ঘরের একমাত্র দরজার কাছে অ্যাটেনশনের ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে রয়েছে কনস্টেবল ভগবান মিস্ত্রি।
নিলয় মজুমদারের বিছানায় পাশাপাশি বসে আছেন তিনজন : তনয় মজুমদার, টুনি মজুমদার, আর প্রজেন বসু রায়। চতুর্থজন সাবিত্রী। ওকে বসতে বলা হলেও ও বসেনি। স্টাডিরুমের দরজার কাছে দেওয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। শাড়ির আঁচলে কী কারণে যেন আঁচড় কাটছে।
চারজনের হাতেই মোবাইল ফোন। অশোকচন্দ্র কিছু বলা শুরু করবেন তারই অপেক্ষায় রয়েছেন চারজন। মোবাইল ফোন নাড়াচাড়া করে ওরা সেই অপেক্ষার সময়টুকু পার করছেন।
রঘুপতি যখন চারজনকে এ-ঘরে আসার জন্য বলেছে, তখন জানিয়েছে, ‘আপনারা আপনাদের পারসোনাল মোবাইল ফোন সঙ্গে নিয়ে আসবেন—মানে, যে-ফোনটা আপনারা রেগুলার ইউজ করেন। আমি আপনাদের ফোনের কল হিস্ট্রি চেক করে দেখব যে, সেখানে কারেন্ট আউটগোয়িং আর ইনকামিং কলের ঠিকঠাক লিস্ট আছে কি না…।’
রঘুপতি যাদবের এই ইনস্ট্রাকশনের আড়ালে একটা চাপা থ্রেট ছিল। সেই কারণেই কেউ নির্দেশ অমান্য করতে ভরসা পায়নি।
প্রজেন একবার শুধু প্রোটেস্ট করে বলেছিলেন, ‘মোবাইল ফোন আমাদের প্রাইভেট প্রপার্টি—আমাদের পারসোনাল ব্যাপার। আমাদের প্রাইভেসি আপনি এভাবে ডিসটার্ব করতে পারেন না, অফিসার। আপনাকে আপনার হায়ার অথরিটির কাছ থেকে ক্লিয়ারেন্স নিয়ে আসতে হবে।’
‘তাই নাকি?’ প্রশ্নটা ছুড়ে দিয়ে ঠোঁট বেঁকিয়ে হেসেছে রঘুপতি : ‘মিস্টার প্রজেন বসু রায়, পুলিশ আপনাকে কতরকমভাবে ডিসটার্ব করতে পারে তার কোনও আইডিয়া আপনার নেই। আর এই রঘুপতি যাদব আরও কতরকমভাবে আপনাকে সুপারডিসটার্ব করতে পারে তার থোড়াবহত আইডিয়া দিলে আপনার হাওয়া বেরিয়ে যাবে। ছিবড়েটা মেঝেতে পড়ে থাকবে। আর আপনি আমাকে হায়ার অথরিটি দেখাচ্ছেন? এই কেসের ইনভেস্টিগেশানে আমিই হায়ার অথরিটি, আমিই লোয়ার অথরিটি। অ্যাট লিস্ট আজ, এই স্পটে। সো ডু অ্যাজ ইউ আর ইনস্ট্রাকটেড। ডোন্ট ফোর্স মি টু ফোর্স ইউ।’
রঘুপতির এই হুমকির পর আর কোনও সমস্যা হয়নি।
নিজামুল হক দাড়িতে আলতো করে হাত বুলিয়ে এসিজির দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘নিন, গুপ্তসাহেব, এবারে স্টার্ট করেন…।’
এসিজি একবার ওঁর দিকে দেখলেন। নিজামুলের কপালে দু-চারফোঁটা ঘাম। তেলতেলে মুখ আর কপাল আলো পড়ে চকচক করছে। ভদ্রলোক রীতিমতো উৎসুক মুখে অশোকচন্দ্রের কথা শোনার জন্য অপেক্ষা করছেন।
বাড়ির সকলের সঙ্গে কথাবার্তা শেষ করার পর এসিজির মাথায় বয়ে চলেছে চিন্তা, যুক্তি আর বিশ্লেষণের স্রোত। এ ছাড়া এসিজি নিলয় মজুমদারের বেডরুম এবং স্টাডি আবার খুঁটিয়ে পরীক্ষা করে দেখেছেন। তারপর বাইরের বারান্দায় গেছেন। বারান্দার এ-মাথা থেকে ও-মাথা ঘুরে-ঘুরে দেখেছেন। বারান্দায় লাগানো লোহার জাল পরীক্ষা করেছেন বারবার—বিশেষ করে কাটা জায়গাটা।
পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে, খুনি যদি বাইরের কেউ হয় তা হলে সে ওই লোহার প্যাঁচানো সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় উঠে এসেছিল। তারপর কাতুরি জাতীয় কোনও জিনিস দিয়ে লোহার জাল কাটতে চেষ্টা করে। জাল খানিকটা কাটলেও শেষ পর্যন্ত সুবিধে করতে না পেরে সে সিঁড়ি দিয়ে আবার নেমে যায়। বারান্দার অন্য প্রান্তের একটা ছোট ফাঁক দিয়ে ভেতরে ঢোকে। এভাবে কসরত করে ঢুকে থাকলে খুনির গা-হাত-পা ছড়ে যাওয়ার কথা।
এসিজি খুনির অ্যাক্টিভিটি মনে-মনে রিকনস্ট্রাকট করার চেষ্টা করছিলেন।
খুনি চুপিসাড়ে এসে নিলয় মজুমদারের দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। বারান্দার একপ্রান্তে সাবিত্রী গভীর ঘুমে ডুবে আছে। খুনি আলতো করে দরজায় টোকা দিল। নিলয়বাবু যখন তার পরিচয় জিগ্যেস করলেন তখন খুনি চাপা গলায় নিজের নাম বলল, কিংবা নিলয়বাবুর চেনা অন্য কারও নাম বলল—যাতে উনি দরজা খুলে দেন। কিন্তু তারপর?
নিলয় মজুমদারকে নৃশংসভাবে খুন করার পর খুনি আবার চুপিসাড়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। কিন্তু তারপর ঘরের দরজাটা ভেতর থেকে বন্ধ করল কে? সে যদি খুনির সহকারী হয়, তা হলে সে বেরোল কোথা দিয়ে? সবাই শুরু থেকে দরজা দিয়ে ঘরে ঢোকা বা বেরোনোর কথা ভাবছে, কিন্তু দরজা না হয়ে ব্যাপারটা যদি জানলা হয়? যদি জানলা দিয়ে খুনি ঘরের বাইরে বেরিয়ে থাকে? স্লাইডিং গ্লাস উইন্ডো কিংবা লোহার গ্রিলের মধ্যে যদি কোনও কারসাজি থাকে?
সেইজন্যই এসিজি দরজার পাশাপাশি জানলাগুলোও চুলচেরা পরীক্ষা করেছেন। কিন্তু না, ওগুলোর মধ্যে কোনও ফাঁক বা ফাঁকি পাওয়া যায়নি। অর্থাৎ, নিলয় মজুমদারের ঘরের দরজা এবং জানলা অর্থোডক্স এবং ট্যাম্পারফ্রি।
সুতরাং, চিন্তা, যুক্তি আর বিশ্লেষণ এই নিয়েই ‘থিংকিং মেশিন’ বহুক্ষণ ব্যস্ত থেকেছেন। চোখ বুজে সিগারেটে টান দিয়ে গেছেন একের পর এক।
আচ্ছা, খুনি যদি ভেতরের লোক হয় তা হলে ‘অপারেশান’-টা হয়েছে কীভাবে? বাইরের খুনি যেভাবে কাজ সেরেছে সেই একইরকমভাবে—এক্ষেত্রে শুধু পাঁচিল ডিঙিয়ে জাল কেটে বাইরে থেকে বাড়িতে ঢোকার ব্যাপারটুকু বাদ দিতে হবে।
তবে খুনি বাইরের লোক হোক কিংবা ভেতরের লোক, নিলয় মজুমদারের মাথায় বসানোর জন্য ব্লান্ট ইনস্ট্রুমেন্টটা সে সঙ্গে করে নিয়েই নিলয়বাবুর ঘরে ঢুকেছিল। কারণ, ঘরের মধ্যে ওরকম কোনও হাতিয়ার পাওয়া যাবে কি না সে-বিষয়ে সে নিশ্চিত ছিল না।
