‘আমি কি খুনের প্ল্যান করতে বসেছি নাকি যে ধৈর্য ধরব!’ প্রজেনের গলার সুর একেবারে উগ্রপন্থী।
এসিজি রুবিক কিউবটা পকেটে ঢুকিয়ে রেখে শান্ত গলায় বললেন, ‘আপনি কীসের প্ল্যান করতে বসেছেন বা কীসের প্ল্যান করতে ভালোবাসেন সেটা একটু পরেই বোঝা যাবে। তবে আপনাকে একটা অ্যাডভাইস দিই : ইনস্পেকটর যাদবের ধৈর্য নষ্ট করবেন না। কারণ, তা হলে আপনার স্বাস্থ্য নষ্ট হতে পারে…।’
‘মানে…মানে!’ প্রজেনের গলায় সতর্ক উত্তেজনা। এসিজির দিক থেকে চোখ সরিয়ে রঘুপতি যাদবের দিকে একবার তাকালেন। রঘুপতি ঠোঁটে তর্জনী ঠেকিয়ে প্রজেনকে চুপ করতে ইশারা করল।
এসিজি প্রজেনের দিকে তাকিয়ে সামান্য মুচকি হাসলেন। তারপর চেয়ারে এসে বসলেন। দুবার গলাখাঁকারি দিয়ে আবার বলতে শুরু করলেন।
‘আমাকে দুঃখের সঙ্গে বলতে হচ্ছে যে, নিলয় মজুমদার খুব সুবিধের মানুষ ছিলেন না। উনি একজন অসৎ ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন। ওঁর কনস্ট্রাকশনে অনেক ফাঁকফোকর থাকত—যদিও কখনও ওঁর ফার্মের গায়ে কালি লাগেনি। এ ছাড়া নিলয়বাবুর ব্যবহার খুব খারাপ ছিল। রেগে গেলে লোকজনকে অত্যন্ত খারাপ-খারাপ কথা বলতেন। ওঁর কোম্পানির কর্মী হোক কি এ-বাড়ির কেউ হোক—উনি কাউকেই রেয়াত করতেন না। ইনস্পেকটর যাদবের দেওয়া ফাইল খুব খুঁটিয়ে পড়ে আর আজ এ-বাড়ির লোকজনের সঙ্গে কথা বলে আমার সেরকমই মনে হয়েছে…।’
তনয় নীচু গলায় বললেন, ‘মাথা গরম হয়ে গেলে বাবার আর কোনওরকম জ্ঞানগম্যি থাকত না। ওঁর মেজাজের আঁচ থেকে কেউই রেহাই পায়নি।’
টুনি মজুমদার ফস করে বলে উঠলেন, ‘আমাকে তো একবার বলেছিলেন, ”তুমি র্যাম্পে অত হাঁটাহাঁটি না করে ওখানেই একটা কোঠা বানিয়ে নাও—তোমার বুটিকের বিক্রিবাটা বাড়বে।” ভাবুন তো, কীরকম নোংরা লোক!’
‘টুনি! কী হচ্ছে!’ তনয় চাপা গলায় স্ত্রীকে যেন ধমক দিলেন।
‘হ্যাঁ—এটাই তো নিলয়বাবুর সবচেয়ে খারাপ দিক ছিল…’ এসিজি বলে চললেন, ‘তবে এইরকম খারাপ ব্যবহারের জন্যে খুনি ওঁকে খুন করেনি। খুনের আর-একটা প্যারালাল মোটিভ হচ্ছে, মার্ডার ফর গেইন। কারণ, নিলয়বাবু মারা গেলে ওঁর সমস্ত সম্পত্তির ফিফটি-ফিফটি মালিক হয়ে যাবেন তনয় মজুমদার আর প্রজেন বসু রায়। নিলয় মজুমদারের লিগাল অ্যাডভাইসরের কাছ থেকে রঘুপতি এই ইনফরমেশান কালেক্ট করেছে…।
‘কিন্তু বন্ধ ঘরের ভেতরে খুনটা হল কীভাবে? এবার সে-কথাতেই আসছি। অনেক ব্রেইন স্টর্মিং করে যে-মেথডটা আমি খুঁজে পেয়েছি সেটা এইরকম।
‘খুনি রাতে কোনও একটা সময়ে নিলয় মজুমদারের ঘরে এল। বন্ধ দরজায় টোকা দিল, ডাকল। নিলয়বাবু হয়তো খাটে বসে কোনও বই-টই পড়ছিলেন। সেটা মুলতুবি রেখে দরজার কাছে গেলেন। হয়তো জিগ্যেস করলেন, ”কে?” উত্তরে খুনি নিজের নাম বলল।
‘চেনা মানুষের গলা, তাই নিলয়বাবু দরজা খুলে দিলেন। খুনি ঘরে ঢুকল। নিলয়বাবু দরজা আবার বন্ধ করে দিলেন—ছিটকিনি এঁটে দিলেন ভেতর থেকে। কারণ, উনি সবসময় ওঁর ঘরের দরজা ভেতর থেকে বন্ধই রাখতেন। তারপর খাটে গিয়ে বসলেন আবার। হয়তো ভুরু কুঁচকে আগন্তুককে জিগ্যেস করলেন, ”কী ব্যাপার, কী চাই?”
‘খুনি তার উত্তরে ব্লান্ট ইনস্ট্রুমেন্টটা বৃদ্ধের মাথার পেছনে বসিয়ে দিল। মাথার খুলি ফাটল। রক্ত বেরোতে লাগল গলগল করে। বৃদ্ধ উপুড় হয়ে পড়লেন বিছানায়। খুনির জামাকাপড়ে রক্ত লেগে গেল।
‘খুনি হাতিয়ারটা খাটের ওপরে রাখল। খাটের নীচে পড়ে ছিল দু-চারটে রবারের ফিতে। মানে, স্লাইডিং গ্লাস উইন্ডোর এজগুলো সিল করতে যে-ধরনের ফিতে লাগে। ফিতেগুলো ঘরে পড়ে ছিল, কারণ, কিছুদিন আগেই নিলয় মজুমদারের নির্দেশে ওঁর ঘরের জানলায় স্লাইডিং কাচের জানলা লাগানো হয়।
‘তো সেইরকমই একটা ফিতে কুড়িয়ে নিয়ে খুনি নিলয়বাবুর গলায় পেঁচিয়ে ফাঁস দেয়। তারপর দু-হাতে রবারের ফিতেটা দু-পাশ থেকে টানতে থাকে। খুনির সেই টানের মধ্যে মিশে ছিল রাগ আর ঘেন্না। মানে, একটা মার্ডার ফর গেইন—বাট উইথ শেডস অফ অ্যাঙ্গার অ্যান্ড হেট্রেড।
‘ব্লান্ট ইনস্ট্রুমেন্ট দিয়ে হিট করার পর নিলয়ের মাথার খুলি কয়েক টুকরো হয়ে গিয়েছিল। সেরিব্রাল হেমিস্ফিয়ার আর অকসিপিটাল লোব ভীষণভাবে চোট পেয়েছিল। পোস্ট মর্টেম রিপোর্ট সেরকম কথাই লিখেছে। তার সঙ্গে অ্যাসোসিয়েটেড প্রোফিউজ ব্লিডিং। ডেথ ওয়জ ইনএভিটেবল। আর তার ওপরে গ্যারোটিং।
‘অর্থাৎ, মিস্টার মজুমদার ডায়েড ভায়োলেন্টলি।’
একটু থামলেন এসিজি। প্রজেন, তনয়, টুনি এবং সাবিত্রীর দিকে তাকালেন। প্রথম তিনজন নির্বিকার। শুধু সাবিত্রীকে দেখে মনে হল, খুনের দৃশ্যটা কল্পনা করে ও কেমন যেন শিউরে ওঠা কাঁচুমাচু মুখে বসে আছে।
‘কিন্তু তারপর? তারপর খুনি বারান্দার দিকের একটা জানলার কাচের পাল্লা সামান্য সরিয়ে একটু ফাঁক করে দিল। নিলয়বাবুর বালিশের নীচ থেকে ওঁর চাবির গোছাটা বের করে নিল। খুনি জানত যে, নিলয়বাবু চাবির গোছা বালিশের নীছে রাখতেন। তারপর…প্রথমে আলমারি খুলে তার দরজা দুটো হাট করে দিল। আলমারি থেকে চটপট তিনটে হ্যাট বের করে নিল। সেগুলো দুমড়ে-মুচড়ে পকেটে গুঁজে নিল। ঘরের বাইরে বেরিয়ে এসে চাবি দিয়ে হাঁসকলের তালা খুলল। তারপর খুব সাবধানে হাঁসকল খুলে আবার ঘরে ঢুকল।
