বেশীর ভাগই রাজপুতানার ফটো দেখছি! অ্যালবামটা কার সবিতা দেবী।
অ্যালবামটা এর আগে কখনও আমি দেখিনি; বোধ হয় বাবারই
আপনার বাবার ফটো তুলবার শখ ছিল বুঝি একসময়?
বলতে পারি না ঠিক। কখনও বাবাকে ফটো তুলতে আমি দেখিনি।
এককালে হয়ত তিনি খুব দেশভ্রমণ করেছেন। আপনার বাবার মুখে। কখনও দেশ ভ্রমণের গল্প শোনেননি মিস চৌধুরী?
না।
সাধারণতঃ আপনার বাবার সঙ্গে আপনার কি ধরনের কথাবার্তা হত?
এই আমার লেখাপড়া, আমার কলেজের কথা এই সবই আলোচনা করতাম আমরা। সবিতা জবাব দেয়।
হুঁ। অ্যালবামটা আমার কাছে আমি রাখতে পারি আপাততঃ?
বেশ তো, রাখুন না।
কিরীটী অতঃপর কাগজপত্রগুলো পরীক্ষা করে দেখতে লাগলো। কাগজগুলো দেখতে দেখতে একটা খামের মধ্যে খানকতক পুরাতন চিঠি যত্নের সঙ্গে লাল সুতো দিয়ে বাঁধা অবস্থায় পেল।
চিঠিগুলো খুলে পরীক্ষা করতে গিয়ে কিরীটী একটু আশ্চর্যই হয়, চিঠিগুলো অনেকদিন আগেকার এবং হিন্দী ভাষায় লেখা।
হিন্দী ভাষায় দেবনাগরী অক্ষরে লেখা চিঠি!
খান-চার-পাঁচ চিঠি। চিঠিগুলো কিরীটী অ্যালবামটার মধ্যেই খাম সমেত রেখে দিল। সহসা একসময়ে কিরীটী শূন্য শয্যাটির দিকে তাকিয়ে সবিতার প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ করে বললে, যে রাত্রে আপনার বাবা নিহত হন, সে রাত্রে শয্যার উপর যে চাদর ও বেডকভার বিছানো ছিল সেগুলো কি বদল করা হয়েছে মিস চৌধুরী?
না। কেবল ঐ বেডকভারটা বিছানার উপর ছিল না, ওটা পরে আমি পেতে বিছানাটা ঢেকে রেখেছি।
কিরীটী এগিয়ে গিয়ে বিছানার উপর থেকে বেডকভারটা টেনে তুলে ফেলে বিছানার চাদরটা একবার ভাল করে পরীক্ষা করে দেখল।
একটা কথা সবিতা দেবী, যে রাত্রে আপনার বাবা নিহত হন, পরের দিন সকালে ঐ ছাদের দিকের দরজাটা কি খোলা দেখা গিয়েছিল?
তা তো বলতে পারি না! বনমালী হয়ত বলতে পারবে।
ঐদিন দ্বিপ্রহরে আহারাদির পর কিরীটী একাকী তার ঘরের মধ্যে বসে একটা চেয়ারের উপরে সকালবেলা মৃত্যুঞ্জয় চৌধুরীর টেবিলের ড্রয়ার থেকে আনা ফটোর অ্যালবামটা আবার একবার উল্টেপাল্টে দেখছিল।
একটা পাতায় এসে দৃষ্টি যেন মুগ্ধ বিস্ময়ে স্থির হয়ে থাকে।
একটি মন্দিরের চত্বরে দাঁড়িয়ে পূজারিণীর বেশে একটি অপরুপ সুন্দরী ১৯।২০ বৎসর বয়স্কা রাজপুতানী মেয়ে। ফটোটা অনেকদিনের পুরাতন হলেও এবং ফটোর বর্ণ অনেকটা ফিকে হয়ে এলেও মেয়েটির অপরুপ দেহশ্রী ও সৌন্দর্য এখনও একেবারে চাপা পড়ে যায়নি।
মেয়েটি হাসছে। পরিধানে ঘাগরা ও গায়ে ওড়না। বুকের দুপাশ দিয়ে ঝুলছে দুটি বেণী।
সহসা বাইরে পদশব্দ শোনা গেল।
চমকে উঠে তাড়াতাড়ি হাতের অ্যালবামটা বন্ধ করে বিছানার তলায় রেখে দিয়ে দরজার দিকে তাকাল। দরজাটা অবশ্য ভেজানোই ছিল।
দরজার গায়ে মৃদু করাঘাত শোনা গেল, আসতে পারি? কে, কল্যাণী দেবী! আসুন, আসুন। কিরীটী মৃদু আহ্বান জানাল। কল্যাণী এসে ঘরের মধ্যে প্রবেশ করল।
অপূর্ব সাজ পরেছে সে। পাঞ্জাবী মেয়েদের মত ঢিলা পায়জামা, পাঞ্জাবি ও রেশমী একটা উড়নী গলায় ভাঁজ করা।
বাঃ! চমৎকার মানিয়েছে কিন্তু আপনাকে এই বেশে মিস সান্যাল! কিরীটী মৃদু কণ্ঠে বলে।
নিজেকে অত্যন্ত free মনে হয় এই পোশাকে।
তা তো হবেই। ওই বেশেই যে আপনি অভ্যস্ত। কিরীটী জবাব দেয়।
বোধ হয় তাই। কিন্তু একা একা ঘরের মধ্যে বসে আপনি করছিলেন কি?
বসুন, দাঁড়িয়ে রইলেন কেন? কিরীটী কল্যাণীর দিকে তাকিয়ে স্মিতভাবে বললে।
১৫. তাহলে বসেই পড়া যাক
তাহলে বসেই পড়া যাক, কি বলেন? সম্মুখের চেয়ারটা টেনে বসতে বসতে, হাস্যদীপ্ত কণ্ঠে কল্যাণী বললে।
হ্যাঁ বসুন।
ঘরের কোণে একটা শাবল ও ছোট কোদালের উপরে হঠাৎ নজর পড়ে কল্যাণীর। বিস্মিত দৃষ্টিতে বস্তু দুটির দিকে তাকিয়ে কল্যাণী প্রশ্ন করলে, ব্যাপার কি? কোদাল আর শাবল দিয়ে কি হবে মিঃ রায়?
মাটি খুড়বো। হাসতে হাসতেই জবাব দেয় কিরীটী।
মাটি খুড়বেন! হঠাৎ মাটি খুড়বার কি প্রয়োজন হলো আবার?
জানেন না, মাটি খুঁড়তে খুড়তেই কত বিরাট বিস্ময়ের আমরা সন্ধান পেয়েছি! কত শত বৎসরের ঘুমন্ত অতীতকে মাটির কবর-শয্যা হতে চোখের সামনে খুঁজে পেয়েছি! তক্ষশীলা, মহেঞ্জোদড়ো, হরোপ্পা।
তা যেন হল, কিন্তু এখানেও সে সব আছে নাকি?
নেই যে তাই বা কে বলতে পারে? কবির বচন জানেন না যতন করহ লাভ হইবে রতন!
সত্যি মিঃ রায়, আপনি হেয়ালি করেও কথা বলতে পারেন!
সে কথা যাক। আপনাকে একটা কাজের ভার দিতে চাই, পারবেন?
নিশ্চয়ই। বলুন কি কাজ? উৎসাহিত হয়ে ওঠে কল্যাণী।
সন্তোষবাবুর উপরে আপনাকে একটু নজর রাখতে হবে।
সন্তোষবাবু! তাকে তো সকালবেলা থানার দারোগা arrest করে নিয়ে গেল—কিন্তু কেন বলুন তো, হঠাৎ ভদ্রলোককে arrest করল কেন?
আমার যতদূর মনে হয়, সন্তোষবাবুকে arrest করবার মত উপযুক্ত evidence লক্ষ্মীকান্ত সাহার ঝুলিতে নেই। হয়ত কয়েকটা জিজ্ঞাসাবাদ করেই ছেড়ে দিতে বাধ্য হবে।
কিন্তু এও তো ভারী অন্যায়। এমনি করে হুট করে একজন ভদ্রলোককে arrest করে নিয়ে যাওয়া!
অন্যায় বৈকি। কিন্তু ঘটনাচক্রে এমন বিশ্রী সময়ে ও এমন বিশ্রী পরিস্থিতির মধ্যে তিনি এসে পড়েছেন যে, এ রকমটা হওয়া বিশেষ কিছুই আশ্চর্য নয়। দশচক্রে ভগবান ভূত বলে একটা প্রবাদ আছে না আমাদের দেশে, এক্ষেত্রেও অনেকটা তাই হয়েছে মিস সান্যাল।
