অতীত!
অতীতকেই সর্বাগ্রে জানতে হবে এ রহস্যের মীমাংসা করতে হলে। চিন্তিত কিরীটী নন্দনকাননের মধ্যে ঘুরে ঘুরে বেড়াতে লাগল। এবং ঘুরতে ঘুরতেই একসময় কিরীটী একেবারে জলের ধার ঘেষে এসে দাঁড়ায়।
সহসা পাড়ের একটা জায়গা ওর দৃষ্টিকে আকর্ষণ করে। সেখানকার মাটিতে যে লম্বা লম্বা ঘাসগুলো আছে সেগুলো যেন মাটির বুকে একেবারে লেপটে আছে। একটু নিস্তেজ ও শুকনোও যেন। নিঃশব্দে কৌতুহলে এগিয়ে গিয়ে কিরীটী সেখানকার মাটির ঘাসগুলো পরীক্ষা করতে থাকে। নিয়মিত ভাবেই দীর্ঘদিন ধরে কোন ভারী বস্তুবিশেষের চাপে যেন সেখানকার মাটি আর ঘাস থেতলে গিয়েছে। কোন ভারী বস্তুর ধাক্কা খেয়ে খেয়ে জায়গাটা যেন চিহ্নিত হয়ে আছে আশপাশের পাড়ের অন্যান্য অংশ হতে।
কিরীটী তার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি দিয়ে চারিদিক পরীক্ষা করে দেখতে লাগল। পাড়ের অন্যান্য অংশের চাইতে গাছপালাগুলোও এখানে যেন একটু ঘন সন্নিবেশিত, একটু ছায়াবহুল, একটু অন্ধকার, একটু নির্জন। বড় বড় শাখাপ্রশাখা ও পত্রবহুল দুটো পলাশবৃক্ষ। একটি পলাশবৃক্ষের তলে মস্ত বড় একটা পাথরের মত আছে। আরো একটু এগিয়ে কিরীটী পাথরটার সামনে এসে দাঁড়াল। আশ্চর্যই লাগে কিরীটীর। পাথরটা বেশ পরিচ্ছন্ন। এই জঙ্গলাকীর্ণ মানুষের অগম্য স্থানে অমনি একটি পরিষ্কার পাথর কিরীটীর দৃষ্টি আকর্ষণ না করে পারে না। চিন্তিত মনেই কিরীটী পাথরটার উপর এগিয়ে গিয়ে উপবেশন করল।
সূর্য পশ্চিমাকাশে হেলে পড়েছে। প্রখর রৌদ্রের তেজ অত্যন্ত স্তিমিত অবসন্ন। চারিদিকে বিস্তৃত হয়ে পড়েছে একটা স্নিগ্ধ ছায়া। নিস্তরঙ্গ বিলের জল। সামনের দিকে তাকাল কিরীটী। পূর্ব ও পশ্চিম দিকে এক দিকে তার পশ্চাতে নন্দনকানন, অন্য দিকে যতদূর দৃষ্টি চলে কেবল জল আর জল। দক্ষিণদিকে অস্পষ্ট পাড়ের রেখা দেখা যায়। বৈকালের ম্রিয়মাণ আলোয় দেখা যায় কেবল একটা ধূসর রেখা। বোঝা যায় ঐদিকটার পাড়ে গাছপালা আছে। এই দ্বীপ থেকে দক্ষিণের ঐ পাড়ের দুরত্ব কতটা হবে? খুব বড়জোর আধমাইলটাক হবে হয়ত।
আরো কিছুক্ষণ বাদে কিরীটী উঠে দাঁড়াতে যাবে, সহসা ওর নজরে পড়ল দিনশেষের ম্লান আলোয় ঠিক ওর পায়ের নিচেই ঘাসের উপরে কি যেন একটা চিকঠিক করছে। কৌতূহলভরে কিরীটী ঝুঁকে নিচু হয়ে ঘাসের উপর থেকে হাত বাড়িয়ে বস্তুটা তুলে নিল।
স্বর্ণ-অঙ্গুরীয় একটি।
হাতের পাতার উপরে স্বর্ণ-অঙ্গরীয়টি রেখে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে পরীক্ষা করতে লাগল কিরীটী। ওর নজর পড়ল অঙ্গরীয়ের উপরে একটি নামের আদ্যাক্ষর লেখা, দেবনাগরী অক্ষরে অক্ষরটা হচ্ছে ল। কিরীটী অঙ্গরীয়টা বুকপকেটের মধ্যে রেখে দিল।
স্থানত্যাগ করে এবারে কিরীটী নন্দনকাননের মধ্যস্থিত বিরাম-কুটীরের দিকে অগ্রসর হলো।
আকাশের আলো যেন আরো ম্লান হয়ে এসেছে। একটা বিষণ্ণ করুণ স্তব্ধতা চারিদিকে যেন জমাট বেধে উঠছে ক্ৰমে ক্ৰমে। অদ্ভুত একটা স্তব্ধতা, কেবল মধ্যে মধ্যে চারিপাশ্বের বৃক্ষাদি হতে এক-আধটা পাতা খসে খসে পড়ছে নিঃশব্দে। সহসা কতকগুলো বিচিত্র পাখীর শব্দে চারিদিক মর্মায়িত হয়ে উঠলো। সন্ধ্যায় নীড়াগতা পাখীর দল।
কিরীটী এগিয়ে গিয়ে বিরাম-কুটীরের বারান্দায় উঠলো এবং কয়েক পা অগ্রসর হতেই অস্পষ্ট আলোয় ওর নজরে পড়ল বারান্দার ধুলায় অস্পষ্ট কতকগুলো ছোট ছোট পদচিহ্ন।
ভাল করে পরীক্ষা করে দেখবার জন্য কিরীটী পকেট হতে শক্তিশালী টর্চবাতিটা বের করে বোতাম টিপে টর্চের আলোয় সেই পদচিহ্নগুলি দেখতে লাগল।
ক্ষীণ অষ্পষ্ট পদচিহ্ন! স্বভাবতঃ চট করে কারো দৃষ্টিতে পড়বে না। ভিজে কাদামাখা পায়ে কেউ কোনদিন হেঁটে গিয়েছিল। হয়ত তারই অস্পষ্ট চিহ্ন—আজও সামান্য যা বোঝা যাচ্ছে। এবং আরো নজরে পড়ল সেই পদচিহ্নগলোর আশেপাশেই ধুলোর ওপর জুতোর সোলের কতকগুলো ছাপ। ছাপগুলো প্রথম পায়ের ছাপ হতে অনেক স্পষ্ট। বোধ হয় অল্প কিছুদিন আগে মাত্র জুতো পায়ে কেউ এখানে এসেছিল। ক্রেপ সোল দেওয়া জুতোর ছাপ। প্রমোদভবনে কে কি রকম জুতো পায়ে দেয়? কিরীটীর মনে পড়ল, লক্ষ্য করেছে সে একমাত্র সত্যজিৎই ভারী ক্রেপ সোলের জুতো পায়ে দেয়। সত্যজিৎই এসেছিল হয়ত এখানে। মনে মনে হাসে কিরীটী। অনুসন্ধিৎসা আছে ছেলেটির, দেখেশুনে শেষ পর্যন্ত হালে পানি না পেয়েই তার দ্বারস্থ হয়েছে। কিন্তু পাশের ঐ অস্পষ্ট পদচিহ্নগুলো কার? পদচিহ্নের গঠন ও আকার দেখে মনে হয় কোন স্ত্রীলোকেরই পদচিহ্ন ওগলো। তবে কি সবিতাও এসেছিল সত্যজিতের সঙ্গে এখানে? কিন্তু তাই বা কি করে হবে? যতদূর মনে পড়ে ও লক্ষ্য করেছে, সবিতা তো কদাপি খালি পায়ে চলাফেরা করে না। এমন কি বাড়ির মধ্যে কক্ষেও না। এতদূর সে খালি পায়ে নিশ্চয়ই আসেনি? তবে কার পদচিহ্ন?
ক্রমে এক এক করে কিরীটী বিরাম-কুটীরের সমস্ত কক্ষগুলোই পরীক্ষা করে দেখল। অনুরূপ পদচিহ্ন আর কোথাও সে দেখতে পেল না।
দিনের বেলা আর একবার এসে বিরাম-কুটীরটা ভাল করে পরীক্ষা করে দেখতে হবে।
বাইরে সন্ধ্যার কালো ছায়া একটু একটু করে ক্রমে যেন চারিদিক ছেয়ে ফেলছে। ধূসর আলোয় আশেপাশের গাছপালাগুলো অস্পষ্ট ছায়ার মত মনে হয়।
নির্দিষ্ট নিজের কক্ষের দ্বার ঠেলে ভিতরে প্রবেশ করতেই কিরীটী চমকে উঠল। ইতিমধ্যে এক সময় ভৃত্য এসে কক্ষের আলোটা জেলে দিয়ে গেলেও আলোর শিখাটা কমানো। মৃদু আলোয় কিরীটীর চোখ পড়ল কক্ষের মধ্যে একটা চেয়ার অধিকার করে বসে আছে সন্তোষ চৌধুরী।
