মুগ্ধ বিস্ময়ের সঙ্গেই কল্যাণী কিরীটীর যুক্তিপর্ণ আলোচনা শুনছিল। সামান্য একটা ব্যাপারকে সে কত তীক্ষ্ণ অনুসন্ধিৎসা ও যুক্তি দিয়ে বিচার করে ভাবলেও চমৎকৃত হতে হয়।
কিরীটীর কণ্ঠস্বর আবার শোনা গেল, রাজহাঁস যেমন দুধ ও জলের মধ্যে থেকে কেবল দুধটাকেই ছেকে টেনে বের করে নেয়, রহস্যের তদন্তের ব্যাপারেও আমাদের তেমনি ইতস্ততঃ বিক্ষিপ্ত ঘটনার মধ্য হতে নির্জলা প্রয়োজনীয় সত্যটকু ছেকে নিতে হবে। তবেই না সমস্ত রহস্যটা সহজ হয়ে আসবে! তারপর সহসা কিরীটী নিজের হাতঘড়িটার দিকে তাকিয়ে বললে, কিন্তু এবারে আমাকে একবার থানার দিকে যেতে হবে যে কল্যাণী!
এখন থানায় যাবেন?
হ্যাঁ, বেলা প্রায় আড়াইটে হল, দেখে আসি সন্তোষ-পর্ব কতদূর গড়াল! মৃদু হাস্য সহকারে কথাটা বলতে বলতে কিরীটী চেয়ারটা হতে গাত্রোত্থান করল।
কখন ফিরবেন মিঃ রায়?
বেশী দেরি হবে না। সন্ধ্যার আগেই হয়ত ফিরতে পারবো।
কল্যাণী কক্ষ হতে বের হয়ে যাবার পর কিরীটী সর্বপ্রথমে ঘরের দরজাটায় খিল তুলে দিল। সত্যজিৎ এখন সবিতার ঘরেই আছে, চট করে এ ঘরে আসবে না। মাত্র কয়েক দিন আগেকার তার ভবিষ্যৎ বাণীটা মনে পড়ে যায়, বর্তমান এই কেসেরই কথাপ্রসঙ্গে তার কলকাতার বাড়িতে বসে সত্যজিৎকে যে আশ্বাসটুকু সে দিয়েছিল সবিতা সম্পর্কে, মনের দিক দিয়ে তাদের যে অপূর্ব একটা মিল গড়ে উঠেছে এই কদিনের সান্নিধ্যেই—সেটা আর কারো চোখে না পড়লেও কিরীটীর প্রখর ও সজাগ দৃষ্টিকে এড়াতে পারেনি। দুজনের মিলেছে ভাল। এবং সামান্য এই কদিনের আলাপ-পরিচয়ে কিরীটী বুঝতে পেরেছিল বেশ বলিষ্ঠ চরিত্রের ছেলেটি। বেশীর ভাগ সময়ে সবিতা ও সত্যজিৎ প্রায় একই সঙ্গে থাকে। সত্যজিতের নিরবসর সাহচর্যে পিতার আকস্মিক মৃত্যু শোকটাও সবিতার কাছে অনেকটা সহনীয় হয়ে এসেছে। একটিবার নন্দনকাননটা ঘুরে দেখে আসতে হবে, সেই কারণেই কিরীটী কাজের দোহাই দিয়েই আপাততঃ কল্যাণীকে বিদায় দিয়েছে ঘর থকে। থানায় যাবার জন্য লক্ষ্মীকান্ত আমন্ত্রণ জানিয়ে গেলেও আপাততঃ তার যাবার ইচ্ছা নেই। অতএব এই হচ্ছে উপযুক্ত অবসর। নায়েব বসন্তবাবু কাছারি বাড়িতে গিয়েছেন টমটম নিয়ে। সবিতা ও সত্যজিৎ উপরে সবিতার ঘরে বিশ্রম্ভালাপে রত। নিত্যানন্দ সান্যাল এখন, দিবানিদ্রা দিচ্ছেন। বাড়ির দাসদাসীরাও এখন বিশ্রাম নিচ্ছে। কিরীটী একটা জামা গায়ে দিয়ে নিঃশব্দে ঘর হতে বের হয়ে দোতলার শুন্য বারান্দাটার উপরে এসে দাঁড়াল। দ্বিপ্রহরের নির্জনতায় সমস্ত প্রমোদভবন যেন নিস্তব্ধ হয়ে আছে। কোথায়ও এতটুকু সাড়াশব্দ পর্যন্ত যেন নেই। কার্নিশের ওপরে কবুতরগুলিও নিস্তব্ধ। তথাপি তীক্ষ্ণ অনুসন্ধানী দৃষ্টিতে চারিদিকে এক বার তাকিয়ে নিয়ে কিরীটী সিঁড়ি দিয়ে নেমে এলো জামার পকেটে খুরপীর মত একটা ছোট্ট অস্ত্র নিয়ে। নিচের অনুরুপ বারান্দাটা অতিক্রম করে কিরীটী বাঁধানো আঙ্গিনাটার উপরে এসে দাঁড়াল। মাথার উপরে সূর্য অনেকটা হেলে পড়েছে, তথাপি আষাঢ়ের তীব্র রৌদ্রদাহ চারিদিক যেন ঝলসে দিচ্ছে। আঙ্গিনা অতিক্রম করে শেষপ্রান্তের একটা খালি অব্যবহার্য ঘরের মধ্যে এসে সে ঢুকল। গতকালই দ্বিপ্রহরের দিকে কিরীটী গোটা বাড়িটাই একবার ঘুরে ঘুরে দেখছিল। ঐ ঘরের মধ্যে একটা দরজা আছে। আঙ্গিনার দরজাটি ছাড়াও যে দরজাপথে প্রমোদভবনের বাইরে নন্দনকাননে যাবার জঙ্গলের মধ্য দিয়ে বাঁধানো পথটার উপরে গিয়ে পড়া যায়। দরজাটা খুলে কিরীটী সেই পথের উপরে এসে দাঁড়াল। ঐ পথ দিয়ে নন্দনকানন যেতে মিনিট পাঁচেকের বেশী লাগে না। নন্দনকাননে পৌঁছে কিরীটী জঙ্গলাকীর্ণ বাগানটার মধ্যে অন্যমনস্ক ভাবে ঘুরে ঘুরে বেড়াতে লাগল। এবং ঘুরতে ঘুরতেই একসময় কিরীটী পূর্ববর্ণিত সেই পুরাতন পত্রবহুল বকুল বৃক্ষটির নিচে ছায়ায় এসে দাঁড়াল।
এই বকুলবৃক্ষতলই হচ্ছে অকুস্থান।
একটি মৃতদেহ এই বৃক্ষতলে দীর্ঘ উনিশ বৎসর আগে আবিষ্কৃত হয়েছিল, দ্বিতীয় মৃতদেহটি মাত্র কয়দিন আগে আবিষ্কৃত হয়েছে। সহসা একটা কথা কিরীটীর মনে হয়। এই নন্দনকানন দীর্ঘকাল অব্যবহার্যই পড়ে ছিল। বহুদিন মানুষের পদচিহ্ন এখানে পড়েনি। প্রমোদভবন হতে নন্দনকাননে আসবার যে দুটি দ্বারপথ—তার চেহারা ও অবস্থা দেখলেই বোঝা যায় বহুদিন সে দ্বার দুটি ব্যবহার করা হয় নি। খোলা হয় নি ঐ দ্বার দুটি। মানুষের বর্জন ও অবহেলায় ক্রমে এই নন্দনকানন আগাছা ও জঙ্গলে পরিকীর্ণ হয়ে উঠেছিল। এসব সত্ত্বেও নায়েব বসন্ত সেন এইখানেই বা কেন তার প্রভুর অন্বেষণে এসেছিল? তবে কি এখানে মধ্যে মধ্যে মৃত্যুঞ্জয় চৌধুরী আসতেন? এবং সে সংবাদ কি বসন্ত সেনের অগোচর ছিল না? যদি ধরে নেওয়া যায় আসতেনই, তাহলে সে কথাটা জানা বসন্ত সেনের পক্ষে অন্ততঃ অসম্ভব ছিল? কিন্তু কেনই বা মৃত্যুঞ্জয় চৌধুরী এই নন্দনকাননে আসতেন? তাঁর মৃতা স্ত্রীর কথা স্মরণ করেই কি? দীর্ঘ উনিশ বৎসর ধরে কারো স্মৃতি এমনি করে বহুন করা সম্ভব কিনা এবং সম্ভব হলেও মৃত্যুঞ্জয়-চরিত্রে সেটা সম্ভব ছিল কিনা? মৃত্যুঞ্জয় স্ত্রীকে অবশ্যই ভালবাসতেন, নচেৎ আর দ্বিতীয়বার দ্বার পরিগ্রহই বা করলেন না কেন? সংযমী ও মিতবাক পুরুষ ছিলেন মৃত্যুঞ্জয় এবং চরিত্রের তাঁর ঐ দিকটা অবশ্য সবিতার কথা হতেই জানা গিয়েছে। স্ত্রীকে ভালবাসলেও তিনি কদাপি ভুলেও একমাত্র কন্যা সবিতার সঙ্গেও মৃতা স্ত্রীর সম্পর্কে আলোচনা করতেন না। কিন্তু কেন? এও কি স্ত্রীর প্রতি গভীর প্রেমেরই একটা লক্ষণ? না তার কোন নিগূঢ় কারণ ছিল? কোন কারণেই তিনি স্ত্রীর সম্পর্কে যাবতীয় আলোচনা সযত্নে ইচ্ছাপূর্বকই এড়িয়ে চলতেন, এমন কি একমাত্র কন্যার নিকটে পর্যন্ত। সঙ্গে সঙ্গে কিরীটীর আরো একটা কথা মনে হয়, উনিশ বৎসর পরে একদা প্রভাতে অসুস্থ স্ত্রীকে সহসা তাঁর ঘরে শয্যায় না দেখতে পেয়ে কি কারণেই বা স্ত্রী সম্পর্কে তিনি অমন সতর্কতা অবলম্বন করেছিলেন? স্ত্রীকে ঘরে পাওয়া যাচ্ছে না, সেজন্য তাঁর অমন লুকোচুরি করারই বা কি এমন প্রয়োজন ছিল? খোলাখুলি ভাবে ব্যাপারটা সকলের সঙ্গে আলোচনা না করে অমন রহস্যজনক ভাবে রাতারাতি অসুস্থা স্ত্রীকে চিকিৎসার দোহাই দিয়ে কলকাতায় নিয়ে চলে যাবারই বা কি প্রয়োজন ছিল? কেন সমগ্র ঘটনাকে অমনভাবে সাজানো হলো? লোকে যদি জানতই যে তাঁর স্ত্রীকে বাড়ির মধ্যে পাওয়া যাচ্ছে না, তাতে একটা দুর্নামের বা কলঙ্কের কথা ওঠা হয়ত স্বাভবিকই ছিল কিন্তু তার চাইতেও কি বেশী কিছু সন্দেহ মৃত্যুঞ্জয়ের মনের মধ্যে ছিল?
