আমার কথাটা হয়ত ঠিক বুঝতে পারনি কল্যাণী। খুব সম্ভবত ঘটনাচক্রে নিজের ব্যর্থতায় লক্ষ্মীকান্ত সাহা সাদা কথায় যাকে বলে একেবারে মরীয়া হয়ে উঠেছে। কাজেই যে কোন একটা কাজের দ্বারা নিজের ক্ষমতা জাহির করবে হয়ত সে দুচার দিনের মধ্যেই। এ হয়ত তারই প্রস্তুতি চলেছে।
বারান্দার দামী ওয়াল-ক্লকটা এমন সময় ঢং করে রাত্রি সাড়ে এগারটা ঘোষণা করল। রাত অনেক হলো কল্যাণী, এবারে তুমি শুতে যাও। আমারও ঘুম পেয়েছে। বলতে বলতে নিদ্রাকাতর হয়েই যেন সে একটা হাই তুলল। এবং কথাটা শেষ করে সঙ্গে সঙ্গে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল।
কল্যাণীকে ঘর ত্যাগ করবার জন্য সুস্পষ্ট ইঙ্গিত। কল্যাণীও আর দ্বিরুক্তি না করে ঘর হতে বের হয়ে গেল। কিন্তু তার কৌতূহলী মন কিরীটীর কথায় নিবৃত্ত হয় না। পায়ে পায়ে সে নিচের সিঁড়ি বেয়ে একতলার দিকে অগ্রসর হয়।
আহারাদির পর নিদ্রা আসছিল না দেখে কল্যাণী প্রমোদভবনের সামনে দক্ষিণাংশে যে ফুলের ছোটখাটো একটা বাগান আছে সেখানে আপন মনে অন্ধকারেই একটা পাথরের বেদীর উপরে বসেছিল। দুপুর থেকেই একটা অসহ্য গুমোট গরমে প্রকৃতি যেন থমথম করছে। বাতাসের লেশমাত্রও নেই। বিকালের দিকে আকাশের এক প্রান্তে একটু মেঘ উঠেছিল কিন্তু সেটাও ঘন চাপ বেধে উঠতে পারেনি, অন্ধকার রাত্রির আকাশপটে তারাগুলো কেবল মিটিমিটি জ্বলছে। কল্যাণী আপন মনে বসে বসে কিরীটীর সঙ্গে দ্বিপ্রহরে যে আলোচনা হয়েছিল তাই ভাবছিল। কে মৃত্যুঞ্জয় চৌধুরীকে হত্যা করেছে? আর কেনই বা করেছে? কিরীটীর কথায় মনে হয় স্বার্থটা অর্থ-সম্পর্কিত। অর্থই এ অনর্থের মূল। মৃত্যুঞ্জয় চৌধুরীর বিরাট সম্পত্তির প্রকৃতপক্ষে মালিক এখন ঐ সবিতাই। তবে সন্তোষ চৌধুরী তার যে পরিচয় দিয়েছে তা যদি সত্য হয়, তাহলে এ সম্পত্তির একটা অংশ তারও প্রাপ্য। নায়েব বসন্ত সেন সন্তোষ চৌধুরী তার পরিচয়ের উপযুক্ত প্রমাণ না দেওয়া পর্যন্ত তাকে স্বীকার করে নিতে রাজী নন। স্পষ্টই সেকথা তাকে জানিয়ে দিয়েছেন এখানে পা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই। সন্তোষ চৌধুরীও জোর গলায় জানিয়ে দিয়েছে উপযুক্ত প্রমাণ তার কাছে আছে এবং প্রয়োজন হলে সে প্রমাণ করবেও যে সে এই বংশেরই সন্তান। সত্য হোক মিথ্যা হোক প্রমাণ তার হাতে নিশ্চয়ই আছে, নচেৎ এভাবে জোর গলায় সে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করবার চেষ্টা করত না। তা ছাড়া সে কি বোঝে না প্রতারক প্রমাণিত হলে আইনের হাতে কিভাবে লাঞ্ছিত হতে হবে। শুধু তাই নয়, শাস্তিও তাকে পেতে হবে এবং নায়েব বসন্ত সেন সহজে তাকে নিষ্কৃতি দেবে না। সহসা এমন সময় সাইকেলের ঘণ্টি শুনে সচকিত হয়ে কল্যাণী অদূরে গেটের দিকে তাকাল, গেটের আলোয় সাইকেলআরোহীকে দেখে চিনতে ওর কষ্ট হলো না। দারোগা লক্ষীকান্ত সাহা। লক্ষ্মীকান্ত দারোগা এত রাত্রে এখানে! সকালেই তো ভদ্রলোক এখানে এসেছিলেন এবং যাবার সময় সঙ্গে করে সন্তোষ চৌধুরীকে নিয়ে গিয়েছিলেন। সন্ধ্যার কিছু আগে সন্তোষ চৌধুরী ফিরে এসেছে ও দেখেছে। এও জানে কল্যাণী, রাত্রের আহার্য সবিতাই বনমালীকে বলে সন্তোষের ঘরে প্রেরণ করেছিল। কৌতুহলী হয়ে কল্যাণী দূর থেকেই লক্ষ্মীকান্ত দারোগাকে অনুসরণ করে। লক্ষ্মীকান্ত সাইকেলটা গেটের একপাশে হেলান দিয়ে দাঁড় করিয়ে রেখে সোজা ভিতরে প্রবেশ করে নায়েব বসন্ত সেনের ঘরের দিকে অগ্রসর হলেন। একটা থামের আড়ালে আত্মগোপন করে কল্যাণী লক্ষ্মীকান্তকে লক্ষ্য করতে লাগল। নায়েবের ঘরের বন্ধ দরজার সামনে গিয়ে দরজায় ধাক্কা দিতেই অল্প পরে দরজা খুলে খোলা দরজার সামনে দাঁড়ালেন বসন্ত সেন।
কি দারোগা সাহেব! এত রাত্রে?
বসন্ত সেনের প্রশ্নে বদ্ধ ওষ্ঠের উপরে ডান হাতের তর্জনী তুলে চাপা গলায় লক্ষ্মীকান্ত বললেন, আস্তে। কথা আছে, উপরে চলুন।
উভয়ের ঘরের মধ্যে প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গেই ভিতর হতে পুনরায় দরজা বন্ধ হয়ে গেল।
কল্যাণী একটু অবাকই হয়েছিল। প্রথমতঃ এত রাত্রে লক্ষনীকান্তের আবির্ভাব এবং তাঁর আগমনের ব্যাপারে ঐভাবে সতর্কতা অবলম্বন। কল্যাণী চিন্তা করবারও অবকাশ পেল না, অতর্কিতে একটা অস্পষ্ট শব্দ ওর শ্রবণেন্দ্রিয়ে প্রবেশ করতেই ও ফিরে তাকাল। পাশের ঘরের দরজা খুলে সন্তোষ চৌধুরী পা টিপে টিপে বের হয়ে এলো। কল্যাণী থামের আড়ালে আত্মগোপন করেই লক্ষ্য করতে লাগল সন্তোষ চৌধুরীর গতিবিধি।
সন্তর্পণে পা ফেলে সন্তোষ এগিয়ে এসে দাঁড়াল বসন্ত সেনের ঘরের বন্ধ দরজার গায়ে একেবারে যেন ঘেষে। নিঃশব্দে কিছুক্ষণ সন্তোষ দরজার গোড়ায় দাঁড়িয়ে থাকে। বারান্দার ঝোলানো বাতির আলো সন্তোষের চোখেমুখে এসে পড়েছে। কপালের রেখাগুলো কুঞ্চিত হয়ে উঠেছে।
কল্যাণী বুঝতে পারে সন্তোষ আড়ি পেতে ঘরের ভিতরকার বসন্ত সেন ও লক্ষ্মীকান্তর কথাবার্তা শোনবার চেষ্টা করছে। সহসা কল্যাণীর মনে হয় এ সংবাদটা কিরীটীকে এক্ষনি দেওয়া প্রয়োজন।
এত রাত্রে লক্ষ্মীকান্তর আবির্ভাব ও সন্তোষ চৌধুরীর আড়ি পেতে ওদের কথা শোনবার চেষ্টাব্যাপার দুটোই যেন কেমন একটা সন্দেহের উদ্রেক করে। আজ সকাল হতেই পরের পর ঘটনাগুলো কানাইয়ের মা গত রাত থেকে সহসা নিরুদিষ্টা হয়ে গেল। লক্ষ্মীকান্ত সাহা এসে সন্তোষ চৌধুরীকে থানায় ধরে নিয়ে গেলেন। ফিরে এলো সে সন্ধ্যার মুখে। তারপর রাত প্রায় এই এগারোটায় সহসা লক্ষ্মীকান্তর এখানে আবির্ভাব। সন্তোষ চৌধুরীর ঐ ধরনের সন্দেহজনক গতিবিধি। কল্যাণী আর দেরি করে না। থামের আড়াল থেকে সরে গিয়ে পা টিপে টিপে সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেল।
