উত্তরে এসিজির দিকে কয়েকসেকেন্ড স্থির নজরে তাকিয়ে রইলেন টুনি।
এসিজি হঠাৎই ভাবলেন, টুনি ওর চার্মের স্পেল দিয়ে এসিজিকে হিপনোটাইজ করতে চাইছেন কি না। সন্দেহ নেই, অশোকচন্দ্র যথেষ্ট বৃদ্ধ এবং এসব চার্ম-টার্ম-এর রিং-এর বাইরে চলে গেছেন বহুবছর। কিন্তু তবুও ওঁর নজরটা যেন কেমন-কেমন—কোথাও যেন একটা গোপন নষ্টামির ছোঁয়া লেগে আছে।
‘শ্বশুর হিসেবে কেমন ছিলেন জানতে চাইছেন?’ চোখ সরু করলেন টুনি : ‘উনি শ্বশুর ছিলেন না—উনি ছিলেন মহা-শ্বশুর।’
ওঁর কথা বলার ঢঙে যথেষ্ট ঘেন্না এবং বিরক্তির উপাদান টের পেলেন বৃদ্ধ গোয়েন্দা। ওর মনে হল, নিলয় মজুমদারের জন্য এঁদের কারও মনেই বোধহয় একফোঁটা ভালোবাসা কিংবা শ্রদ্ধা ছিল না।
‘মহা-শ্বশুর মানে?’ এসিজি শব্দটার মর্মার্থ বুঝতে চাইলেন।
‘যা মানে, তাই…।’ একটু বাঁকা সুরে মন্তব্য করলেন টুনি।
রঘুপতি এসিজির দিকে তাকাল। যার মানে, ভদ্রমহিলার এই বাঁকা কথার স্টাইলকে সবক শেখাতে রঘুপতি ওর নিজস্ব স্টাইলে কোনও স্টেপ নেবে কি না।
অশোকচন্দ্র গুপ্ত চোখের ইশারায় রঘুপতিকে শান্ত থাকতে বললেন। তারপর টুনির দিকে সরাসরি চোখ রেখে জানতে চাইলেন, ‘শ্বশুরমশাইয়ের সঙ্গে আপনার রিলেশান কেমন ছিল?’
‘ভালো—বিকজ সেরকম কোনও রিলেশানই তো ছিল না যে খারাপ-টারাপ হবে। আমার বুটিক দেখতে আসার জন্যে বহুবার ওঁকে ইনভাইট করেছিলাম, কিন্তু ওঁর টাইম হয়নি। আমার বুটিকে যেসব ড্রেস আমি ডিসপ্লে করি সেগুলোর মেটিরিয়াল আর ডিজাইন দেখলে আপনি স্টানড হয়ে যাবেন। বড়-বড় ব্র্যান্ডের ডিজাইনার ড্রেসও আমার বুটিকের আইটেমের কাছে হার মেনে যাবে। আমাদের ইউ. এস. পি. কী জানেন? আমরা…।’
এসিজি আর বাধা না দিয়ে পারলেন না। বললেন, ‘প্লিজ, ম্যাডাম, এখন আমার ”শিবের গীত” শোনার সময় নেই। পরে কখনও শুনব…।’
‘ ”শিবের গীত” মানে?’ টুনির ভুরু কুঁচকে গেল।
‘ও আপনি বুঝবেন না—’ এসিজি হাসলেন। তারপর : ‘আচ্ছা, বলুন তো, নিলয়বাবুকে কে বা কারা এরকম নৃশংভাবে মার্ডার করতে পারে?’
টুনি মজুমদার উত্তরটা ভাবার জন্য এতটুকুও সময় নিলেন না। ফস করে বলে উঠলেন, ‘যে-কেউ খুন করতে পারে। ওনার বিহেভিয়ার এত খারাপ ছিল যে আর বলার নয়। মানুষকে মানুষ বলে মনে করতেন না—বলতে গেলে জন্তুর মতো ব্যবহার করতেন। শাশুড়ি-মা চলে যাওয়ার পর থেকে ওনার ব্যবহার একেবারে যা-তা হয়ে গেছে…।’
এসিজি কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। ঘরের দেওয়ালে টাঙানো নিলয় মজুমদারের ফোটোগুলোর ওপরে চোখ বোলালেন একবার। তারপর : ‘আচ্ছা, মিসেস মজুমদার, নিলয়বাবুর মার্ডারার কি বাইরে থেকে পাঁচিল ডিঙিয়ে আসতে পারে বলে আপনার মনে হয়?’
টুনি পোশাকের ভাঁজ ঠিক করতে-করতে নির্লিপ্ত গলায় জবাব দিলেন, ‘আসতে পারে—অবশ্যই আসতে পারে। আমাদের বাড়ির বাউন্ডারি ওয়ালটা যেরকম শর্ট হাইটের! আমার তো মনে হয় এটা একটা স্ট্রং পসিবিলিটি…।’
একটু থেমে টুনি আবার মুখ খুললেন, ‘স্যার, আপনার নামটা কী যেন বললেন?’
অশোকচন্দ্র একটা বিরক্তির শ্বাস ফেলে বললেন, ‘অশোকচন্দ্র গুপ্ত…।’
‘তো হ্যাঁ, অশোকস্যার, এই যে-ড্রেসটা আমি পরে আছি, এটা আমার নিজের ডিজাইন করা। দারুণ হয়েছে না? এটা আসলে…।’
ওঁর বকবকানি চলতেই লাগল।
এসিজির ধৈর্যের জন্য রঘুপতি ওঁকে খুব শ্রদ্ধা করে। কিন্তু সেই এসিজি টুনি মজুমদারের সঙ্গে কথা বলতে-বলতে হঠাৎই ধৈর্য হারালেন এবং কথাবার্তার চ্যাপ্টার আচমকাই ক্লোজ করলেন।
টুনি চলে যাওয়ার পর রঘুপতি ঠাট্টার সুরে ওর প্রাক্তন স্যারকে বলল, ‘স্যার, ইয়ে আনোখা এক্সপিরিয়েন্স আপকো ক্যায়সা লগা?’
এসিজি হেসে বললেন, ‘লাজবাব।’ তারপরই মাথা পিছনে হেলিয়ে ঘাড়ের কাছে ঝুলে পড়া চুলের গোছায় টান মেরে বললেন, ‘রঘুপতি, এবারে লাস্ট চ্যাপ্টারের জন্যে তৈরি হও। ও. সি. সাহেবকে এ-ঘরে ডেকে নাও। আমরা তিনজন এই মার্ডার মিস্ট্রির সলিউশান নিয়ে ডিসকাস করব। তারপর ঠিক করব কী করে মার্ডারারকে ট্র্যাপ করব…আর সবার শেষে এই ঘরে ডেকে নেব চারজন সাসপেক্টকে—তনয় মজুমদার, টুনি মজুমদার, প্রজেন বসু রায় আর সাবি, মানে সাবিত্রীকে।’
‘সাবিত্রীও সাসপেক্ট, স্যার?’
‘অবশ্যই। ও কারও সঙ্গে হাত মিলিয়ে এ-কাজটা করে থাকতে পারে। এ দুনিয়ায় ইমপসিবল বলে কিছু নেই, রঘুপতি…।’
‘ও. কে., স্যার—আমি হকসাহেবকে ডেকে নিয়ে আসছি। বাট সত্যিই কি এটা লাস্ট চ্যাপ্টার?’
‘আমরা তো তাই মনে হচ্ছে…।’
একটু হেসে রঘুপতি যাদব ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
ঘড়ির কাঁটা সাড়ে চারটের ঘর ছাড়িয়ে পাঁচটার দিকে গড়িয়ে চলেছে। আকাশে এত মেঘ জমেছে যে, সূর্যের আলো এর মধ্যেই মলিন হয়ে চারপাশে সন্ধ্যার আঁধার নেমে এসেছে। এর আগে দু-একপশলা বৃষ্টি হয়ে গেছে, তবে এখন মনে হয় মুষলধারে বৃষ্টির আয়োজন চলছে। একবার শুরু হলেই সবকিছু ভাসিয়ে দেবে।
রঘুপতি বেশ কয়েকবার তাড়া দিলেও অশোকচন্দ্র কাজ সেভাবে সংক্ষেপ করতে পারেননি। শেষ পর্যন্ত বাড়ির লোকের তদারকিতে এসিজিরা চারজন স্যান্ডউইচ ইত্যাদি দিয়ে ‘ওয়ার্কিং লাঞ্চ’ জাতীয় ব্যাপারটা সেরে নিয়েছেন।
নিলয়বাবুর বেডরুমের সবক’টা আলো জ্বেলে দেওয়া হয়েছে। ঘরের একমাত্র টেবিলকে ঘিরে তিনটে চেয়ারে বসে আছেন অশোকচন্দ্র গুপ্ত, নিজামুল হক, আর রঘুপতি যাদব। এসিজি বসেছেন মাঝখানের চেয়ারে, বাকি দুজন ওঁর দুপাশে। এসিজি শান্ত দৃষ্টিতে ঘরের বাকি চারজনকে পালা করে লক্ষ করছিলেন।
