এসিজি প্রজেনের দিকে তাকিয়ে ঠোঁট বেশ চওড়া করে হাসলেন : ‘মোবাইলটা কার একটু পরেই সেটা বুঝতে পারবেন।…যাই হোক, এবারে কাজের কথায় ফিরে আসি…।’ সাবিত্রীর দিকে নজর ফেরালেন বৃদ্ধ গোয়েন্দা। বেশ নরম এবং শান্ত গলায় বললেন, ‘সাবি, তুমি মা আমাদের সবাইকে মহাভারতের গল্পটা আর-একবার শোনাও তো! সেই যে, পাশা খেলার চ্যাপ্টারটা—যেটা নিলয়বাবু খুন হওয়ার রাতে দুবার পড়েছিলেন!’
সাবিত্রী ধন্দভরা চোখে অশোকচন্দ্র গুপ্তকে দেখতে লাগল। বৃদ্ধের চোখমুখ ভীষণ সিরিয়াস—মজা করছেন বলে মোটেই মনে হচ্ছিল না।
কিছুক্ষণ ইতস্তত করল সাবি। ছ’জন মানুষের মুখের দিকে পালা করে তাকাল। ঢোঁক গিলল দুবার। তারপর দ্বিতীয়বার তাকাল তনয়ের দিকে।
ধীরে-ধীরে ‘মহাভারতের গল্প’-টা শোনাল সাবিত্রী। শেষ দিকে ওর গলার স্বর এত নেমে গিয়েছিল যে, প্রায় শোনাই যাচ্ছিল না।
ওর কথা শেষ হলে সবাই চুপ করে রইল।
ঘরটা কেমন থমথমে হয়ে গেল। শুধু বৃষ্টির শব্দ শোনা যাচ্ছিল।
অশোকচন্দ্র গুপ্ত শব্দ করে গলা পরিষ্কার করলেন। তারপর আপনমনে সামান্য হেসে বিশেষভাবে কারও দিকে না তাকিয়ে কথা বলতে শুরু করলেন।
‘আপনারা সবাই নিশ্চয়ই এখন বুঝতে পারছেন, খুনের সময়টা ঘেঁটে দেওয়ার জন্যে মার্ডারার কোন কায়দাটা ব্যবহার করেছিল। মহাভারতের একই জায়গা দুবার পড়াটা যেমন একটা পয়েন্টার, তেমনই ওই হাঁচির শব্দ—দুবারই এগজ্যাক্টলি একই জায়গায় হাঁচির শব্দটাও আর-একটা পয়েন্টার…।’
এবার প্রজেনের দিকে তাকালেন এসিজি। কয়েকসেকেন্ড তাকিয়ে থাকার পর ওঁর দৃষ্টি শিফট করল তনয়ের দিকে। তারপর টুনির দিকে।
‘তার মানে, আপনরা তো এখন স্পষ্টই বুঝতে পারছেন, নিলয় মজুমদার ওঁর রোজকার নিয়ম মতো মহাভারত পড়া শুরু করার আগেই মার্ডারার ওঁর ঘরে গিয়ে হাজির হয়েছিল। ওঁর নজরের আড়ালে নিজের স্মার্ট ফোনটা রেকর্ডিং মোডে অন করে রেখে এসেছিল।
‘পরে খুনি আবার নিলয়বাবুর ঘরে যায়। খুনির হাতে তখন একটা ব্লান্ট ইনস্ট্রুমেন্ট ছিল। ইনস্ট্রুমেন্টটা হতে পারে একটা শক্তপোক্ত গাছের ডাল—যেটা দিয়ে ক্রিকেট ব্যাট কিংবা বেসবল ব্যাটের মতো জোরে হাঁকানোর কাজ চলতে পারে। কিন্তু এখানে মনে রাখতে হবে, ফোরেন্সিক এক্সপার্টরা নিলয়বাবুর মাথার উন্ডে কাঠের গুঁড়ো, ময়লা, কিংবা শ্যাওলা, কিছুই পাননি। ফলে, আমার মনে হয়েছে, ওই গাছের ডালটার ওপরে খুনি হয়তো কোনও পলিথিনের প্যাকেট বা ওইরকম একটা কিছু জড়িয়ে নিয়েছিল।
‘ওয়েপন হিসেবে আমি যে গাছের একটা মোটা ডালের কথা ভেবেছি সেটার কারণ, এ-বাড়িতে ঢোকার সময় আমি লক্ষ করেছি, বাগানে পাঁচিল ঘেঁষে অনেকগুলো গাছের ডালের টুকরো সাজিয়ে রাখা আছে…।’
এসিজিকে বাধা দিয়ে তনয় বলে উঠলেন, ‘ওগুলো রামাইয়া—আমাদের বাগানের মালি—ও রেখেছে। ও ওগুলো জ্বালানি কাঠ হিসেবে ইউজ করে।’
এসিজি তনয়ের দিকে কৌতুকের চোখে তাকালেন : ‘মিস্টার মজুমদার, আপনি বলছেন, রামাইয়া ফায়ারউড হিসেবে ওই কাটা ডালগুলোকে ইউজ করে। সে করুক। তাই বলে সেখানকার একটা ডাল মার্ডারার ওয়েপন হিসেবে ইউজ করতে পারবে না এমন তো নয়! তবে হ্যাঁ, ওয়েপনটা গাছের ডাল না হয়ে একটা লোহার রড কিংবা সেই টাইপের কিছুও হতে পারে। এবং সেই রডটাও পলিথিন বা অন্য কিছু দিয়ে কভার করা ছিল।
‘তো মহাভারতের গল্প রেকর্ড করা সেই মোবাইলটা সেফ জায়গায় রেখে খুনি ব্লান্ট ইনস্ট্রুমেন্ট দিয়ে তার কাজ শেষ করল। তারপর রাতের অন্ধকারে নিজেকে যতটা সম্ভব মিশিয়ে দিয়ে সে ফিরে গেল নিজের ঘরে। রক্তের ছিটে লাগা জামাকাপড় পালটে নিল। খুনের অস্ত্রটাকে লুকিয়ে ফেলল রাতারাতি। যদি গাছের ডাল সেই খুনের অস্ত্র হয় তা হলে সেটাকে নিশ্চিহ্ন করতে ওটা কেটেকুটে টুকরো করে স্ট্রেইট পুড়িয়ে ফেলা যেতে পারে।
‘এরপর এল মোবাইলে রেকর্ড করা মহাভারতের পাশা খেলার অংশটা প্লেব্যাক করার সময়। ধরা যাক, স্মার্ট ফোনটা নিয়ে খুনি সেকেন্ড টাইম আবার নিলয়বাবুর ঘরে এল। ফোনে রেকর্ড করা অংশটা প্লেব্যাক মোডে চালিয়ে দিল। আবার মহাভারত পাঠ শুরু হল—শুরু হল পাশা খেলা। খুনি এটুকু জানত, সেই মহাভারত পাঠ আর কেউ না শুনুক অন্তত সাবি শুনবে, এবং পুলিশকে জানাবে। তাতে পুলিশ ভাববে নিলয় মজুমদার তখনও বেঁচে ছিলেন—অথচ তখন মানুষটা নেহাতই একটা ডেডবডি। হয়তো সেই ডেডবডির মুখে-মাথায় তখন মাছি বসতে শুরু করেছে।
‘সত্যিই একসময় সাবিত্রীর ঘুম চটে যায় এবং শুনতে পায় ওর ”দাদুবাবা” মহাভারত পড়ছেন। সেই মহাভারত পড়া শেষ হলে খুনি কোনও এক ফাঁকে মোবাইল ফোনটা আবার হাতিয়ে নেয়।’
টেবিল থেকে তুলে নেওয়া স্মার্ট ফোনটা অশোকচন্দ্রের হাতেই ধরা ছিল। সেটা সবাইকে দেখিয়ে তিনি বললেন, ‘আমি সার্ভিস প্রোভাইডারের দেওয়া কোড ইউজ করে ডিলিটেড আডিয়ো ফাইলটা রিট্রিভ করেছি। এবার সেই হিডন ফাইলটা প্লেব্যাক করে সবাইকে শোনাব : নিলয় মজুমদার মহাভারত পড়ছেন—পাশা খেলা শুরু হচ্ছে—।’
‘ইয়ে কিসকা ফোন হ্যায়, গুপ্তাসাব?’ রঘুপতি প্রশ্ন করল।
অশোকচন্দ্র গুপ্ত কোনও জবাব দেওয়ার আগেই প্রজেন বসু রায় ছিলে ছেঁড়া ধনুকের মতো ছিটকে উঠে দাঁড়ালেন। এসিজির দিকে আঙুল তুলে ঝাঁজালো গলায় বললেন, ‘আপনারা কি ন্যাকামো করছেন? আপনারা জানেন না ওটা কার ফোন? ওটা আমার ফোন—আমার! আমার!’
