‘তারপর…তারপর…এখানে থাকতে-থাকতে বুঝলাম, আমি একা নই—এ বাড়ির প্রত্যেকেই নিলয় মজুমদারের কেনা সম্পত্তি। কাউকে এক কণাও সম্মান দিয়ে কথা বলতে পারতেন না উনি। নতুন-নতুন নোংরা কথা শোনার ভয়ে, নতুন-নতুন অপমানের ভয়ে, আমরা সবাই কাঁটা হয়ে থাকতাম। আমি ভাবতাম…আমি ভাবতাম…’ হঠাৎই থেমে গেলেন প্রজেন। কপালে হাত বোলালেন দুবার। রগের কাছটা টিপে ধরে মুখ নীচু করলেন। তারপর…।
‘আমি ভাবতাম, মানুষটার বয়েস আশি পেরিয়েছে। হয়তো যে-কোনও দিন ওপর থেকে ডাক আসবে…তখন আমরা সবাই হাঁফ ছেড়ে বাঁচব। কিন্তু সে-ডাক আর আসছিল কই!’
‘সেইজন্যে আপনি ওনাকে ডাক পাঠালেন?’ নিজামুল হক ব্যাঙ্গ করে বললেন।
প্রজেন নিজামুলসাহেবের দিকে মুখ তুলে তাকালেন। ওঁর চোখে জল। ওপর-নীচে মাথা নেড়ে ধরা গলায় বললেন, ‘হ্যাঁ, আমি ডাক পাঠালাম। একটা শয়তান পাপীকে সাজা দিতে চেয়ে আর-এক পাপ করে বসলাম। নিন, ইনস্পেকটরসাহেব, আমাকে অ্যারেস্ট করুন—সাজা দিন…।’ প্রজেন কথা বলতে-বলতে উঠে দাঁড়ালেন। দুটো হাত সামনে বাড়িয়ে নিজামুল হকের দিকে এক পা এগিয়ে গেলেন।
তনয় আর টুনি যে মুখ চাওয়াচাওয়ি করছেন সেটা অশোকচন্দ্র গুপ্ত লক্ষ করেছিলেন। ব্যাপারটা রঘুপতিরও চোখ এড়ায়নি। কিন্তু কেন এই মুখ চাওয়াচাওয়ি সেটা রঘুপতি আঁচ করতে পারল না।
নিজামুল প্রজেনকে বললেন, ‘প্রজেনবাবু, একটা কথা বলুন দেখি। সত্যি কথা বলবেন…।’
‘কী কথা?’ ধরা গলায় জানতে চাইলেন।
‘এই মার্ডারটা ঠিকঠাকভাবে করার জন্যে খুনিকে অনেক কাজ করতে হয়েছে। কাজগুলোর লিস্টি করলে সে-লিস্টি অনেক লম্বা হবে। একটু আগে গুপ্তসাহেবকে, ইনস্পেকটর যাদবকে সে-কথা আমি বলেছি। এত কাজ একজনের পক্ষে করা সম্ভব নয়। তো এত কাজ আপনি একা-একা করলেন কেমন করে?’
প্রজেন দেওয়ালে বসানো একটা পেরেকের দিকে তাকিয়ে হাসলেন। চোখের কোণে জল, ঠোঁটে হাসির রেখা। মনে হল হাসিটা যেন ওর দুঃখকে আরও বেশি করে চিনিয়ে দিল।
প্রজেনের ঠোঁট কাঁপল তিরতির করে। তারপর তিনি বেশ নীচু গলায় পেরেকটাকেই যেন বললেন, ‘ঠিক বলেছেন। মার্ডারটার পেছনে এত কাজ! এত কাজ আমি একা-একা করলাম কেমন করে!’ কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর ধীরে-ধীরে মুখ ফেরালেন নিজামুলের দিকে। বললেন, ‘কী করে করলাম জানি না…বাট করেছি…একা করেছি। একা করেছি…একা করেছি…একা!’ বলতে-বলতে প্রজেন নিজের বুকে কিল মারতে শুরু করলেন। ওঁর মুখে লালচে ভাব, দৃষ্টিতে শুধু শূন্যতা।
সাবিত্রী ভয় পেয়ে গেল, ডুকরে কেঁদে উঠল।
তনয় বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। ওঁর মুখ-চোখ কেমন পালটে গেছে। সকাল থেকে যে-মানুষটার মুখে এসিজি কেবল শান্ত ভাবটাই লক্ষ করেছেন, এখন সেই মানুষটার মুখে ভাব আর আবেগের ছড়াছড়ি। তবে তার সবটাই শুধু দুঃখ, কষ্ট আর যন্ত্রণা।
কষ্ট পাওয়া গলায় তনয় বললেন, ‘আমি আর নিতে পারছি না, প্রজেনদা! তুমি চেঁচিয়ে বললেই একটা মিথ্যে পট করে সত্যি হয়ে যাবে না।’ চটপট পা ফেলে রঘুপতির দিকে এগিয়ে এলেন তনয় : ‘ইনস্পেকটর যাদব, আপনি প্লিজ আমাকেও অ্যারেস্ট করুন। প্রজেনদার পাশাপাশি আমিও দোষী। আমিও একজন কালপ্রিট…।’
রঘুপতি যাদব খানিকটা বিভ্রান্তভাবে তাকালেন ওর পুরোনো স্যারের দিকে।
‘গুপ্তাসাব, ইয়ে সব কেয়া হো রহা হ্যায়? হাউ মেনি মার্ডারার্স ডু উই হ্যাভ রিয়েলি?’
এসিজি খানিকটা অবাক হয়ে প্রজেন এবং তনয়ের দিকে পালা করে দেখছিলেন। অঙ্কটা কোথায় যেন মিলছিল, আবার মিলছিল না। এসিজি কেমন কনফিউজড হয়ে যাচ্ছিলেন।
এতদিন ধরে অশোকচন্দ্র গুপ্ত র’ ডেটা স্টাডি করেছেন। তার সঙ্গে বুনে দিয়েছেন গেসওয়ার্ক আর লজিক। আজ এখানে এসে সবকিছু দেখে-শুনে তিনি মার্ডার অ্যাক্টটাকে রিকনস্ট্রাকট করার চেষ্টা করেছেন। ‘লকড রুম পাজল’-টাকে সলভ করার চেষ্টা করেছেন। মার্ডার মিস্ট্রিটার ওপরে পুরোটা না পারলেও অনেকটা আলো ফেলতে পেরেছেন। তারপর রঘুপতির সঙ্গে ‘ষড়যন্ত্র’ করে একটা ব্লাফ দিয়েছেন সবাইকে : যে একটা স্পেশাল কোড ব্যবহার করে মোবাইল হ্যান্ডসেটের ডিলিট করা ফাইল রিট্রিভ করা যায় এবং সার্ভিস প্রোভাইডারদের কাছ থেকে তিনি সেই স্পেশাল কোড জেনে ডিলিট করা ফাইল রেস্টোর করেছেন। সেই ব্লাফে কাজ হয়েছে। টেনশন আর মেন্টাল প্রেশারে পড়ে একজন মার্ডারার কনফেস করেছে। কিন্তু তারপর…তারপর হঠাৎ সেকেন্ড মার্ডারার! কী কনফিউজিং!
এখন রঘুপতির দিকে ঝুঁকে পড়ে সেই কনফিউশন নিয়েই চাপা গলায় কথা বলতে লাগলেন এসিজি। বৃদ্ধ হুনুরের বারবার মনে হচ্ছিল তিনি হেরে যাচ্ছেন।
তখন তনয় প্রজেনের একটা হাত চেপে ধরেছেন। দম দেওয়া কলের পুতুলের মতো বলে চলেছেন কীভাবে তিনি খুনের নানা ধাপে ‘প্রজেনদা’-কে সাহায্য করেছেন।
আসলে নিলয় মজুমদারের নোংরা শয়তানি ব্যবহার ওঁরা কেউ আর নিতে পারছিলেন না। তনয়ের মা মারা যাওয়ার পর নিলয় আরও নোংরা, আরও ভয়ংকর চেহারা নিয়েছিলেন। তখন তনয় বা প্রজেনের কাছে নিলয় সিম্পলি অসহ্য হয়ে উঠেছিলেন।
ওঁদের পাশাপাশি টুনি মজুমদারও নিলয়ের পেট ভিকটিম ছিলেন। খেয়াল অথবা মরজি হলেই নিলয় টুনিকে ডেকে পাঠাতেন। ওঁর মডেলিং করা নিয়ে নানারকম অশালীন মন্তব্য করতেন। এমনকী প্রজেনকে জড়িয়েও অনেক আজেবাজে কথা বলতেন।
