নিশ্চয়ই হবে।
বেশ।
মৃত্যুঞ্জয় চৌধুরীর শয়নকক্ষ।
দরজায় তালা দেওয়া ছিল, সবিতা তার ঘর থেকে চাবিটা এনে তালা খুলে ঘরটা খুলে দিল। সবিতার এবারে এখানে আসা অবধি ঐ ঘরটায় সর্বদা তালা দেওয়াই থাকে, কেবল সন্ধ্যার কিছু আগে একবার নিজে দাঁড়িয়ে থেকে কানাইয়ের মাকে দিয়ে ঘরটা ঝাড়পোঁছ করে বাবার ফটোর নিচে একটা ধূপদানিতে ধূপ রেখে আসত।
মৃত্যুঞ্জয়ের ঘরের মধ্যে যে জিনিসটি যেমন ভাবে সজ্জিত ছিল, এখনো অবিকল ঠিক তেমনটিই আছে। কোন কিছুই নাড়াচাড়া করা হয়নি বা ছোঁয়া হয়নি।
প্রথমে সবিতা কক্ষমধ্যে গিয়ে প্রবেশ করল, তার পশ্চাতে কিরীটী ও সত্যজিৎ।
কক্ষের মধ্যে প্রবেশ করে বারেকের জন্য কিরীটী তার চিরাচরিত তীক্ষ্ণ, অনুসন্ধানী দৃষ্টি দিয়ে চতুপার্শ্বস্থিত ঘরের যাবতীয় কিছু দেখে নিল নিঃশব্দে।
ঘরে ঢুকতেই সামনে দেওয়ালে যে এনলার্জড ছবিটি টাঙানো আছে— মৃত্যুঞ্জয় চৌধুরী ও তাঁর শিশু বালিকা কন্যা সবিতা—অনুমানেই বুঝে নেয় কিরীটী।
ঠিক মুখোমুখি না হলেও ঘরের অন্য দিককার দেওয়ালে একটা সেকালের ভারী মেহগনী কাঠের পালিশ-করা দেরাজ। দেরাজ পুরাতন হলেও পালিশ যেন এখনো চক চক করছে। দেরাজের ঠিক উপরে একখানা এনলার্জ করা ছবি দেওয়ালের গায়ে টাঙানো। ছবিটা বাঁধানো সোনালী রংয়ের সূক্ষ্ম কারকার্যমণ্ডিত মোটা চওড়া ফ্রেমে। ছবির মধ্যে দেখা যাচ্ছে বছর ২৪/২৫-এর এক নারীকে। চিনতে কষ্ট হয় না কিরীটীর এবারেও অনমানে, ঐ হেমপ্রভার প্রতিকৃতি—সবিতার জননী। ঠিক অবিকল যেন সবিতাই ছবির মধ্যে। মায়ের চেহারার, এমন কি চোখ-মুখ-কপালের হবহু আদলটি পর্যন্ত পেয়েছে। সবিতা তার জননীর।
ঘরের দক্ষিণ কোণে একটা ভারী কাঠের চৌকির উপরে বসানো একটা লোহার সিন্দুক।
সবিতা ঘরের মধ্যে প্রবেশ করেই চারটে জানালার কবাটই খুলে দিয়েছিল। ঘরটি এমন ভাবে তৈরী যে, প্রচুর আলো-হাওয়ার অবাধ গতিবিধি আছে।
বিলের দিকে দুটো জানালা ঘেষে একেবারে একটি উঁচু পালঙ্কের উপরে নিভাঁজ একটি শয্যা সবুজ বর্ণের বেডকভার দিয়ে ঢাকা।
একপাশে আলনায় খানকয়েক ধুতি জামা গোছানো। এবং আলনার নিচে দুই জোড়া জুতো।
ঘরের অন্যদিকে একটা ছোট সেক্রটারিয়েট টেবিল। টেবিলের উপরে কিছু কাগজপত্র ও খানকয়েক পুস্তক।
সামনেই একটা চেয়ার ছাড়াও একটা দেওয়াল-আলমারি, একটা দামী আরামকেদারা ও একটা জলচৌকি আছে ঘরে।
ঘরের দুটো দরজা—একটা প্রবেশের ও নির্গমনের, অন্য দরজাটা সামনে দিকে ছাদে যাতায়াতের জন্য।
ঐ দেওয়াল-আলমারি, সিন্দুক ও ড্রয়ারের চাবি আপনাব কাছেই তো সবিতা দেবী? কিরীটী প্রশ্ন করে।
হ্যাঁ। সবিতা একটা চাবির রিং কিরীটীর হাতে তুলে দিল, এই চাবির রিংয়েই সব চাবি পাবেন।
আচ্ছা মিস চৌধুরী, আপনার পিতা রাত্রে যখন নিদ্রা যেতেন, জানালাদরজা শুনেছি খোলাই থাকত! ছাদের ঐ দরজাটা, ওটাও কি ভোলাই থাকত, জানেন? কিরীটী সহসা প্রশ্ন করে।
হ্যাঁ। যতদূর জানি, ঐ দরজাটাও রাত্রে তিনি খুলেই শুতেন। সবিতা জবাব দেয়।
সাধারণতঃ রাত কটা পর্যন্ত জেগে তিনি পড়াশুনা ও জমিদারী সংক্রান্ত কাজকর্ম করতেন?
শুতে প্রায়ই তাঁর বারোটা সাড়ে-বারোটা হয়ে যেত। সকালের দিকে তাই বোধ হয় তিনি একটু দেরিতেই উঠতেন।
কিরীটী প্রথমেই কথা বলতে বলতে সেক্রেটারিয়েট টেবিলের সামনে এসে দাঁড়াল, সাধারণতঃ এই টেবিলে বসেই তো তিনি কাজকর্ম করতেন?
হ্যাঁ।
কিরীটী লক্ষ্য করে দেখে, টেবিলটার উপরে সূক্ষ্ম একটা ধুলোর পর্দা পড়ে আছে।
টেবিলটা ইদানীং কতদিন ঝাড়-পোঁছ করা হয়নি?
কানাইয়ের মাকে ও টেবিলটা ছুতে বারণ করে দিয়েছিলাম। এখানে আসবার পর আমি একদিন মাত্র টেবিলটা পরিষ্কার করেছিলাম।
কিরীটী নিঃশব্দে তাকিয়ে টেবিলটার উপরে যাবতীয় কিছু খুটিয়ে দেখছিল, সহসা তার নজরে পড়ল একটা লম্বা চুল টেবিলের কাঠের জোড়ের মুখে আটকে আছে।
চুলটা কৌতূহলভরে টেনে বের করল কিরীটী। লম্বা কোঁকড়ানো চুল। কোন নারীর কেশ একগাছি।
কিরীটী লম্বা কোঁকড়ানো কেশগাছি দুই হাতের আঙুলে ধরে টেনে টেনে দেখতে লাগল এবং মধ্যে মধ্যে সবিতার দিকে তাকাতে লাগল। কৌতুহলী সবিতা ও সত্যজিৎ একই সঙ্গে প্রশ্ন করে, কি কিরীটীবাবু?
একগাছি কেশ! বলতে বলতে পকেট হতে একটা কাগজ বের করে কেশগাছি সেই কাগজের মধ্যে রেখে সযতনে কাগজটা ভাঁজ করে পকেটের মধ্যে রাখতে রাখতে বললে, কই, এর মধ্যে বলুন তো কোন চাবিটা ড্রয়ারগুলোর?
চাবির রিংটা সবিতার হাতে দিতে দিতে সবিতা একটা লম্বা মোটা চাবি ড্রয়ারের গায়ে ঢুকিয়ে ড্রয়ারটা খুলে দিল।
এক এক করে সবিতার সাহায্যে কিরীটী দুই দিককার ছটা ড্রয়ারই খুলে তার ভিতরকার কাগজপত্র সব পরীক্ষা করতে লাগল। এবং কাগজপত্রগুলো দেখতে দেখতে একসময় একটা মোটা বোর্ডে বাঁধাই সুদৃশ্য অ্যালবাম টেনে বের করল। অ্যালবামটার মধ্যে অনেক ফটো আঁটা রয়েছে।
কিরীটী বিশেষ কৌতূহলের সঙ্গেই অ্যালবামের পাতাগুলো উল্টে উল্টে দেখে যেতে লাগল।
ফটোগুলো তোলা বোধ হয় অনেকদিন আগেকার। একটু লালচে রং ধরেছে প্রায় প্রত্যেক ফটোতেই এবং ফটোগুলোর মধ্যে বেশীর ভাগই নানা জায়গার ফটো। ঘরবাড়ি, পুরাতন মন্দির, ফোর্ট, জলাশয়, রাস্তাঘাট, বাগানবাগিচা, কবর ইত্যাদির।
