তনয় ছোট্ট করে ঘাড় নেড়ে ‘হ্যাঁ’ বোঝালেন। বাকিরা চুপ করে রইল।
এসিজি একটু দম দিয়ে মাথার চুলে হাত বোলালেন। রঘুপতি ডানহাতের বুড়ো আঙুলটা টেবিলে আলতো করে ঘষছিল। আর নিজামুল হক দাঁত দিয়ে নখ কাটছিলেন।
এসিজি সবাইকে একপলক করে দেখে নিয়ে আবার বলতে শুরু করলেন।
‘আপনাদের মোবাইলের সার্ভিস প্রোভাইডারদের সঙ্গে পুলিশ অনেকদিন আগেই কথা বলেছে। আপনাদের সবার কল রেকর্ডস এবং এস. এম. এস. ইত্যাদি খতিয়ে দেখেছে। তাতে পুলিশের তদন্ত বিশেষ এগোয়নি। আমি এখন আপনাদের ফোনের হিডন ফাইলগুলো চেক করে দেখব। যেসব ডেটা আপনারা স্টোর করেছেন, কিন্তু পরে আবার ডিলিট করে দিয়েছেন—সেগুলো আমি একটু খুঁটিয়ে দেখব। রঘুপতি—’ রঘুপতি যাদবের দিকে তাকালেন এসিজি : ‘তুমি প্লিজ সার্ভিস প্রোভাইডারদের এক-এক করে ফোন করো—বলো, আমরা এগজ্যাক্টলি কী চাইছি। তোমাকে আমি কিছুক্ষণ আগে সেটা বলেওছি। ওদের বলো, আমরা খুব তাড়াতাড়ি ইনফরমেশানগুলো চাই…।’
‘ও. কে., ডক্টর গুপ্তা—।’ বলে রঘুপতি টেবিলে রাখা ওর ফোল্ডারটা হাতে তুলে নিল। তারপর চেয়ার ছেড়ে ঘরের বাইরে চলে গেল। এসিজিও চট করে উঠে পড়লেন। রঘুপতির সঙ্গে ঘরের বাইরে গিয়ে দাঁড়ালেন। ঘাড় নীচু করে চাপা গলায় রঘুপতির সঙ্গে কীসব কথা বললেন। বড়জোর দশমিনিট—তারপরই এসিজি ফিরে এলেন ঘরে। নিজের চেয়ারে বসে ঘরের সিলিং-এর দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
রঘুপতি ফোল্ডার খুলে বিশেষ একটা পৃষ্ঠা বের করে নিল। সেই পৃষ্ঠায় তনয় মজুমদার ও বাকি তিনজনের মোবাইল নম্বর এবং সার্ভিস প্রোভাইডার সম্পর্কে নানান তথ্য লেখা। রঘুপতি নিজের মোবাইল ফোন বের করে সেই পৃষ্ঠাটার দিকে চোখ রেখে ফোনের বোতাম টিপতে শুরু করল। তারপর ফোনটা ডানকানে চেপে ধরল। এবং একটু পরেই ফোনে কথা বলতে শুরু করল।
কী কথা যে বলছে সেটা ঘর থেকে ঠিকঠাক বোঝা না গেলেও রঘুপতি যাদব যে বেশ এক্সাইটেড হয়ে কথা বলছে সেটা দিব্যি বোঝা গেল।
ঘরের ভেতরে একটা থমথমে উৎকণ্ঠা। খোলা দরজা দিয়ে রঘুপতির পিঠ দেখা যাচ্ছিল।
প্রজেন বসু রায় এপাশ-ওপাশ তাকাচ্ছিলেন। একবার তনয়, আর-একবার টুনিকে দেখছিলেন। স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছিল, প্রজেন বেশ উসখুস করছেন।
এসিজি সন্দেহভাজন চারজনকেই খুঁটিয়ে দেখছিলেন।
তনয় বেশ শান্তভাবে বসে আছেন।
প্রজেন এখন রঘুপতির দিকে তাকিয়ে আছেন।
টুনি জানলা দিয়ে বাইরের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে আছেন।
সাবিত্রী এসিজিকে তোলমোলের নজরে দেখছে। ওর মুখে ঘামের বিন্দু। শাড়ির আঁচল দিয়ে চট করে একবার ঘাম মুছে নিল।
দরজার কাছ থেকে রঘুপতির টুকরো-টুকরো কথা শোনা যাচ্ছিল।
‘হ্যাঁ, আমি হোল্ড করছি…কিন্তু ইনফরমেশানগুলো খুব জরুরি।…হাঁ, হাঁ—ওহি কোড হমে চাহিয়ে। প্লিজ, হোয়াটসঅ্যাপ করে আমার ফোনে পাঠিয়ে দিন। এই কোডটা ইউজ করলেই হিডন ফাইলগুলো সব দেখা যাবে তো? লাস্ট ওয়ান মান্থে কী-কী ফাইল ডিলিট হয়েছে সেগুলো পাওয়া যাবে?…গুড। থ্যাংক ইউ…।’
একটু পরেই রঘুপতি যাদব দরজার কাছ থেকে চলে এল ঘরের ভেতরে। ফোল্ডারটা গুছিয়ে আবার টেবিলে রেখে দিল। তারপর নিজের মোবাইল ফোনের দু-একটা বোতাম টিপে ফোনটা অশোকচন্দ্রের চোখের সামনে ধরল : ‘স্যার, এই যে, কোডটা ওরা পাঠিয়েছে। এটা ইউজ করলেই আপনি হিডন ফাইলের কাহানি জেনে যাবেন। সব সারভিস প্রোভাইডারের সেম কোড—আই. এম. ই. আই. নম্বর দেখতে গেলে যেমন সেম কোড।’
অশোকচন্দ্র কোডটা ভালো করে দেখলেন। ঘাড় নাড়লেন দুবার। বিড়বিড় করে বললেন, ‘গুড ওয়ার্ক, রঘুপতি—গুড ওয়ার্ক।’
রঘুপতি এসিজির পাশে বসে পড়ল।
এসিজি টেবিলে রাখা চারটে ফোনের মধ্যে একটা ফোন হাতে তুলে নিলেন। এবং চশমাটা নাকের ওপরে নাড়াচাড়া দিয়ে সেট করে তীক্ষ্ন মনোযোগে ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইলেন। একইসঙ্গে হ্যান্ডসেটের বোতাম টিপতে লাগলেন।
এমন সময় জানলার বাইরে থেকে বৃষ্টির ফোঁটার টপাটপ শব্দ ভেসে এল। বেশ জোরে বৃষ্টি নেমেছে। এসিজি একবার খোলা জানলার দিকে তাকালেন। তারপর অনেকটা যেন আপনমনেই কথা বলতে শুরু করলেন।
‘আপনাদের সবার স্টেটমেন্ট আর পি. এম. রিপোর্ট কোরিলেট করে পুলিশ এই ডিসিশানে এসেছে যে, নিলয় মজুমদার খুন হয়েছেন গত মাসের বাইশ তারিখ রাত দশটা থেকে একটার মধ্যে। কিন্তু আজ সকাল থেকে সব দেখে-শুনে, ফাইলের কাগজপত্র ঘেঁটে, আপনাদের জিজ্ঞাসাবাদ করে আমার মনে হয়েছে, নিলয়বাবু খুন হয়েছেন দশটা বাজার অন্তত এক কি দেড়ঘণ্টা আগে। খুনের সময়টাকে ঘেঁটে দেওয়ার জন্যে খুনি একটা কায়দা ব্যবহার করেছিল। সেই কায়দাটা এই ফোনের মধ্যে আছে—’ হাত উঁচু করে ধরে ফোনটা সবাইকে দেখালেন এসিজি। সময় নিয়ে সবার মুখের দিকে পালা করে তাকালেন। তারপর : ‘রঘুপতির এফার্ট আর সাপোর্টে আমরা একটা ডিলিটেড ফাইল রেস্টোর করতে পেরেছি। অবশ্য তার সঙ্গে মোবাইল কানেকশানের সার্ভিস প্রোভাইডারদের হেলপ-এর ব্যাপারটাও অ্যাকনলেজ করতে হবে।
‘ফাইলটা একটা অডিয়ো ফাইল। তবে ব্যাপারটা খোলসা করে বলার আগে আমি আপনাদের একটা ঘটনা শোনাতে চাই। সেই ঘটনার সাক্ষী সাবি—মানে, সাবিত্রী…।’
‘সাবি আবার আমাদের কী শোনাবে?’ রুক্ষভাবে প্রশ্ন তুললেন প্রজেন বসু রায়, ‘আর…আপনার হাতের মোবাইলটা কার বলুন তো? আমার?’
