তনয় বুকের ভেতরে একটা চাপ টের পাচ্ছিলেন। বারবার ভাবছিলেন, ‘এভাবে একজন মানুষকে সময় হওয়ার আগেই সরিয়ে দেওয়াটা কি পাপ?’
একইসঙ্গে ওঁর ছোটবেলার কথা মনে পড়ছিল। বাবাকে ঘিরে ভালো-ভালো কয়েকটা স্মৃতি মনের ভেতরে ভিড় করছিল। কিন্তু তার পরের মুহূর্তেই ভয়ংকর অপমান আর হেনস্থার স্মৃতিগুলো হুড়মুড়িয়ে মনের ভেতরে ঝাঁপিয়ে পড়ছিল।
তনয় বারবার ঘরের দেওয়ালে টাঙানো ঘড়িটার দিকে তাকাচ্ছিলেন।
‘এতক্ষণ লাগছে কেন? তা হলে কি প্রজেনদার সঙ্গে বাবার হাতাহাতি ধস্তাধস্তি হচ্ছে?’
ঠিক সেইসময় প্রজেন বসু রায় ঘরের দরজায় এসে দাঁড়ালেন।
দৃশ্যটা টুনি মজুমদারের মনে চিরকাল আঁকা হয়ে থাকবে।
দরজার ফ্রেমে বাঁধানো একজন মানুষ। পরনে পাঞ্জাবি আর পাজামা। পাঞ্জাবির রং হালকা বাদামি, আর পাজামার রং সাদা। কিন্তু এখন সেই বাদামি আর সাদা রঙের ওপরে লাল রঙের অজস্র কলঙ্কের ছিটে।
রক্তের দাগ।
পাঞ্জাবির ওপরে যেখানে-সেখানে ছড়িয়ে আছে রক্তের ছোপ। আর পাজামার ওপরেও ভালোরকম রক্তের ছিটে।
প্রজেনের ডানহাতে ধরা একটা গাছের ডালের টুকরো। তার ওপরে কাপড় জড়ানো। কী রঙের কাপড় সেটা আর বোঝা যাচ্ছে না, কারণ, কাপড়টা লালে লাল। আর মানুষটার গা থেকে রক্তের আঁশটে গন্ধ বেরোচ্ছে।
প্রজেনের সারা শরীর থরথর করে কাঁপছিল। শত চেষ্টাতেও সে-কাঁপুনি থামছিল না।
তনয় আর টুনি চোখে প্রশ্ন নিয়ে প্রজেনের দিকে তাকিয়েছিলেন। সেই নীরব প্রশ্নের উত্তরে প্রজেন ওপর-নীচে মাথা নেড়েছিলেন আর ভাঙা এবং কাঁপা গলায় বলেছিলেন, ‘ডান। আমরা এখন ফ্রি…।’
টুনি একটা বড় পলিথিনের প্যাকেট নিয়ে প্রজেনের কাছে গেলেন। সেটার মুখটা চওড়া করে খুলে প্রজেনকে বললেন, ‘হাতের লাঠিটা এর মধ্যে ফেলে দিন—।’
প্রজেন চুপচাপ কথা শুনলেন। ওঁর শরীর তখনও কাঁপছিল।
তনয় বেডকভার থেকে উঠে পড়েছিলেন। বিছানার নীচ থেকে আর-একটা পলিথিনের প্যাকেট বের করে প্রজেনের কাছে গেলেন।
‘প্রজেনদা, তুমি আমাদের ওই অ্যাটাচড বাথরুমটায় চলে যাও। এই স্টেইনড জামাকাপড়গুলো খুলে এই প্যাকেটটার মধ্যে ঢুকিয়ে দিয়ো। পরে টুনি ওটার ব্যবস্থা করবে।’
প্রজেন প্যাকেটটা হাতে নিয়ে কাঁপা পা ফেলে বাথরুমের দিকে এগোলেন।
টুনি চাপা গলায় বললেন, ‘বাথরুমে সাবান, শ্যাম্পু সব আছে। ড্রেস আছে, ডিও আছে। ফ্রেশ হতে আপনার বড়জোর হাফ অ্যান আওয়ার লাগবে। প্লিজ, স্টেবল হোন, প্রজেনদা। আমরা যা করেছি সবার ভালোর জন্যেই করেছি…।’
প্রজেন বাথরুমে ঢুকে গেলেন।
টুনি গাছের ডালসমেত পলিথিনের প্যাকেটটা নিয়ে চটপটে পায়ে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন। ওঁর বুকের ভেতরে ধুপ-ধুপ আওয়াজ হচ্ছিল।
একটু পরে টুনি ফিরে এলেন। দেখলেন, তনয় এখনও বিভ্রান্তভাবে একই জায়গায় দাঁড়িয়ে।
প্রজেন যে বাথরুমে আছে সেটা দেখে নিয়ে স্বামীকে জাপটে ধরলেন টুনি। কান্না মেশানো গলায় বারবার বলতে লাগলেন, ‘কোনও ভয় নেই, আমি তো আছি! কোনও ভয় নেই, আমি তো আছি…!’
এসব কথা ভাবতে-ভাবতে টুনির আবার কান্না পেয়ে গেল।
টুনি বিছানা থেকে উঠে চলে এলেন স্বামীর কাছটিতে। ওঁকে আর প্রজেনকে হাত ধরে নিয়ে গিয়ে বসালেন বিছানায়। নিজেও বসলেন। নরম মমতায় তনয়ের হাতে-পিঠে হাত বুলিয়ে দিতে লাগলেন।
তনয় মাথা নীচু করে ছিলেন। এপাশ-ওপাশ মাথা নাড়ছিলেন বারবার। হয়তো আক্ষেপ কিংবা হতাশায়—অথবা পিতৃহত্যার অনুশোচনায়।
ডক্টর অশোকচন্দ্র গুপ্ত চেয়ারে হেলান দিয়ে চোখ বুজে বসেছিলেন। তনয়ের কথা শুনছিলেন, বৃষ্টির শব্দ শুনছিলেন আর ভাবছিলেন, এই খুনটার তদন্তে হাত না দিলেই বোধহয় ভালো হত।
এসিজি চোখ খুলে রঘুপতি আর নিজামুল সাহেবকে লক্ষ করলেন।
ব্যাপারস্যাপার দেখে-শুনে রঘুপতি যাদবের মতো আদ্যন্ত পুলিশি মানুষও কেমন যেন থম মেরে গেছে। আর নিজামুল হক মন দিয়ে সব দেখছিলেন, শুনছিলেন এবং নিজের অভিজ্ঞতার ভাঁড়ার সমৃদ্ধ করছিলেন।
তনয় যে আবার কখন কথা বলতে শুরু করেছিলেন কেউ খেয়াল করেননি।
নিজামুলসাহেবের কোনও একটা কথার পিঠে তনয় বলছিলেন, ‘বললাম তো, কাপড়টা সে-রাতেই আমরা পুড়িয়ে ফেলেছিলাম, তবে গাছের ডালের টুকরোটা বাগানে রেখে এসেছিল প্রজেনদা। ওই যে, যেখানে গাছের ডালের টুকরো জড়ো করে রাখা আছে…।’
রঘুপতি একবার এসিজির দিকে তাকাল। কারণ, ওর স্যার একবার এরকমই কিছু একটা ইশারা করেছিলেন।
‘কয়েকদিন পর গাছের ডালটাকে প্রজেনদা ওর কনস্ট্রাকশন সাইটে নিয়ে গিয়ে কেটেকুটে পুড়িয়ে ফেলার ব্যবস্থা করে। না, প্রজেনদা শুধু ওই একটা ডাল নিয়ে যায়নি—ওটাকে আড়াল করতে আরও চার-পাঁচটা ডালের টুকরো নিয়ে গিয়েছিল।
‘বাইশ তারিখে রাতে প্রজেনদা বাবার ঘরে আরও একবার গিয়েছিল মোবাইল ফোনটাকে প্লে-ব্যাক মোডে চালু করতে। যাতে সাবি অন্তত ভাবে, বাবা তখনও বেঁচে আছেন। ঘর থেকে প্রজেনদা চুপিচুপি বেরিয়ে আসার পর একটু আওয়াজ-টাওয়াজ করে সাবির ঘুম চটিয়ে দেয়। সেসময় প্রজেনদা বাবার ঘরের দরজায় এমনভাবে দাঁড়িয়েছিল যেন মনে হয় ও বাবার ঘরে ঢুকবে বলে দাঁড়িয়ে আছে। সাবিকে শুনিয়ে প্রজেনদা বলে যে, স্যারকে এখন ডিসটার্ব করে লাভ নেই…এটসেটরা এটসেটরা। তারপর সেখান থেকে চলে যায়। মহাভারতের পাশাখেলা তখনও চলছিল।
