কিরীটীর পদশব্দে সন্তোষ ততক্ষণে চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়েছে।
সন্তোষবাবু?
হ্যাঁ আমি—আপনার অপেক্ষাতেই বসে আছি মিঃ রায়। মৃদু কণ্ঠে সন্তোষ চৌধুরী প্রত্যুত্তর দিল।
কি ব্যাপার? থানা থেকে কখন ফিরলেন? বসুন। বসুন।
সন্তোষ আবার চেয়ারটা টেনে নিয়ে বসল। কিরীটীও অন্য একটা চেয়ার টেনে মুখোমুখি হয়ে বসল।
এই মিনিট কুড়ি হবে—
তারপর কি খবর বলুন? হঠাৎ আপনাকে ধরে নিয়ে গিয়েছিলেন কেন দারোগা সাহেব?
১৬. আর বলেন কেন
আর বলেন কেন? মিথ্যে খানিকটা হয়রান করলে কেবল। আমার নামও সান্টা চৌধুরী—কেমন দারোগা বুঝিয়ে দেবো!
প্রমাণটা যখন আপনার কাছেই আছে, সেটা সকালে এখানে দেখিয়ে দিলেই তো পারতেন, সকলের সন্দেহভঞ্জন হয়ে যেত। মিথ্যে তাহলে আর এমনি করে হয়রান হতে হতো না আপনার!
প্রমাণ আর প্রমাণ! এ কি জুলুম মিঃ রায়? এই বাড়িরই ছেলে আমি? সবিতা আর আমার দেহে একই রক্তের ধারা বইছে। আমার কথাই কি প্রমাণ নয়? সবিতার বাবা ও আমার বাবা আপন জাঠতুত খুড়তুত ভাই ছিলেন।
নিশ্চয়ই সেটাই প্রমাণ বৈকি। তবে কি জানেন সন্তোষবাবু, বলতে গেলে একটা যুগ এ বাড়ির সঙ্গে আপনাদের কোন সম্পর্ক ছিল না। আপনার পিতাঠাকুর আপনার জন্মের পূর্বেই এ গৃহ ছেড়ে চলে যান। তারপর দীর্ঘকাল ধরে যতদূর শুনেছি কোন পত্র দেওয়া-নেওয়াও হতো না। এক্ষেত্রে যদি এদের মনে সন্দেহ জেগেই থাকে তাতে করে এদের খুব বেশী দোষ দেওয়া যায় কি আপনিই বলুন না? কিরীটী মৃদুকণ্ঠে প্রশ্নটা করে সন্তোষ চৌধুরীর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে।
ও বুড়ো শয়তানটার কথা না হয় ছেড়েই দিলাম। কিন্তু সবিতা? সেও আমাকে কি বিশ্বাস করতে পারছে না?
আপনি তো বুঝতেই পারছেন সন্তোষবাবু, বসন্তবাবুই এখন একদিক দিয়ে সবিতা দেবীর গার্জেন।
গার্জেন! I can tell you Mr. Roy that old শকুনি—ঐ যত অনর্থের মূল। কাকামণির হত্যার আসল ব্যাপারটা আমি কিছুই জানতাম না। আজই থানায় গিয়ে সব শুনলাম
বিস্মিত প্রশ্নভরা দৃষ্টিতে কিরীটী তাকাল সন্তোষ চৌধুরীর দিকে,
আপনি জানতেন না? কি জানতেন না? মৃত্যুঞ্জয় চৌধুরী যে নিহত হয়েছেন, জানতেন না?
তা নয়, তবে কাকার মৃত্যুর আগাগোড়া ব্যাপারটা জানতাম না। জানতাম না যে সত্যসত্যই তাঁকে হত্যা করেছে কেউ।
কিরীটী কিছুক্ষণ সম্মুখে উপবিষ্ট সন্তোষ চৌধুরীর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। কপালে ঈষৎ কুঞ্চন দেখা দেয়।
সন্তোষ চৌধুরী ইতিমধ্যে যেন তার পুর্বোক্ত কথার জের টেনেই বলতে থাকে, আপনাকে আমি ঠিক বুঝিয়ে বলতে পারবো না মিঃ রায়, সংবাদটা যে কত বড় একটা শক দিয়েছে আমাকে! মাত্র বছর দুই আগে বাবা মারা গিয়েছেন। মা মারা গেছেন বছর বারো আগে। লেখাপড়াও বিশেষ কিছু করিনি। বাবার এডেনের স্টীমার পয়েন্টের কাছে মস্ত বড় একটা স্টেশনারী দোকান ছিল ওখানকারই একজন আফ্রিকান মুসলমান পার্টনারের সঙ্গে। প্রচুর লাভ হতো দোকানটা থেকে। আমিও ঐ দোকানটাতেই কাজ করতাম। হঠাৎ মাস চারেক আগে ঐ পার্টনার আমাকে জানাল দোকানে নাকি আমার কোন শেয়ার নেই। আমি ওখানকার একজন মাইনে-করা কর্মচারী মাত্র। বাবা নাকি মৃত্যুর কিছু দিন আগেই তাঁর দোকানের অর্ধেক শেয়ার ওকে বিক্রি করে দিয়েছিলেন।
তা আপনি তো বললেন আপনার বাবা বছর দুই হলো মারা গেছেন—এত দিন সে কথা সে জানায়নি কেন?
বললে পাছে আমি মনে আঘাত পাই সেকারণেই কোন কথা আমাকে নাকি জানায়নি।
তাহলে এতদিন পরেই বা হঠাৎ জানাল কেন?
দোকানের একটা ব্যাপারে গোলমাল হওয়ায় আমার সঙ্গে তখন সব কথা খুলে আমায় সে বলে।
তারপর?
অনেক চেষ্টা করলাম কিন্তু কোন ফলই হলো না। দীর্ঘ উনিশ-কুড়ি বছরের ব্যাপার। কোন দলিলপত্রও খুঁজে পেলাম না। অবশেষে বাধ্য হয়েই একপ্রকার বিরক্ত হয়ে ফিরে আসতে বাধ্য হলাম ভারতবর্ষে।
যদি কিছু মনে না করেন মিঃ চৌধুরী, একটা প্রশ্ন আপনাকে আমি করতে চাই।
নিশ্চয়ই। বলুন না শুনি?
আপনার কাকা মৃত্যুঞ্জয় চৌধুরী যে মারা গিয়েছেন এ সংবাদটা আপনি কোত্থেকে পেলেন?
কিরীটী তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে সন্তোষ চৌধুরীর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। কিরীটীর প্রশ্নটা সে সন্তোষ চৌধুরীকে বেশ একটু বিব্রত করে তুলেছে তার চোখে-মুখেই সেটা যেন সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
বাংলা সংবাদপত্রে সংবাদটা বের হয়েছিল। তাতেই আমি জানতে পারি। একটু যেন ইতস্তত করেই কথাগুলো বলে সন্তোষ চৌধুরী।
বাংলা সংবাদপত্রে! এডেনে কি বাংলা সংবাদপত্র যায় নাকি?
হ্যাঁ। মর্মবাণী, বাংলার অর্ধ-সাপ্তাহিক কাগজটা আমাদের বাসায় নিয়মিত যেত। তাতেই সংবাদটা পাই, এখানে রওনা হবার দিন দুই আগে।
সংবাদটায় কি লেখা ছিল? .
এই যে দেখুন না কাগজের কাটিংটা, এখনো আমার ব্যাগেই আছে। I kept it. বলতে বলতে সন্তোষ চৌধুরী তার জামার পকেট হতে সুদৃশ্য একটা চামড়ার পাস বের করে পার্স থেকে সংবাদপত্রের ছোট একটা কাটিং কিরীটীর হাতে তুলে দিল।
কিরীটী ঘরের আলোয় কাটিংটা পড়তে লাগল। স্থানীয় সংবাদদাতা প্রেরিত সংবাদ!—স্থানীয় জমিদার মৃত্যুঞ্জয় চৌধুরীর প্রাণহীন দেহ গতকল্য বৌরাণীর বিলের মধ্যস্থিত যে দ্বীপটি—যাহাকে স্থানীয় লোকেরা নন্দনকানন বলিয়া জানে সেখানেই পাওয়া গিয়াছে। জমিদারের মৃত্যুর কারণ জানা যায় নাই। রহস্যজনক বলিয়াই মনে হয়। মৃত্যুঞ্জয় চৌধুরী অত্যন্ত অমায়িক ও দানশীল ব্যক্তি ছিলেন। তাঁহার জমিদারীর উন্নয়নকল্পে এযাবৎকাল তিনি বহু অর্থ ব্যয় করিয়াছিলেন। ইত্যাদি।
