গভীর মনোযোগের সঙ্গে এক নিঃশবাসে লেখাটা পড়ে কিরীটী কাগজটা সন্তোষ চৌধুরীকে ফেরত দিয়ে মৃদুকণ্ঠে বললে, চৌধুরী মশাইয়ের যে রহস্যজনকভাবে মৃত্যু হয়েছে সে তো এই সংবাদেই স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে দেখতে পাচ্ছি সন্তোষবাবু!
কথাগুলো বলতে বলতেই কিরীটী সন্তোষ চৌধুরীর মুখের দিকে সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে তাকাল।
এবার প্রত্যুত্তরে কতকটা যেন ইতস্তত করেই সন্তোষ চৌধুরী জবাব দেয়, হ্যাঁ। তবে তাঁর মৃত্যুটা রহস্যজনক বলতে যে ব্যাপারটা এতটা ঘোরাল হত্যা এটাই বুঝে উঠতে পারিনি দারোগাবাবুর সঙ্গে কথাপ্রসঙ্গে সব জানতে পারবার পূর্ব পর্যন্ত।
অতঃপর কিরীটী ক্ষণকাল চুপ করেই থাকে। তারপর একসময় মুখ তুলে মৃদুকণ্ঠে বলে, দারোগাবাবুর সঙ্গে আপনার কি কথা হলো?
ভদ্রলোকটিকে বিশেষ সুবিধাজনক বলে মনে হল না মিঃ রায়। কথাবার্তা আমাদের মধ্যে যা কিছু হয়েছে কাকার হত্যা সম্পর্কেই। তাঁর ধারণা হত্যাকারী বাইরেরই কোন লোক। কিন্তু আমিও তাকে বুঝিয়ে দিয়েছি
কি বুঝিয়ে দিয়েছেন? আদপেই সেটা সম্ভবপর নয়!
সম্ভবপর নয় কেন?
কেন আবার কি! এ বাড়িরই কেউ না কেউ তাঁকে হত্যা করেছে।
আপনার কি তাই মনে হয় মিঃ চৌধুরী?
নিশ্চয়ই। এ বিষয়ে কোন ভুল নেই। এই গোবিন্দপুরে কে তাঁকে বাইরে থেকে হত্যা করতে আসবে? আর কেনই বা আসবে?
সন্তোষ চৌধুরীর কথায় কিরীটী মৃদু হাস্য করে, কোন জবাব দেয় না।
হাসছেন যে? আপনিই বলুন না, তাঁর সঙ্গে বাইরের লোকের কি সম্পর্ক থাকতে পারে?
ভুলে যাচ্ছেন কেন মিঃ চৌধুরী, তিনি এখানকার জমিদার ছিলেন এবং শুধু তাই নয় তাঁর ব্যবসা ছিল ও বন্ধকী কারবারও কিছু কিছু করতেন। তাঁর পক্ষে বাইরের শত্রু থাকা কিছুই বিচিত্র নয়। বরং স্বাভাবিকই বলতে পারেন।
কিন্তু আপনি যাই বলুন মিঃ রায়, আমার স্থির বিশ্বাস বাইরের কেউ নয়। এ বাড়ির মধ্যে যারা উপস্থিত ছিল সেরাত্রে তাদের মধ্যেই কেউ না কেউ কাকাকে হত্যা করেছে। তাছাড়া এ বাড়ির পুরাতন ঝি কানাইয়ের মা, নিশ্চয়ই সে মারাত্মক কিছু জানত যার জন্য তাকেও রহস্যজনকভাবে অদৃশ্য হতে হয়েছে এ বাড়ি থেকে গতরাত্রে। আমাদের প্রত্যেকেরই কি এখন কর্তব্য জানেন?
কি? কৌতুকভরা দৃষ্টিতে কিরীটী সন্তোষ চৌধুরীর মুখের দিকে তাকাল।
নিরুদ্দিষ্টা কানাইয়ের মাকে যেমন করে যে উপায়ে হোক এখন সর্বাগ্রে খুঁজে বের করা।
সন্তোষ চৌধুরীর কথার কোনো জবাব দেয় না কিরীটী। নিঃশব্দে ঠোঁটের মধ্যে পাইপটা চেপে ধরে ধূমপান করতে থাকে। কিছুক্ষণ একটা স্তব্ধতার মধ্যেই অতিবাহিত হয়ে যায়।
একসময় কিরীটী পীড়াদায়ক স্তব্ধতাকে ভঙ্গ করে সন্তোষ চৌধুরীর মুখের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করে, কিন্তু আমাকে আপনার কি বলবার ছিল বলুন তো? যেজন্য এখানে আমার অপেক্ষায় বসেছিলেন?
হ্যাঁ, থানা থেকে আসতে আসতে আমার কি মনে হচ্ছিল জানেন
কি?
এ হত্যা-রহস্যের একটা মীমাংসা করা প্রয়োজন। এবং আপনি যখন এ কাজে হাত দিয়েছেন তখন আমাদের প্রত্যেকেরই আপনাকে আমাদের সাধ্যমত সাহায্য করা কর্তব্য। আমি তা করবো সেই কথাটা বলবার জন্য আপনার অপেক্ষায় ছিলাম।
ধন্যবাদ। আপনাদের সকলেরই সাহায্যের আমার প্রয়োজন। মৃদুভাবে কিরীটী জবাব দেয়।
***
ঐ রাত্রেই। রাত তখন গোটা এগার হবে। অল্পক্ষণ আগে মাত্র সকলের আহারাদি শেষ হয়েছে। অনুজ্জল টেবিল-ল্যাম্পের আলোয় দ্বিপ্রহরে কিরীটী যে এ্যালবামটা মৃত্যুঞ্জয় চৌধুরীর ঘরের ড্রয়ার থেকে এনেছিল তারই পাতাগুলো পুনরায় অন্যমনস্ক ভাবে ওল্টাচ্ছিল। সহসা এমন সময় অতর্কিতে দরজার বাইরে একটা দ্রুত পদশব্দ শোনা গেল। কিরীটী ক্ষিপ্রহস্তে অ্যালবামটা বাজিয়ে তার শয্যার নিচে একেবারে চালান করে দিল। এবং বিস্মিত দৃষ্টি ভেজানো দরজার দিকে তুলে ধরল।
পরমুহূর্তেই ভেজানো দরজা ঠেলে কমধ্যে এসে প্রবেশ করল কল্যাণী।
কল্যাণী দেবী! কি সংবাদ? এত রাত্রে?
কল্যাণীর চোখেমুখে একটা সুস্পষ্ট উত্তেজনার আভাস।
লক্ষ্মীকান্ত সাহা! অস্ফুট কণ্ঠে কল্যাণী উচ্চারণ করল।
বসো। বসো। ঐ চেয়ারটায় বসো। কিরীটী পাশেরই শুন্য চেয়ারটা দেখিয়ে কল্যাণীকে শান্ত কণ্ঠে আহ্বান জানাল।
কল্যাণী কিন্তু বসে না। চেয়ারের একটা হাতলের উপরে দেহের ভারসাম্য রক্ষা করে মনের উত্তেজনাটা সামলে নেবার চেষ্টা করে মুহূর্তের জন্য। তারপর মৃদুকণ্ঠে বলে, নায়েব মশাইয়ের ঘরে লক্ষ্মীকান্ত সাহা গোপনে বোধ হয় কোন পরামর্শ করছে আর সেই ঘরের বন্ধ দরজার গায়ে আড়ি পেতে দাঁড়িয়ে শুনছেন সন্তোষবাবু।
কিরীটী কল্যাণী-প্রদত্ত সংবাদটায় কোন গুরুত্বই আরোপ না করে মৃদু হাস্য তরল কণ্ঠে বলে, তাতে হয়েছে কি?
বিস্মিত সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে তাকায় কল্যাণী কিরীটীর মুখের দিকে।
কিন্তু আমাদের ব্যাপারটা কি জানালে হতো না মিঃ রায়? কল্যাণীর কণ্ঠস্বরে উদ্বেগটা অস্পষ্ট থাকে না।
বসো। আজকের রাতে যে সভা বসেছে তার সমস্ত রহস্যই হয়ত আর দুচার দিনের মধ্যেই সর্বসমক্ষে উঘাটিত হয়ে যাবে। এখন তাড়াহুঁড়ো করতে গেলে হয়ত সব কেচে যাবে।
কিরীটীর কথাগুলো কল্যাণী যে ঠিক স্পষ্টভাবে বুঝে উঠতে পারেনি সেটা কিন্তু কিরীটীর আদপেই বুঝতে কষ্ট হয় না কল্যাণীর চোখমুখের দিকে তাকিয়ে।
