কিরীটীবাবু?
কল্যাণীর গলার স্বরে কিরীটী যেন বেশ একটু বিস্মিত হয়েই ওর মুখের দিকে তাকাল, বলুন?
একটা অনুরোধ আমার—দাবীও বলতে পারেন। আপনি অবশ্য কথাটা মানবেন কিনা জানি না, তবে আমার কি মনে হয় জানেন, কোন কোন ক্ষেত্রে সামান্য কয়েক ঘণ্টার আলাপ-পরিচয়েই কেউ কেউ পরস্পরের কাছে এত ঘনিষ্ঠ ও এত সহজ হয়ে আসে যে ভাবতেও অনেক সময় বিস্ময় লাগে। এই ধরুন আপনার কথাই। কতক্ষণেরই বা আলাপ আপনার সঙ্গে, অথচ মনে হচ্ছে যেন আপনার সঙ্গে বুঝি কতদিনেরই না পরিচয়! হয়ত আপনি মনে মনে হাসছেন, কিন্তু
কেন, হাসবো কেন? কিরীটী হাস্যোদীপ্ত কণ্ঠেই বাধা দিয়ে বলে ওঠে।
সে যাই হোক, সেই দাবীতেই অনুরোধটা জানাচ্ছি, আপনি আমাকে আপনি বা মিস সান্যাল না বলে শুধু কল্যাণী বলে ডাকলে কিন্তু ভারী খুশী হবে এবং সেই সঙ্গে যদি আপনির দুরত্বটা তুলে দিয়ে তুমি বলে সম্বোধন করেন, তাহলে খুশীর সত্যিই বলছি অন্ত থাকবে না। তাছাড়া বয়সেও তো আমি আপনার চাইতে অনেক ছোটই হব, সেদিক দিয়েও তো অনায়াসেই আমাকে আপনি তুমি বলে ডাকতে পারেন।
বেশ তো। তুমি বলে ডাকলেই যদি তুমি খুশী হও কল্যাণী তাই হবে। কিরীটী স্নিগ্ধ কণ্ঠে জবাব দেয়।
আঃ, বাঁচলাম। এবারে নিশ্চিন্ত মনে বলি, খাওয়া-দাওয়ার পর বিছানায় শুয়ে পিসেমশাইয়ের হত্যার ব্যাপারটাই ভাবছিলাম। একটা ব্যাপারে কেমন যেন খটকা লাগছে।
কি বলুন তো
আবার বলুন?
ও ভুল হয়ে গিয়েছে, বল!
আচ্ছা এই পিসিমার হত্যার ব্যাপারটা—নায়েব বলেছেন তিনি ও সম্পর্কে কিছুই জানেন না, এও কখনো হতে পারে?
কৌতুকে কিরীটী প্রশ্ন করে, কেন?
না, অনেক দিনকার পুরাতন লোক উনি এ বাড়ির, শুধু তাই নয়। পিসেমশাইয়ের একদিক থেকে যতদূর শুনলাম নাকি বন্ধুর মতই ছিলেন উনি। আমার তো মনে হয়, বিশেষ কারণেই কথাটা তিনি অস্বীকার করছেন এখন।
তুমি হয়ত ঠিকই ধরেছ কল্যাণী, তাহলেও এত তাড়াতাড়ি কোন বিষয়েই চট করে মতামত প্রকাশ করা উচিত নয়।
তারপর কানাইয়ের মার অন্তর্ধানের ব্যাপারটা!
কি মনে হয় তোমার?
এর পিছনেও কোন রহস্য আছে।
কি রকম?
পাছে কানাইয়ের মা উপস্থিত থাকলে পিসিমার ব্যাপারটা প্রমাণিত হয়, তাই হয়ত তাকে সরানো হয়েছে কৌশলে।
স্বাভাবিক।
কিন্তু বেচারীকে খুন করে কেউ ঐ বৌরাণীর বিলের জলে ড়ুবিয়ে দেয়নি তো?
তাতেও আশ্চর্য হবার কিছু নেই কল্যাণী।
বলেন কি?
ঠিক তাই। একটা মিথ্যাকে ঢাকতে গিয়ে যেমন সেই সঙ্গে দশটা মিথ্যার আমদানি করতে হয়, তেমনি বহু ক্ষেত্রেই দেখা গেছে একটা হত্যার ব্যাপারকে চাপা দেওয়ার জন্য আরো দুএকটা আনুষঙ্গিক হত্যা এসে পড়ে। অথচ হত্যাকারী বোঝে না যে সে নিজে যত ধূর্ত ও ক্ষিপ্রই হোক না কেন, হত্যা তার পথ-রেখা বা চিহ্ন সর্ব ক্ষেত্রেই রেখে যাবেই পশ্চাতে। এবং সেই পথরেখা ধরে এগিয়ে চললে তাকে ধরা দিতে হবেই, সুব্রতকেও আমি বহুবার বলেছি এ কথা। কেবল একটা ছকে ফেলা—
কিন্তু সেই ছকে ফেলা
হ্যাঁ, সেজন্য কিছু সূত্রের (clue) আবশ্যক। Detection-এর মূল কথাটাই তো তাই। সুত্রকে খুঁজে বের করতে হবে
How interesting!
Interesting সন্দেহ নেই, তবে সমগ্র ব্যাপারটাকে interesting করে তুলবার জন্য স্থির বিচার-বুদ্ধি, বিবেচনা-শক্তি ও সতর্ক তীক্ষ্ণ সজাগ দৃষ্টির প্রয়োজন প্রতি মুহূর্তে। সমস্ত ব্যাপারটাই যেন একটা বুদ্ধির অঙ্ক।
বুদ্ধির অঙ্ক?
হ্যাঁ। তোমাকে যখন বর্তমান এই detection ব্যাপারে সহকর্মী হিসাবেই নিয়েছি, কয়েকটা প্রশ্ন তোমাকে ভাববার জন্য দিচ্ছি। ভেবে জবাব দিও।
প্রশ্ন? বলুন?
প্রথম প্রশ্ন হচ্ছে—মৃত্যুঞ্জয় চৌধুরী ও তাঁর স্ত্রী হেমপ্রভার মৃত্যুর মধ্যে কোন যোগাযোগ আছে কিনা? ২নং প্রশ্ন হচ্ছে—যদি থেকেই থাকে তাহলে প্রথম ও দ্বিতীয় মৃত্যুর মধ্যে দীর্ঘ এই উনিশ বৎসরের ব্যবধান কেন হলো? ৩নং প্রশ্ন—ঐ উনিশ বৎসরের ব্যবধানে একই হত্যাকারীর পক্ষে একই কারণে দুজনকেই হত্যা করা সম্ভবপর কিনা? বুঝতে পারছো বোধ হয়, তৃতীয় প্রশ্নের যদি জবাবটা খুঁজে পাও, ঐ সঙ্গেই প্রথম প্রশ্নের জবাবটাও সহজ হয়ে আসবে।
হুঁ।
৪নং প্রশ্ন—দুটি মৃতদেহই ঐ একই জায়গায় বকুলবৃক্ষতলে পাওয়া গেল কেন? দুবারই হত্যার স্থান ঐ বকুলবৃক্ষতলই বেছে নেওয়া হয়েছিল, না দ্বিতীয় হত্যার পর মৃতদেহ ঐ জায়গায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল? নিয়ে যাওয়াই যদি হয়ে থাকে, কি তার উদ্দেশ্য ছিল? শুধু তাই নয়, যদি ধরে নেওয়া যায়। ঐখানেই মৃতদেহ বহন করেই নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, স্বভাবতই একটা প্রশ্ন। জাগবে মনে, হত্যাকারী দেহে প্রচুর শক্তি ধরে। ঐ সঙ্গে একথাও মনে হবে, তাহলে কোথায় হত্যা করা হয়েছিল?
আচ্ছা একটা কথা মিঃ রায়, আপনি কি তাহলে ধরেই নিচ্ছেন কানাইয়ের মা পিসিমার মৃত্যু সম্পকে যে কাহিনী বলেছে তা সত্য?
নিশ্চয়ই।
কিন্তু তার প্রমাণ কি?
Yes, it is an intelligent question! প্রমাণ? এক্ষেত্রে প্রমাণের চাইতে probability উপরেই আমি বেশী জোর দিয়েছি,
কিন্তু কেন?
প্রথমত কানাইয়ের মার মত একজন স্ত্রীলোকের পক্ষে এ ধরনের একটা চমৎকার কাহিনী গড়ে তুলে বলবার যেমন কোন উদ্দেশ্যও থাকতে পারে না, তেমনি তার মত একজন অশিক্ষিত দাসীর পক্ষে সম্পূর্ণ পারম্পর্য ও যুক্তি বজায় রেখে এমন একটা সুষ্ঠ কাহিনী রচনা করে তুলবার ক্ষমতা থাকতে পারে না। দ্বিতীয়তঃ অনেকদিনকার পুরোনো দাসী এ বাড়ির সে এবং হেমপ্রভা দেবীর বাপের বাড়ি থেকেই সে এসেছে। খাস দাসী ছিল সে হেমপ্রভা দেবীর। এবং তার প্রতি একটা প্রগাঢ় স্নেহ ও ভালবাসা গড়ে ওঠা কানাইয়ের মার পক্ষে অসম্ভব তে নয়ই—অস্বাভাবিকও নয়। সেদিক দিয়েও যদি বিচার করে দেখি তাহলে দেখা যাবে হেমপ্রভা দেবীর কোনরুপ কলঙ্ক রটে বা তাঁর চরিত্রের প্রতি কোনরুপ বাঁকা ইঙ্গিত আসতে পারে, কানাইয়ের মার দ্বারা সেটাও খুব স্বাভাবিক নয়। তৃতীয়তঃ কনাইয়ের মার মত একজন স্ত্রীলোকের ঐভাবে তারই মনিব-পত্নীর সম্পর্কে একটা কল্পিত কাহিনী গড়ে তুলে বলবারই বা কি স্বার্থ থাকতে পারে! চতুর্থতঃ ঘটনাটা আপনি প্রকাশ না করবার যে হেতু কানাইয়ের মা দর্শিয়েছে, সেটাও আমার চোখে খুবই স্বাভাবিক লেগেছে। এবং শেষ ও পঞ্চম, আচমকা এইভাবে কানাইয়ের মা নিরুদ্দিষ্টা হওয়ায় তার বর্ণিত কাহিনী যে মিথ্যা নয়—কথাটা আরো বেশী করেই আমার কাছে সত্য বলে মনে হচ্ছে। আর একমাত্র সেই কারণেই আজ সকাল থেকে কানাইয়ের মার নিরুদিষ্টা হবার পর থেকে বর্তমান রহস্যের চিন্তাধারাটা আমি একটা নির্দিষ্ট পথে চালনা করতে সক্ষম হয়েছি।
