‘অনেক রাতে…বলতে গেলে প্রায় ভোরের দিকে…আমি আর প্রজেনদা আবার বাবার ঘরে আসি…ঘরটা সাজিয়ে-গুছিয়ে লকড রুম পাজল তৈরি করার জন্যে। ডক্টর গুপ্ত…’ মুখ তুলে এসিজির দিকে তাকালেন তনয় : ‘আপনার বুদ্ধি সত্যিই তারিফ করার মতো। শুধু বুদ্ধি, লজিক আর গেসওয়ার্ক দিয়ে আপনি সত্যি ব্যাপারটার কত কাছাকাছি পৌঁছে গেছেন!
‘ডক্টর গুপ্ত, আমরা এই তিনটে মানুষ—আমি, টুনি আর প্রজেনদা—প্রতিদিন কীভাবে যে টরচারড হচ্ছিলাম সেটা আপনাকে বলে বোঝাতে পারব না। নিজেদের আর মানুষ বলে মনে হত না—মনে হত, আমরা জন্তুজানোয়ার বা সেরকম কিছু। আমরা তিনজন ধীরে-ধীরে একজোট হলাম। বিশ্বাস করবেন না, স্রেফ অপমান আর চোখের জল আমাদের একজোট করল। আমরা মুক্তির পথ খুঁজতে শুরু করেছিলাম। আমি জানি, মুক্তির পথ খোঁজা মানে অন্যায়ের পথে পা বাড়ানো। কিন্তু আপনি একবার ভাবুন তো, দিনের পর দিন কত অন্যায় আমরা সহ্য করছিলাম!’
তনয় থামলেন। টুনির হাতটা ধরে সামান্য চাপ দিলেন। প্রজেন বসু রায়ের দিকে তাকিয়ে বিষণ্ণ হাসলেন। তারপর :
‘ডক্টর গুপ্ত, আমাদের আর কিছু বলার নেই। আমাদের তিনজনকে নিয়ে আপনারা যা ভালো বোঝেন করুন…যেরকম শাস্তি দিতে চান দিন।’
তনয় চুপ করতেই ঘরটা কেমন থমথমে হয়ে গেল। বৃষ্টির রিমঝিম শব্দ ছাপিয়ে শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দ শোনা যেতে লাগল।
তনয় আর প্রজেনের কথা শুনে এসিজি ভীষণ ডিপ্রেসড হয়ে গিয়েছিলেন। মনে হচ্ছিল, রঘুপতির কথায় এই খুনের তদন্তে না নামলেই বোধহয় ভালো হত।
বেশ কিছুক্ষণ সবাই চুপ।
টুনি মজুমদার তনয়ের কাঁধে মাথা এলিয়ে আছেন। মুখে দুশ্চিন্তার প্রলেপ।
তনয় শূন্য চোখে ঘরের দেওয়ালের দিকে তাকিয়ে।
প্রজেন কেমন একটা ঘোরের মধ্যে জানলার দিকে তাকিয়ে আছেন। এই মুহূর্তে অন্ধকার আর বৃষ্টিই বোধহয় ওঁর সবচেয়ে প্রিয়।
অনেকক্ষণ পর রঘুপতিই প্রথম কথা বলল। চাপা গলায় এসিজিকে জিগ্যেস করল, ‘স্যার, নাউ হোয়াট টু ডু? প্লিজ অ্যাডভাইজ।’
এসিজি চেয়ারে সোজা হয়ে বসলেন। রঘুপতির চোখে তাকালেন : ‘রঘুপতি, আমার মনে হয়, এই কেসটা আমাদের একটু অন্যভাবে ডিল করা উচিত…।’
‘কীভাবে, স্যার?’
‘দ্যাখো, নিলয় মজুমদার খুব বাজে টাইপের লোক ছিলেন। কনস্ট্রাকশনের কাজ করতে গিয়ে উনি অনেক ক্রাইম করেছেন—এমনকী কয়েকজনকে ইনডিরেক্টলি মার্ডারও করেছেন। যেমন, ব্রজেন বসু রায় ওঁর একজন ভিকটিম। তা ছাড়া উনি চুরাশি বছর লাইফ এনজয় করেছেন।…আর…আর সবচেয়ে বড় কথা হল, তনয় মজুমদার, টুনি মজুমদার আর প্রজেন বসু রায়ের ডেইলি লাইফ উনি হেল করে তুলেছিলেন। সো…।’
‘সো হোয়াট, গুপ্তাসাব?’ রঘুপতি উদগ্রীব হয়ে জানতে চাইল।
নিজামুল হকও হান্ড্রেড পারসেন্ট আগ্রহ নিয়ে এসিজির দিকে তাকিয়ে।
এসিজি ধীরে-ধীরে বললেন, ‘রঘুপতি, তোমরা ধরে নাও এই কেসটার মধ্যে আমি ঢুকিনি। মানে, আমি আজ—শুধু আজ কেন, কোনওদিনই—মজুমদারদের ”নিলয়নিবাস”-এ আসিনি। তা হলে পুলিশের রেকর্ড যেমন ছিল তেমনই থাকবে। মানে, কয়েকমাসের মধ্যেই কেসটা আনসলভড মার্ডার কেসের তকমা পেয়ে যাবে। তারপর এই কেসের ফাইলটা কোল্ড স্টোরেজে ঢুকে যাবে। ব্যস—ফিনিশ!’
কথা শেষ করার সময় এসিজির ঠোঁটের কোণে একচিলতে হাসি ফুটে উঠল।
রঘুপতি যাবদ আর নিজামুল হক এসিজির কথায় সায় দিয়ে মাথা নাড়লেন।
অশোকচন্দ্র আলতো গলায় বললেন, ‘তা ছাড়া এই কেসে প্রমাণ কই, রঘুপতি, প্রমাণ? মার্ডারাররা কনফেস করেছে ঠিকই, বাট সলিড প্রূফ কোথায়, সলিড প্রূফ? খুনটা হওয়ার এতদিন পরে তুমি নতুন কোনও প্রূফ আর পাবে না। সুতরাং, বাইরের কোনও অচেনা অজানা লোক এসে দোতলার লোহার জাল কেটে বারান্দায় ঢুকেছে—তারপর নিলয় মজুমদারের ঘরে ঢুকে ওঁকে ব্রুটালি মার্ডার করে রাতের অন্ধকারে গা ঢাকা দিয়েছে—এরকম একটা রিপোর্ট লিখে তুমি এ-কেসের ফাইলটা ক্লোজ করার বন্দোবস্ত করো। দ্যাটস ইট, রঘুপতি। কেস ক্লোজড।’
রঘুপতি আর নিজামুল হক কোনও কথা বললেন না, শুধু ধীরে-ধীরে মাথা নাড়লেন।
নিলয়ের বিছানায় বসা তিনটে মানুষ তখন খুব কাছাকাছি। প্রজেন এবং টুনির মাথা দুপাশ থেকে ঝুঁকে পড়েছে ওঁদের মাঝখানে বসা তনয়ের দিকে। মনে হচ্ছে, ব্যাপারটা যেন খেলা শুরুর আগে ক্রিকেট প্লেয়ারদের হাডল।
টুনি মজুমদারের মুখের অনেকটাই দেখতে পাচ্ছিলেন এসিজি। ওঁর মুখে ছেয়ে থাকা দুশ্চিন্তার প্রলেপ তখন অনেকটা সরে গেছে। ওঁকে দেখে এখন আর কিছুতেই ‘ব্লান্ট ইনস্ট্রুমেন্ট’ বলে মনে হচ্ছে না। একসময় ওঁকে সেরকম ভেবেছিলেন বলে এসিজি মনে-মনে একটু লজ্জা পেলেন।
বৃষ্টিটা ধরে এল রাত সাড়ে আটটার পর।
এসিজি, রঘুপতি, নিজামুল হক আর ভগবান মিস্ত্রি মজুমদারদের বাড়ি থেকে বেরিয়ে খোলা জমিতে পা দিলেন। ঠান্ডা বাতাস ওঁদের ছুঁয়ে গেল। বৃষ্টির মিহি গুঁড়ো বাতাসে উড়ছে।
বাড়ির বাইরে খোলা জায়গায় একটা মলিন আলো জ্বলছে। সিমেন্ট বাঁধানো পথের দুপাশে এখানে-সেখানে জল জমে ছোট-ছোট গোস্পদ তৈরি হয়েছে। সেই জলে আলোর টুকরো চিকচিক করছে।
এসিজিদের সঙ্গে তনয় আর সাবিত্রী রয়েছে। সামনে আর আট-দশ পা এগোলেই লোহার মেন গেট।
একটা ব্যাপার বহুক্ষণ ধরেই অশোকচন্দ্রের মনের ভেতরে খচখচ করছিল। অস্বস্তির কাঁটা বিঁধছিল বারবার।
