সে-রাতে সাবিত্রী বারান্দায় শুয়ে ছিল। হয়তো ঘুমিয়েই পড়েছিল। কিন্তু একেবারে পাশের ঘরে প্রজেন একটা গাছের ডাল দিয়ে নিলয় মজুমদারের মাথায় প্রচণ্ড জোরে হিট করলেন অথচ সাবিত্রী কোনও শব্দ-টব্দ পেল না! যদিও ডালটার ওপরে কাপড় জড়ানো ছিল, তবুও একটা জোরালো ভোঁতা শব্দ তো হবে!
এসিজি ভাবলেন, ‘এখন তো সব চুকেবুকে গেছে। এখন সাবিকে সরাসরি ব্যাপারটা একবার জিগ্যেস করলে হয়…।’
এসিজি তনয় মজুমদারকে বললেন, ‘মিস্টার মজুমদার, আর এগোতে হবে না—আপনি এবার আসুন।’
এ-কথায় তনয় ইতস্তত করছেন দেখে এসিজি আরও যোগ করলেন, ‘সাবিত্রীকে আমি আলাদা করে দু-একটা কথা বলতে চাই…।’
একটু থতোমতো খেয়ে তনয় বললেন, ‘ও, আচ্ছা…আচ্ছা। ঠিক আছে। আমি তা হলে আসি। আপনাদের…আপনাদের অনেক ধন্যবাদ…।’ তারপর বাড়ির দিকে ব্যাক করলেন।
রঘুপতি আর নিজামুল অবাক হয়ে ডক্টর গুপ্তর দিকে তাকিয়েছিলেন। সাবিত্রীর সঙ্গে এখন আবার কী কথা!
সাবিও অবাক হয়ে বৃদ্ধ মানুষটির দিকে তাকিয়ে ছিল। এই দাদু এখন কী বলতে চায়?
এদিক-ওদিক তাকালেন এসিজি।
ভেজা মাটি, ভেজা গাছের পাতা। সদর দরজার বাইরে ভেজা রাস্তা। রাস্তায় ছুটে যাচ্ছে ভেজা গাড়ি।
চারপাশে কেমন এক মায়াবী বিষণ্ণতা।
কিছুক্ষণ চুপ করে থাকার পর তিনি সাবিকে মনে-কাঁটা-বেঁধানো প্রশ্নটা করলেন।
‘প্রজেনবাবু যখন ওই ডালের বাড়ি মেরে তোমার দাদুবাবাকে খুন করে তখন তুমি কোনও শব্দ শুনতে পাওনি? তুমি তো ঘরের পাশেই বারান্দায় শুয়ে ছিলে!’
সাবি কয়েকসেকেন্ড চুপ করে রইল। তারপর বলল, ‘পেয়েছি। কেমন একটা ”ধপ” শব্দ। আমার তখন ঘুম চটে গেছিল।’ একটু থেমে আবার বলল, ‘চোর-টোর এসেছে ভেবে আমি চট করে উঠে পড়েছিলাম। অন্ধকারে দাদুবাবার জানলার কাছে গিয়ে দেখি নতুন দাদাবাবু ঘরের ভেতরে দাঁড়িয়ে। আর দাদুবাবা বিছানায় মুখ থুবড়ে পড়ে আছে। বিছানায় অনেক রক্ত… অনেক রক্ত…।’
‘তুমি সব দেখেছ অথচ পুলিশকে কিছু বলোনি!’
‘না, স্যার। ফ্যামিলির ঝামেলায় আমার জড়িয়ে কী লাভ! আমি ছোট মানুষ—আর ওনারা আমার অন্নদাতা…। তাই মনে হয়েছিল পুলিশ যা করার করবে।’
সাবি চুপ করে গেল। আর সবাই চুপচাপ।
একসময় এসিজি বললেন, ‘সাবি, এবার তুমি যাও। আমরাও আসি—।’
সাবিত্রী চট করে কপালে হাত ঠেকিয়ে একটা নমস্কার গোছের ছুড়ে দিয়ে চলে গেল বাড়ির দিকে।
‘নিলয় নিবাস’-এর মেন গেট দিয়ে বাইরে বেরিয়ে পুরোনো একটা কথা এসিজির আবার মনে পড়ল : ‘খুন অতি জঘন্য কাজ, কিন্তু খুনি ধরার কাজটা আরও জঘন্য।’
