুটিটা তুমি হস্টেলেই থাকবে।
বলতে বলতে নিত্যানন্দ কক্ষ ত্যাগ করে চলে গেলেন।
আর নিশ্চল পাষাণ-প্রতিমার মত কল্যাণী দাঁড়িয়ে রইল ঘরের মধ্যে। প্রচণ্ড একটা অগ্ন্যুৎপাতের মত তখন তার সমস্ত অন্তরটা জলে পড়ে যেন একেবারে খাক হয়ে যাচ্ছে।
১৭. সবিতার ডাকে কিরীটীর নিদ্রাভঙ্গ
সবিতার ডাকে কিরীটীর নিদ্রাভঙ্গ হলো।
