‘এবার তার কাজ হল প্রথম দরজাটা বন্ধ করে সেটা ভেতর থেকে ছিটকিনি এঁটে দেওয়া। খুনের হাতিয়ারটা বিছানা থেকে তুলে নিয়ে নিজের জামাকাপড়ের আড়ালে লুকিয়ে নেওয়া। তারপর ঘরের নানান জায়গার হাতের ছাপ-টাপ মুছে দ্বিতীয় দরজা দিয়ে বাইরে বেরিয়ে এসে খুব সাবধানে হাঁসকল লাগিয়ে আবার তালা দিয়ে দেওয়া।
‘এভাবেই তৈরি হল লকড রুম। কিন্তু পাজলটা তৈরি হচ্ছে লাস্টে—একেবারে শেষ ধাপে। অর্থাৎ, যে-জানলাটার কাচ কিছুটা খোলা ছিল সেই জানলার গ্রিলের ফাঁক দিয়ে হাত গলিয়ে নিলয়বাবুর চাবির গোছাটা বিছানা তাক করে ছুড়ে দেওয়া। ব্যস, তৈরি হয়ে গেল লকড রুম পাজল—বন্ধ ঘরের রহস্য।
‘এরপর যেসব কাজ খুনির বাকি রইল সেগুলো হল, নিলয় মজুমদারের ঘরের দুটো দরজার বাইরের দিকের হাতের ছাপ মুছে ফেলা, হাঁসকল আর তালার গায়ের ছাপ মোছা, দোতলার স্পাইরাল সিঁড়ির কাছে লোহার জাল কাতুরি দিয়ে বেশ খানিকটা কেটে ফেলা, খুনের হাতিয়ারটা লুকিয়ে ফেলা, হ্যাট তিনটে বাগানে ছুড়ে ফেলা, এবং রক্তমাখা জামাকাপড়ের একটা জুতসই বন্দোবস্ত করা…।’
নিজামুল হক হঠাৎই লাফিয়ে উঠলেন : ‘অসম্ভব, গুপ্তসাহেব, অসম্ভব! এতসব কাজ খুনির একার পক্ষে অসম্ভব! ইমপসিবল! কী বলেন, ইনস্পেকটার যাদব?’ প্রশ্নটা করতে রঘুপতি যাদবের দিকে ফিরে তাকালেন হকসাহেব।
এসিজি হাসলেন। বললেন, ‘মিস্টার হক ঠিকই বলেছেন, রঘুপতি। এই খুনের ক্ষেত্রে কাজের পরিমাণটা বড্ড বেশি। অনেকগুলো কাজ। আমার মনে হয়, জাল কাটার কাজটা মার্ডারার আগেই সেরে রেখেছিল। সেটা সন্ধের অন্ধকারে কারও নজরে পড়েনি। তা ছাড়া বারান্দার জাল কাটার ব্যাপারটা সাবিত্রী ছাড়া আর দেখারই বা কে আছে! কিন্তু সাবিত্রী বলেছে, জাল যে কাটা হয়েছে সেটা পুলিশ ওকে বলার আগে ও খেয়ালই করেনি। কী, সাবিত্রী, তাই তো?’ প্রশ্নটা সাবিত্রীকে ছুড়ে দিলেন এসিজি।
সাবিত্রী তাড়াতাড়ি মাথা নোয়াল : ‘হ্যাঁ, স্যার—।’
‘গুড। নাউ, রঘুপতি, এবার আমার মোবাইল ফোনগুলো চাই—চারজনেরটাই।’ রঘুপতির দিকে তাকালেন অশোকচন্দ্র। তারপর তনয়, প্রজেনদের দিকে তাকিয়ে চোখের ইশারা করলেন।
রঘুপতি যাদব চট করে উঠে দাঁড়াল। তিনটে লম্বা স্টেপ ফেলে তনয়দের খুব কাছে পৌঁছে গেল। কোনও কথা না বলে ডানহাতটা সামনে বাড়িয়ে ধরল।
সত্যিই কোনও কথা বলার দরকার ছিল না। কারণ, তনয়, প্রজেন, আর টুনি একটুও দেরি না করে নিজেদের মোবাইল ফোন রঘুপতির খসখসে হাতের চেটোয় জমা দিলেন।
সাবিত্রী স্টাডিরুমের দরজার কাছ থেকে রঘুপতির কাছে এগিয়ে এল। নিজের ফোনটা রঘুপতিকে দিল।
রঘুপতি লক্ষ করল, তনয়দের ফোনগুলো নামি ব্র্যান্ডের দামি স্মার্টফোন হলেও সাবিত্রীর ফোনটা সস্তার বারফোন। তা ছাড়া ফোনটা ঘামে ভেজা। বোধহয় সাবি এতক্ষণ ফোনটাকে শক্ত মুঠোয় চেপে ধরে ছিল।
রঘুপতি ফোনগুলো নিয়ে এসিজির কাছে গেল। ওগুলো টেবিলে নামিয়ে রেখে কোনটা কার ফোন সেটা বলার সঙ্গে-সঙ্গে ফোনগুলো পাশাপাশি সাজিয়ে দিল। এসিজির রেফারেন্সে বাঁ-দিক থেকে তনয়, টুনি, প্রজেন ও সাবিত্রী।
প্রজেনের ফোনটা হাতে তুলে নিলেন অশোকচন্দ্র গুপ্ত। ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে দেখতে লাগলেন ফোনটা।
প্রজেন চট করে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘ডক্টর গুপ্ত, আশা করি আপনি প্রাইভেসি রাইটের ব্যাপারটা ভুলে যাবেন না।’
এসিজি হাসলেন, একটা হাত তুলে ইশারায় ওঁকে আশ্বস্ত করলেন : ‘আপনি নিশ্চিন্ত হয়ে বসুন, মিস্টার বসু রায়। প্রাইভেসি রাইটের কথা আমার ভালো করেই মনে আছে। আমি আপনার ফোনের মেসেজ বা অন্য কোনও পারসোনাল ব্যাপার পড়ে দেখার জন্যে এতটুকুও ইন্টারেস্টেড নই। আমি বরং আই. এম. ই. আই. নাম্বারটা সম্পর্কে কয়েকটা কথা আপনাদের বলব…।
‘আপনারা হয়তো জানেন, মোবাইল ফোনে ”*#06#” পাঞ্চ করলেই আই. এম. ই. আই. নাম্বারটা ফোনের পরদায় ভেসে ওঠে—স্মার্ট ফোনে তার সঙ্গে থাকে বারকোড। আই. এম. ই. আই.-এর ফুল ফর্মটা হল, ”ইনটারন্যাশনাল মোবাইল ইকুইপমেন্ট আইডেনটিটি”। এটা একটা ইউনিক ফিফটিন ডিজিট নাম্বার। মোবাইল ফোন হারিয়ে-টারিয়ে গেলে এই নাম্বারটার হেলপ নিয়ে সেটাকে লোকেট করা যায়। তা ছাড়া এই নাম্বারটা ইউজ করে মোবাইলের সার্ভিস প্রোভাইডাররা হ্যান্ডসেট থেকে যে-কোনও ডেটা অ্যাকসেস করতে পারে—যেমন, কনট্যাক্ট লিস্ট, এস. এম. এস. এবং আরও অনেক কিছু। কেউ যদি ফোন থেকে কোনও কনট্যাক্ট কিংবা মেসেজ ডিলিট করে দেয় তা হলে সেই ডেটা মোটেই চিরকালের জন্য উধাও হয়ে যায় না—থেকে যায় ডিভাইসের ভেতরে একটা হিডন ফাইলে। সার্ভিস প্রোভাইডার যদি চায় তা হলে আই. এম. ই. আই. নাম্বারটা ইউজ করে সেই হিডন ফাইল সহজেই অ্যাকসেস করতে পারে…।’
‘এটা তো ইনভেশান অফ প্রাইভেসি…’ টুনি মজুমদার বললেন এবং প্রজেনের দিকে একপলক তাকালেন।
‘হ্যাঁ, ম্যাডাম—ঠিক বলেছেন। ইট ইজ ডেফিনিটলি ইনভেশান অফ প্রাইভেসি। তবে এই ইনভেশানের ব্যাপারটা পুলিশ করে থাকে কোনও সিরিয়াস ইনভেস্টিগেশানের সময়…যেমন, এই নিলয়বাবুর মার্ডার কেস। তবে এটা ঠিক যে, পুলিশ সাসপেক্টের হ্যান্ডসেট থেকে কিংবা সার্ভিস প্রোভাইডারের কাছ থেকে যা কিছু জানতে পারে সেগুলো তারা সিক্রেট রাখে। শুধুমাত্র যেটুকু প্রয়োজন সেটুকু ক্রিমিনালের কনভিকশানের কাজে কোর্টে ব্যবহার করে। আশা করি পুরো ব্যাপারটা আপনাদের কাছে এখন ক্লিয়ার?’
