মনে-মনে টুকরো চিন্তাগুলোকে নিজের মতো করে সাজিয়ে নিলেন অশোকচন্দ্র গুপ্ত। তারপর বলতে শুরু করলেন।
‘নিলয় মজুমদারের মার্ডারটা একটা প্রিমেডিটেটেড মার্ডার—মানে, খুনি আগে থেকে পরিকল্পনা করে তারপর কাজে নেমেছে।’ এসিজি মাথা ঝুঁকিয়ে একটা সিগারেট ধরালেন। সরু সুতোর মতো ধোঁয়ার কয়েকটা রেখা বাতাসে ভাসিয়ে ধীরে-ধীরে বললেন, ‘মোটিভের দিকটা চিন্তা করে বলা যায়, এই মার্ডারটা হচ্ছে মার্ডার ফর গেইন। তবে তার সঙ্গে আলতো করে জড়িয়ে আছে প্রতিশোধের একটা ডায়মেনশান। হয়তো এই প্রতিশোধের ডায়মেনশানটা থাকার দরুণই খুনি অমন নৃশংসভাবে চুয়াত্তর বছরের বৃদ্ধ মানুষটিকে খুন করেছে। প্রথমে ব্লান্ট ইনস্ট্রুমেন্ট, মানে, শক্তপোক্ত একটা হাতিয়ার দিয়ে নিলয়বাবুর মাথায় প্রচণ্ড জোরে হিট করেছে। তারপর দু-পাঁচমিনিটের মধ্যেই ওঁর গলায় রবারের ফাঁস এটে দিয়েছে। অতিরিক্ত রক্তপাত, আর দমবন্ধ হওয়াতে বৃদ্ধ ভদ্রলোকের হার্ট জবাব দিয়ে দিয়েছে। পুলিশের পোস্ট মর্টেম রিপোর্ট এই তথ্যই জানিয়েছে।
‘এই মার্ডারটার একটা বিচিত্র বৈশিষ্ট্য হচ্ছে টু মেনি ক্লুজ—বড্ড বেশি সূত্র। ইনস্পেকটর রঘুপতি যাদবের কাছে আমি এই মন্তব্য আগে করেছি। আর একইসঙ্গে আমার মনে হয়েছে, খুনি যেন ইচ্ছে করে অনেকগুলো ধাঁধা ছড়িয়ে গেছে পুলিশের জন্যে। আর এতরকম ধাঁধা ছড়ানো আছে বলেই খুনের এক্সিকিউশানের প্যাটার্নটা আমাদের চোখে পড়ছে না।’ এসিজি একবার রঘুপতির দিকে তাকালেন, তারপর নিজামুল হকের দিকে। সবশেষে চোখ বুলিয়ে নিলেন মজুমদার বাড়ির চারজনের দিকে—তনয়, টুনি, প্রজেন এবং সাবিত্রী। বিনীত গলায় অনুমতি চাইলেন, ‘আপনাদের সবার কাছে একটা অনুরোধ রাখছি : কাইন্ডলি আমাকে স্মোক করার পারমিশান দিন। সিগারেটের এসেন্স মগজে না গেলে আমার মগজ কেমন যেন ঝিমিয়ে থাকে। এই বদ অভ্যেসটা আমি ছাড়ব-ছাড়ব করেও ঠিক ছাড়তে পারছি না…।’
তনয় আর টুনি মজুমদার সৌজন্যের গলায় বললেন, ‘আপনি স্মোক করতে পারেন, মিস্টার গুপ্ত। এত বড় ঘর…জোরে ফ্যান চলছে…মনে হয় না আমাদের কোনও অসুবিধে হবে…।’ তনয় কথাটা শুরু করেছিলেন, টুনি মজুমদার কথাটা শেষ করলেন।
এসিজি পাঞ্জাবির পকেট থেকে সিগারেট আর লাইটার বের করলেন। মাথা ঝুঁকিয়ে এমন মনোযোগে সিগারেট ধরালেন যেন সিগারেটের ডগায় আগুন ঠিকঠাকভাবে না ধরলে পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাওয়ার প্রবল সম্ভাবনা।
আনমনা চোখে ঘরের সিলিং-এর দিকে তাকিয়ে ধোঁয়া ছাড়লেন এসিজি। শূন্যে তৈরি হওয়া ধোঁয়ার নকশার দিকে তাকিয়ে আপনমনেই বিড়বিড় করলেন, ‘প্যাটার্ন, প্যাটার্ন…।’
এবার পাজামার পকেটে হাত ঢোকালেন বৃদ্ধ হুনুর। টু বাই টু বাই টু রুবিক কিউব বের করে নিয়ে এলেন। রংচঙে কিউব। বেশ কিউট।
কিউবটা ডানহাতে চোখের সামনে ধরে সেটার দিকে মুগ্ধ চোখে তাকালেন।
রঘুপতি জানে, রুবিক কিউব সলভ করা ওর স্যারের নেশা। প্রথমে স্যারের কাছে ও থ্রি বাই থ্রি বাই থ্রি কিউব দেখেছে। পরে এসিজি ফোর-কিউব এবং ফাইভ-কিউব কিনেছেন। সেগুলো সলভ করার ব্যাপারটাও আয়ত্ত করে নিয়েছেন। এখন, এই প্রথম, স্যারের হাতে দেখছে টু-কিউব। যে-মানুষটা ফাইভ-কিউব সলভ করতে পারে তার হাতে হঠাৎ মোস্ট সিম্পল টু-কিউব কেন?
অশোকচন্দ্র যেন টেলিপ্যাথিতে রঘুপতির প্রশ্নটা টের পেলেন এবং সিগারেটের ধোঁয়া ছেড়ে ধীরে-ধীরে সেই প্রশ্নের জবাব দিলেন, ‘এটা হচ্ছে সবচেয়ে সিম্পল রুবিক কিউব। টু বাই টু বাই টু। এতে থ্রি বাই থ্রি বাই থ্রি কিউবের মিডল লেয়ারগুলো নেই। তাই পড়ে আছে থ্রি-কিউবের শুধুই আটটা কর্নার কিউব। এই কিউবটা দেখতে যতটা সিম্পল এটা সলভ করা কিন্তু ততটা সিম্পল নয়। অর্থাৎ, এটা একদিক থেকে দেখতে গেলে সিম্পল, আবার আর-একদিক থেকে দেখতে গেলে কমপ্লেক্স—ঠিক নিলয় মজুমদারের মার্ডার মিস্ট্রির মতো। সিম্পল অথচ কমপ্লেক্স, আবার কমপ্লেক্স অথচ সিম্পল।’
চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়লেন এসিজি। সিগারেটে ঘন-ঘন কয়েকটা লম্বা টান দিয়ে বাগানের দিকের জানলার কাছে গেলেন। সিগারেটের টুকরোটা ফেলে দিলেন বাইরে। তারপর রুবিক কিউবটা উঁচিয়ে ধরে বললেন, ‘দেখুন, এই ছোট-ছোট আটটা কিউবের রংগুলো কেমন এলেমেলো হয়ে রয়েছে। রেগুলার প্যাটার্নটা বোঝা যাচ্ছে না। এই খুনের কেসটার মতো। এবার এটা আমি সলভ করব…।’ অশোকচন্দ্র দু-হাতে কিউবটা ধরে তার বিভিন্ন লেয়ার চটপট ঘোরাতে লাগলেন। ঘোরানোর সময় মাঝে-মাঝে থামছিলেন, কিউবটার প্যাটর্নটা একঝলক দেখছিলেন।
কয়েকমিনিটের মধ্যেই কিউবটা সলভ করে ফেললেন। কিউবটার ছ’পিঠ ছ’রঙের হয়ে গেল।
এসিজি হেসে বললেন, ‘এই দেখুন, রেগুলার প্যাটার্ন। আর এটা সলভ করতে আমাকে দুটো হাত ব্যবহার করতে হয়েছে। সিম্বলিক্যালি বলতে গেলে, নিলয়বাবুর খুনের এক্সিকিউশানটাও অনেকটা একইরকম…।’
প্রজেন বসু রায় বেশ কিছুক্ষণ ধরেই উসখুস করছিলেন। হঠাৎই অধৈর্য হয়ে ঠোঁট বেকিয়ে মন্তব্য করলেন, ‘কতক্ষণ এইসব ভ্যানতাড়া চলবে বলতে পারেন? কোথায় একটা মার্ডার কেস সলভ করার চেষ্টা চলছে, আর কোথায় রুবিক কিউব! যত্ত সব বুলশিট!’
রঘুপতি উত্তেজিত হয়ে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু এসিজি চোখের ইশারায় ওকে থামিয়ে দিলেন। হাসিমুখে প্রজেন বসু রায়ের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘ধৈর্য, ধৈর্য, এবং ধৈর্য। কোনও খুনের পরিকল্পনার কাজে ধৈর্য হচ্ছে মেইন কি-ওয়ার্ড। তাই আমার আর্নেস্ট রিকোয়েস্ট, প্লিজ একটু ধৈর্য ধরুন…।’
