না, আরো দুটো কারণ আছে।
আরো দুটো কারণ আছে?
হুঁ, যে রাত্রে মৃত্যুঞ্জয় চৌধুরী নিহত হন সে রাত্রে উনি এখানে উপস্থিত ছিলেন না, ওঁর জবানবন্দীতে বলেছিলেন উনি
না, ছিলাম না তাই বলেছি। মহাল দেখতে গিয়েছিলাম, রাত প্রায় গোটা তিনেকের সময় ফিরি। জবাবটা দিলেন বসন্ত সেন।
কিন্তু সত্যি কথা তো তা নয়। আপনি সেদিন আদপেই এ বাড়ি হতে বের হননি। নিজের ঘরের মধ্যেই ছিলেন।
কথাটা এবারে বলেছিল কিরীটী।
কিরীটীর কথায় যুগপৎ চমকে দুজনেই বসন্ত সেন ও লক্ষ্মীকান্ত সাহা ওর মুখের দিকে বিস্মিত প্রশ্নভরা দৃষ্টিতে তাকায়।
সে কি! তবে যে আপনি গতরাত্রে বলছিলেন জমিদারী সংক্রান্ত কোন একটা বিশেষ গোপনীয় ব্যাপারেই কোন একটা মহালে আপনাকে যেতে হয়েছিল এবং গোপনীয় বলেই মহালের নামটা আপনি বলবেন না? তীক্ষ্ণকণ্ঠে এবারে বসন্ত সেনের দিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে প্রশ্নটা শেষ করলেন সাহা, হুঁ! আসলে আপনি তাহলে এ বাড়ী ছেড়ে সেদিন কোথায়ও যাননি!
কিরীটীর কথায় ও লক্ষ্মীকান্ত সাহার চ্যালেঞ্জে নায়েব বসন্ত সেন যেন একেবারে পাথরের মতই স্তব্ধ অসাড় হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন।
মুখখানাও যেন ঐ মুহূর্তে তাঁর মনে হচ্ছিল একেবারে পাথরেই গড়া ভাবলেশহীন। ক্রোধ, বিরক্তি, হতাশা, ব্যথা, লজ্জা, অপমান কোন কিছুই যেন প্রকাশ পাচ্ছে না মুখের স্থির অচঞ্চল রেখাগুলোতে।
নায়েব মশাই, এ কথা তাহলে সত্যি? পুনরায় প্রশ্ন করলেন লক্ষ্মীকান্ত সাহা।
জানি না। আপনাদের কোন প্রশ্নেরই জবাব দিতে রাজী নই লক্ষমীকান্তবাবু। আপনি আমাকে arrest করতে এসেছেন করুন। কোথায় আমাকে নিয়ে যেতে চান, চলুন আমি প্রস্তুত। নিরতিশয় একটা তাচ্ছিল্যের সুরই যেন নায়েব বসন্ত সেনের কণ্ঠস্বরে ঝরে পড়ল।
আপনি তাহলে জবাব দেবেন না। আবার প্রশ্ন করলেন লক্ষ্মীকান্ত।
না।
এখন মনে হচ্ছে কানাইয়ের মার অন্তর্ধানের ব্যাপারেও আপনি লিপ্ত আছেন। লক্ষীকান্ত বললেন।
যেমন আপনার অভিরুচি ভাবতে পারেন। মিথ্যে আপনি সময় নষ্ট করছেন দারোগা সাহেব। আমার মুখ থেকে আপনি একটি প্রশ্নেরও জবাব পাবেন না।
লগুড়াহত জানোয়ারের মতই এবারে যেন লক্ষ্মীকান্ত সাহা একেবারে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন এবং তীক্ষ্ণ কর্কশ কণ্ঠে বলেন, কিন্তু আমিও লক্ষ্মীকান্ত সাহা। আপনাদের মত বহু নায়েবকেই আমার দেখা আছে। চলুন আগে থানায়, তারপর দেখা যাবে আপনাদের মত ঘুঘু চরিত্রের লোককে
দারোগা লক্ষ্মীকান্তর কথাটা শেষ হল না, মুহূর্তে বাঘের মতই থাবা মেরে রুদ্রার্জুন বসন্ত কেন লক্ষ্মীকান্তর বক্তব্যটা অর্ধপথে থামিয়ে দিলেন লক্ষ্মীকান্ত! ভুলো না এটা বসন্ত সেনের এলাকা। এখনি যদি তোমাকে জ্যান্ত হাত পা বেধে সামনের ঐ বৌরাণীর বিলের জলের ঠাণ্ডা পাঁকের নিচে পুঁতে ফেলি তোমার ফিরিঙ্গি বাপঠাকুদ্দার সাধ্যও হবে না তোমার লাশ খুঁজে বের করে! এ তোমার থানার চৌহদ্দী নয়—ভদ্রলোকের সঙ্গে ভদ্রভাবে কথা বলতে শেখনি এখনো।
ঠাণ্ডা বাররু-স্তূপ যেন সহসা একটি মাত্র স্ফুলিঙ্গে প্রচণ্ড শব্দে ফেটে দাবানলের মতই দাউ দাউ করে জ্বলে উঠেছে।
শান্ত ভদ্র বসন্ত সেনের মধ্যে যে এমন একটি রুদ্র ভয়ঙ্কর রূপ ভস্মাচ্ছাদিত হয়ে চাপা পড়েছিল ভাবতেও যেন বিস্ময় লাগে।
বসন্ত সেনের এ যেন এক অভিনব রূপ।
বৃদ্ধের সমস্ত শরীরটা যেন একটা নিষ্কাশিত তীক্ষ্ণ ধারালো অসির মত ঋজু হয়ে উঠেছে। ক্ষণপূর্বের পাথরের মতই স্থির অচঞ্চল মুখখানি যেন মুহর্তে রুদ্রাগ্নির মতই ধকধক করে জ্বলে উঠেছে।
এককালে জমিদারের নায়েবদের যে দোর্দণ্ডপ্রতাপের কথা শোনা যেত এ যেন সেই পুরাতন দিনেরই নায়েব। সরকারী কোন আইন বা নীতির এরা ধার ধারে না, এদের আইন এদের কাছে। অশিষ্ট অবাধ্য প্রজাকে বেত্রাঘাতে জর্জরিত করে এদেরই পূর্ব-পুরুষেরা হয়ত একদা অন্ধকার স্যাঁতসেতে গুপ্তকক্ষে জীবন্ত কবর দিত। রাতারাতি খুন করে লাশ মাটির নীচে পুতে ফেলত, নয়তো পুষ্করিণীর তলায় গলায় পাথর বেধে ড়ুবিয়ে দিত। অথবা জ্যান্ত দেওয়ালের সঙ্গে ইট দিয়ে রাতারাতি গেথে ফেলত।
লক্ষ্মীকান্ত নিজেও বোধ হয় এতটা আশা করেননি। মুহূর্তের জন্য তাই বোধ হয় তিনিও কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পাথরের মতই নিশ্চল অবস্থায় দাঁড়িয়ে থাকেন এবং হিংস্র জানোয়ারকে নিয়ে ঘাঁটানো আর বিবেচনার কাজ হবে না ভেবেই নিজের রূপ এবারে সম্পূর্ণ পাল্টে দিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে বললেন, জমিদার মৃত্যুঞ্জয় চৌধুরীর হত্যাপরাধের সন্দেহে আপনাকে আমি গ্রেপ্তার করছি। বসন্তবাবু
লক্ষ্মীকান্তর মুখের কথা শেষ হতেই সহসা যেন বাজের মত তীক্ষ্ণ উচ্চকণ্ঠে হাঃ হাঃ করে হেসে উঠলেন বসন্ত সেন।
কিরীটী লক্ষ্মীকান্ত দুজনেই চমকে ওঁর প্রচণ্ড হাসির শব্দে ওর মুখের দিকে তাকায়। বসন্ত সেন হাসছেন, হাঃ! হাঃ! হাঃ!
কেউই ওঁর হাসিতে বাধা দেয় না।
হাসি থামিয়ে বসন্ত সেন ব্যঙ্গমিশ্রিত কণ্ঠে বলেন, এই বিদ্যা আর বুদ্ধিরই এত দন্ড! তুমি বের করবে মৃত্যুঞ্জয়ের হত্যাকারীকে! এর চাইতে সে আত্মহত্যা করে মরেছে বা অদৃশ্য কোন আততায়ীর হাতে নিহত হয়েছে, যে রিপোর্ট দিয়েছিলে সেই যে ছিল ভাল। মিথ্যা তোমার কাদা ঘেটে নোংরা হওয়াই সার হবে লক্ষ্মীকান্তবাবু। কিন্তু বড় গলায় তো আমাকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে চলেছ, শেষ পর্যন্ত তোমার আইন দিয়ে আমাকে বেধে রাখতে পারবে তো দারোগাবাবু! যাগগে। মরুক গে। চল কোথায় যেতে হবে—
