তনয় হাত নেড়ে প্রজেনকে শান্ত করতে চাইলেন : ‘আঃ, প্রজেনদা, ডোন্ট গেট এক্সাইটেড। কিপ ইয়োর কুল!’
কিন্তু প্রজেন থামলে তো!
এসিজি ঠান্ডা গলায় বললেন, ‘আমি কি সবাইকে এখন মহাভারত শোনাব? নাকি আপনার কিছু বলার আছে?’
‘প্রজেনদা! প্রজেনদা! বোসো—ঠান্ডা হও।’ তনয় তখনও প্রজেনকে ঠান্ডা করার চেষ্টা করছেন। ওঁর চোখে-মুখে আশঙ্কার ছায়া।
প্রজেন তনয়ের দিকে ঘুরেও তাকালেন না। ওঁর কপালে ঘামের বিন্দু। চোয়াল শক্ত। চোখে রাগ। রগের কাছে শিরা ফুলে উঠেছে। হাত থরথর করে কাঁপছে।
‘আমার ফোনে কোনও অডিয়ো ফাইল থাকতে পারে না। বিকজ আমি সব ডিলিট করে দিয়েছি। ওই শয়তান বুড়ো লোকটার মতো। ওকেও আমি দুনিয়া থেকে ডিলিট করে দিয়েছি।’
‘প্রজেনবাবু, আপনি প্লিজ বসুন—’ এসিজি নরম গলায় প্রজেন বসু রায়কে অনুরোধ করলেন। রঘুপতি আর নিজামুল হকের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘আপনারা ওঁকে একটু শান্ত করুন…।’
রঘুপতি আর নিজামুল প্রজেনের কাছে গেলেন। ওঁকে শান্ত করতে চেষ্টা করলেন।
একটু পরেই প্রজেন অনেকটা স্বাভাবিক হলেন। বিছানায় বসে পড়লেন আবার।
রঘুপতি আর নিজামুল নিজেদের চেয়ারে ফিরে এলেন।
এর মধ্যে তনয় একটা সিগারেট ধরিয়ে ফেলেছেন। তাতে ঘন-ঘন টান দিচ্ছেন।
টুনি মজুমদার যে বারবার ভুরু কুঁচকে অপছন্দের চোখে ওঁর দিকে তাকাচ্ছেন সেটা তনয় খেয়াল করেও করছেন না।
প্রজেন বসু রায় শূন্য চোখে এসিজির দিকে কয়েকসেকেন্ড তাকিয়ে রইলেন। তারপর অনেকটা যেন আপনমনেই বলতে শুরু করলেন।
‘নিলয় মজুমদার ভীষণ বাজে লোক ছিলেন। ওঁর মধ্যে অনেস্টি কিংবা প্রিন্সিপল বলে কোনও ব্যাপার ছিল না। আউট অ্যান্ড আউট আনএথিক্যাল পাবলিক ছিলেন। তা ছাড়া সবার সঙ্গে ফর নাথিং বাজে ব্যবহার করতেন। মানুষকে মানুষ বলে মনে করতেন না—চাকরবাকরের চেয়েও বাজেভাবে ট্রিট করতেন। আমার বাবাকে…আমার বাবাকে উনি বলতে গেলে মার্ডার করেছিলেন। কাশীপুরের ফ্লাইওভার তৈরির সময় নিলয় মজুমদার বি গ্রেড কি সি গ্রেডের বিল্ডিং মেটিরিয়াল পারচেজ করেছিলেন। কিন্তু এই মিসহ্যাপটা নিয়ে পুলিশের ইনভেস্টিগেশানের সময় উনি কোনওভাবে বোধহয় পুলিশকেও পারচেজ করেছিলেন। কারণ, ফাইনালি হি কেম আউট ক্লিন। মানে, স্ট্রেইট ছাড়া পেয়ে যান। পরে ওঁর কোম্পানিতে ঢুকে দেখেছি, কনস্ট্রাকশনের কাজে পার্টিকে চিট করাটাই ওঁর স্ট্যান্ডার্ড স্টাইল। দ্যাট ম্যান ডিজার্ভড টু ডাই…।’ প্রজেন হঠাৎ মুখে হাত চাপা দিয়ে মাথা নীচু করলেন।
তনয় হাতের সিগারেটটা মেঝেতে ফেলে পায়ের স্লিপার দিয়ে ঘষে নিভিয়ে দিলেন। তারপর প্রজেনের কাছে গিয়ে ‘প্রজেনদা! প্রজেনদা!’ বলে ওঁর পিঠে হাত বুলিয়ে মানুষটাকে ভরসা দিতে লাগলেন।
টুনি মজুমদার অস্বস্তি ভরা চোখে প্রজেনের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। মনে-মনে টুনিও বোধহয় চাইছিলেন প্রজেন শান্ত হোন।
একসময় প্রজেন বসু রায় শান্ত হলেন। মুখ তুলে আনমনা বিভ্রান্ত চোখে তাকালেন এসিজির দিকে।
ওঁর চোখ সামান্য ফোলা। মুখে হেরে যাওয়া মানুষের ছাপ।
‘ডক্টর গুপ্ত, কাশীপুরের ফ্লাইওভার তৈরির সময় মিস্টার মজুমদার যে-বাজে চিপ মেটিরিয়াল পারচেজ করেছিলেন তার ওরিজিন্যাল ডকুমেন্ট আমার কাছে আছে।’
‘কী ডকুমেন্ট?’ রঘুপতি জিগ্যেস করল।
‘দু-নম্বরি বিল্ডিং মেটিরিয়াল পারচেজের সব বিল—আই মিন, বিল আর চালানের কপি। বাবা মারা যাওয়ার সময় আমি ছোট ছিলাম। কিন্তু আমার মা বাবার সমস্ত কাগজপত্র ফাইল-টাইল যত্ন করে রেখে দিয়েছিল। আমি বড় হলে পর মা সেগুলো আমাকে দেয়। তার মধ্যে বাবার একটা ডায়েরিও ছিল। সেটা পড়ে আমি জানতে পারি ফ্লাইওভার কনস্ট্রাকশনের চিটিং-এর কথা। এ নিয়ে বাবার সঙ্গে নিলয় মজুমদারের অনেকবার তর্কাতর্কি কথাকাটাকাটি হয়েছিল। মা আমাকে এসব কথা বলেছে। তারপর…তারপর… বাবা ভাবছিলেন, ”নিলয় কনস্ট্রাকশনস” ছেড়ে দেবেন। কিন্তু সেটা আর হয়ে ওঠেনি…তার আগেই বাবা…বাবা চলে যান।
‘বাবা মারা যাওয়ার পর আমি বাবার সব ফাইলপত্র ঘেঁটে পারচেজ বিলের কপির ফাইলটা খুঁজে পাই। সেইসব বিল দেখলেই বোঝা যায়, মিস্টার মজুমদার সমস্ত দাগি সাপ্লায়ারদের কাছ থেকে সিমেন্ট, রড আর স্টোনচিপ কিনেছিলেন।।
‘ওই ফাইলটা নিয়ে পুলিশে গেলে হয়তো ফ্লাইওভারের কেসটা রি-ওপেন করা যেত, কিন্তু সেটা না করে আমি বলতে গেলে ব্ল্যাকমেইলের পথ ধরলাম। কারণ, বাবা মারা যাওয়ার পর আমি আর মা হেভি ফিনানশিয়াল ক্রাইসিসের মধ্যে পড়েছিলাম। মানে, মান্থলি বাড়িভাড়ার টাকাটাও পে করতে পারছিলাম না।
‘আমি ফাইলটার একটা ব্যাক আপ কপি তৈরি করে ওটা নিয়ে মিস্টার মজুমদারের সঙ্গে দেখা করলাম। উনি খুব ধুরন্ধর মানুষ ছিলেন। ব্যাপারটা ছক কষে নিতে ওঁর দশমিনিটের বেশি সময় লাগেনি। উনি আমাকে ওঁর ”নিলয় কনস্ট্রাকশনস”-এর ম্যানেজার করে দিলেন এবং একইসঙ্গে টুয়েন্টি পারসেন্টের পার্টনার করে নিলেন। চটজলদি সব পেপারস তৈরিও করে দিলেন। আমার মা সেইসময়ে হঠাৎ করে মারা গেলেন। আমি একেবারে একা হয়ে গেলাম। তখন মিস্টার মজুমদার আমাকে এ-বাড়িতে এসে থাকতে বললেন। যাকে বলে একেবারে পুজো বোনাস। কিন্তু…কিন্তু এতসব করা সত্ত্বেও বাবার মার্ডারারকে আমি ক্ষমা করতে পারছিলাম না। তার ওপর মিস্টার মজুমদার খুব বাজেভাবে কথা বলতেন। বিনা কারণে, বলতে গেলে সবসময়, খিচিরখিচির করতেন। বোধহয় ভাবতেন আমি ওঁর কেনা সম্পত্তি। কে জানে!
