তনয় মাথা নীচু করে আঙুল খুঁটছিলেন। একটু থেমে-থেমে কথা বলছিলেন। কথা বলতে-বলতে গলা ধরে এলেও বাবার প্রতি অপছন্দ আর ঘৃণার ভাবটা ভালোই বোঝা যাচ্ছিল।
‘বাবা নিজে বাঁচতে ভালোবাসতেন। এই চুরাশি বছর বয়েসেও ওঁর বাঁচার ইচ্ছেটা ছোটবেলার মতোই ছিল। আমাদের তিনজনের কাজ ছিল দিন-রাত ওঁর সেবা করা; ওঁর জঘন্য ধমক, বকুনি আর অপমান হজম করে ওঁকে সবসময় তোয়াজ করে চলা; মুখ থেকে কোনও কথা খসানোমাত্রই সেটা সঙ্গে-সঙ্গে এক্সিকিউট করা—কারণ, না করতে পারলেই উনি মুখ খারাপ করতেন—যা-তা বলে অপমান করতেন।
‘দিনের পর দিন আর কত আমরা সহ্য করতাম বলুন তো! একদিন রাতে টুনির সঙ্গে আমার কথা হচ্ছিল। তখন আমি বিরক্ত হয়ে টুনিকে বলি : ”চুরাশি বছর বয়েস, তবু মরার কোনও লক্ষণ নেই। আমাদের জ্বালানোর জন্যে অসভ্য বুড়ো জানোয়ারটা বেঁচে আছে! কবে যে মরবে কে জানে!” তখন টুনি জবাব দেয় : ‘হ্যাঁ, ওই আশাতেই বসে থাকো!” তখন আমি বলি, ”তা নয় তো কী করব!” তার উত্তরে টুনি মারাত্মক একটা কথা বলেছিল, ”নিজেরা একটু ইনিশিয়েটিভ নাও—যাতে চুরাশিটা পঁচাশিতে না পৌঁছোয়।”
‘তখন, ডক্টর গুপ্ত, লাস্ট মান্থের বাইশ তারিখে আমরা সেই ইনিশিয়েটিভ নিয়েছি। চুরাশিটা আর পঁচাশিতে পৌঁছোতে পারেনি। রোজ রাতে তাস খেলার সময় আমরা তিনজনে মিলে বাবাকে খুনের প্ল্যান করতাম। হ্যাঁ, টুনিও আছে এর মধ্যে—’ ঘাড় ঘুরিয়ে টুনি মজুমদারের দিকে তাকালেন তনয়। বিষণ্ণ হাসলেন। টুনিও একচিলতে মলিন হাসি ফিরিয়ে দিল। এই হাসি বিনিময়ে দুজনের মধ্যে বন্ডিংটা ফুটে বেরোল।
তনয় মাথার চুলে বারকয়েক আঙুল চালালেন। চঞ্চলভাবে মাথা ঝাঁকালেন দুবার। প্রজেনের দিকে দেখলেন, তারপর স্ত্রীর দিকে। ওঁকে দেখে খুব ক্লান্ত মনে হচ্ছিল।
নিজামুল হকের দিকে তাকিয়ে তনয় বললেন, ‘আপনি ঠিকই বলেছেন, হকসাহেব। এই মার্ডারটা ঠিকঠাকভাবে করার জন্যে খুনিকে অনেক কাজ করতে হয়েছে। সত্যিই সে-কাজের লিস্ট অনেক লম্বা। তো এত কাজ আমরা কেউ একা করিনি—তিনজনে মিলে করেছি। যেমন, দোতলার বারান্দার লোহার জাল কাটার কাজটা করেছে টুনি। জাল কাটার কাতুরি আমি শ্যামবাজারের একটা হার্ডওয়্যারের দোকান থেকে কিনে এনেছি। কাজ হয়ে যাওয়ার পর সেটা বাগানের পেছনদিকের পাঁচিল ঘেঁষে একটা জায়গায় পুঁতে দিয়েছি। চলুন, জায়গাটা আপনাদের দেখিয়ে দেব—।’
উত্তেজিতভাবে কথা বলতে-বলতে তনয় একটু হাঁপাচ্ছিলেন। সেইজন্যই বোধহয় একটু থামলেন। তারপর বেশ নীচু গলায়, অনেকটা মন্ত্রপাঠের ঢঙে, বলতে শুরু করলেন আবার।
‘খুনের দিন রাতে আমি আর প্রজেনদা বেশ কয়েকবার বাবার ঘরে গেছিলাম। সাবিত্রী একসময় শুয়ে পড়েছিল। আমরা জানি, ও একবার ঘুমিয়ে পড়লেই কাদা। আমি বাবার ঘরে একবার গেছিলাম বাবার মহাভারত পড়াটা মোবাইল ফোনে রেকর্ড করার জন্যে। পুলিশের কাছে ব্যাপারটাকে ঘেঁটে দেওয়ার জন্যে প্রজেনদা আমাকে বলেছিল ওর মোবাইলে ব্যাপারটা রেকর্ড করতে। আমিও সেটাই করেছিলাম। পরে সেই অডিয়ো ফাইলটা প্রজেনদা আমার আর টুনির মোবাইলে হোয়াটসঅ্যাপ করে পাঠিয়ে দিয়েছিল। এনি ওয়ে…বাবার ঘর থেকে বেরিয়ে আসার সময় সাবি আমাকে দেখতে পায়।
‘এর আধঘণ্টা কি চল্লিশ মিনিট পর প্রজেনদা চুপিসাড়ে বাবার ঘরে যায়। প্রজেনদার হাতে মার্ডার ওয়েপনটা ছিল। ডক্টর গুপ্ত ঠিকই আইডিয়া করেছেন—অস্ত্রটা একটা শক্তপোক্ত গাছের ডাল…ব্লান্ট ইনস্ট্রুমেন্ট…অনেকটা বেসবল ব্যাটের মতো। তবে পলিথিন দিয়ে নয়—প্রজেনদা ওটা কাপড় দিয়ে জড়িয়ে নিয়েছিল, যাতে হিট করার সময় আওয়াজটা অতটা না হয়। পরে আমরা সেই রক্তে ভেজা কাপড়টা সে-রাতেই পুড়িয়ে ফেলেছিলাম। ইন ফ্যাক্ট, এই কাজটা টুনি করেছিল। কারণ, তখনও আমার আর প্রজেনদার মাথা ঠান্ডা হয়নি—আমরা দুজনে ভীষণ এক্সাইটেড আর আনস্টেবল ছিলাম।’ টুনির দিকে ফিরলেন তনয় : ‘টুনি, আ স্পেশাল থ্যাংকস ফর ইউ…।’
সেই রাতটার কথা টুনির খুব মনে পড়ছিল।
ওদের শোওয়ার ঘরে থমথমে মুখে বসেছিলেন টুনি আর তনয়। টুনি চুপচাপ বিছানায় বসে অপেক্ষা করছিলেন প্রজেনের ফেরার জন্য।
ঘরের তিনটে লাইটই জ্বেলে দিয়েছেন টুনি : দুটো টিউবলাইট, আর একটা আট ওয়াটের এল. ই. ডি. ল্যাম্প। কারণ, টুনির মনে হয়েছিল, ঘরের সবগুলো বাতি জ্বেলে দিলে মনের ভয় আর উত্তেজনা খানিকটা হয়তো কমবে।
মাঝে-মাঝে টুনির চোখ চলে যাচ্ছিল ঘরের একটা খোলা জানলার দিকে। জানলার বাইরেটা অন্ধকার। সেই অন্ধকারের দিকে তাকালেই ভয়টা যেন আবার মাথাচাড়া দিচ্ছিল। টুনি মনে-মনে ভাবছিল, ‘প্রজেনদাটা নীচে গিয়ে এতক্ষণ ধরে কী করছে? এত সময় লাগছে কেন? আচ্ছা, দোতলা থেকে ”ধপ” করে একটা শব্দ শোনা গেল না? তা হলে কি কাজটা হয়ে গেছে?’
ঘরের মেঝেতে রঙিন বেডকভার পাতা। তার ওপরে ছড়ানো রয়েছে তাস। তনয় বেডকভারের এককোণে বসে সেই তাস নিয়ে এলোমেলোভাবে শাফল করছিলেন, সাজাচ্ছিলেন, আর ছড়িয়ে দিচ্ছিলেন। সব মিলিয়ে বোঝা যাচ্ছিল, তনয়ও অপেক্ষা করছিলেন।
বড় রাস্তা দিয়ে মাঝে-মাঝে গাড়ি ছুটে যাচ্ছিল। শোনা যাচ্ছে ছুটে যাওয়ার শব্দ, হর্নের আওয়াজ।
