রঘুপতি প্রজেনের হাতের দিকে দেখছিল। শিরা বের করা শক্তসমর্থ হাত। এ-হাতে শক্তির কোনও ঘাটতি নেই।
এসিজি প্রজেনকে জিগ্যেস করলেন, ‘খুনের দিন রাতে আপনি মিস্টার মজুমদারের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন। তখন তিনি মহাভারত পড়ছিলেন…।’
‘হ্যাঁ, আমাকে উনি দেখা করতে বসেছিলেন। তনয়ের ঘরে বসে আমরা তখন কল ব্রে খেলছিলাম। খেলার মাঝেই আমি দশ মিনিট সময় চেয়ে উঠে যাই। বাট উনি তখন বিজি ছিলেন—ওই রামায়ণ বা মহাভারত কিছু একটা পড়ছিলেন। তাই আমি আর ডিসটার্ব করিনি। যা খ্যাঁচখেঁচে পাবলিক!’
প্রজেনকে আর কিছু জিগ্যেস করার ছিল না। এসিজি ওঁর দিকে তাকিয়ে মনে-মনে কিছু একটা হিসেব কষছিলেন।
‘আমি কি এবার যেতে পারি?’ প্রজেন জিগ্যেস করলেন।
‘হ্যাঁ, হ্যাঁ—অবশ্যই যেতে পারেন।’
‘থ্যাংক ইউ—’ বলে প্রজেন উঠে দাঁড়ালেন। রঘুপতি যাদবের দিকে একবার ঠান্ডা চোখে তাকিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। যেতে-যেতে ডানকানে ইয়ার প্লাগটা আবার গুঁজে নিলেন।
বেলা যে অনেক বেড়েছে সেটা বোঝা যাচ্ছে না মেঘের জন্য। এখন জানলার বাইরে তাকালে ঝিরঝিরে বৃষ্টিও চোখে পড়ছে।
রঘুপতি মাথার ওপরে ঘুরে চলা সিলিং ফ্যানটার দিকে একবার তাকাল। ‘ওর বোধহয় গরম লাগছে,’ এসিজি ভাবলেন।
নিজামুল হকসাহেব দরজায় এসে উঁকি দিলেন। জিগ্যেস করলেন, ‘কী, সার, কতদূর? বসে-বসে তো বোর হয়ে গেলাম—।’
এসিজি পালটা হেসে বললেন, ‘মনে হয় ব্যাপারটা একটু-একটু ধরতে পেরেছি। আসলে লকড রুম পাজলটা সলভ করার পরই আসল সলিউশানটা আবছাভাবে সামনে চলে এসেছে।’
রঘুপতি উত্তেজিত হয়ে জানতে চাইল, ‘সচমুচ, স্যার?’
এসিজি পকেট থেকে সিগারেট বের করে একটা ধরালেন। ধোঁয়া ছেড়ে বললেন, ‘টুনি মজুমদারের সঙ্গে একটু কথা সেরে নিই, তারপর তোমাদের বলব বন্ধ ঘরের পাজলের সলিউশান। তারপর মার্ডারারকে জালে তোলা তোমার আর ও. সি.-সাহেবের কাজ।’
নিজামুল হক হেসে বললেন, ‘শয়তানটার দিকে একবার ইশারা করেই দেখুন না, সার। জালে তুলে এমন মেডিসিন দেব যে, গড়গড় করে সব উগরে দেবে। তার ওপরে ইনস্পেকটর যাদববাবুও তো রয়েছেন…।’
রঘুপতি বলল, ‘স্যার, একটু জলদি করুন—অলরেডি দুটো বেজে গেছে। খিদেয় পেট চোঁচোঁ করছে।’
‘বুঝতে পারছি, রঘুপতি। বাট আর-একটু—বড়জোর হাফ অ্যান আওয়ার কি ওয়ান আওয়ার…প্লিজ!’
সিগারেটে পরপর তিনটে টান দিয়ে সেটা টেবিলের পায়ায় ঘষে নিভিয়ে দিলেন এসিজি। কারণ, টুনি মজুমদার এখুনি আসবেন। কোনও মহিলার সামনে স্মোক করাটা শিষ্টাচার নয়।
নিভে যাওয়া সিগারেটটা নিয়ে এসিজি উঠে গেলেন জানলার কাছে। গ্রিলের ফাঁক দিয়ে ফেলে দিলেন বাগানে।
রঘুপতি মিসেস মজুমদারকে খবর দেওয়ার জন্য নিজামুলকে রিকোয়েস্ট করল। হকসাহেব চোখ মটকে হেসে চলে গেলেন।
একটু পরে টুনি মজুমদার যখন এলেন তখন হকসাহেবের চাউনি এবং হাসির মানে বোঝা গেল।
টুনি মজুমদার লাল, সবুজ এবং হলুদ রঙের গডি কম্বিনেশনের একটা পাতিয়ালা চুড়িদার পরেছেন। তার সঙ্গে চড়া দাগের সাজগোজ। সব মিলিয়ে আপাদমস্তক মেকাপ এবং ফ্যাশনের চলমান বিজ্ঞাপন। এই ঘোর দুপুরে যে এরকম উৎকট সাজগোজ করে বাড়িতে ঘোরাঘুরি করা যায় সেটা এসিজি কিংবা রঘুপতির আগে জানা ছিল না। অবশ্য এও হতে পারে যে, এ-ঘরে ডাক পাওয়ার জন্য উনি সাজগোজ করে তৈরি হচ্ছিলেন। সাজগোজ ছাড়াও পারফিউমের উৎকট গন্ধে এসিজিদের দম বন্ধ হয়ে এল।
টুনির আবির্ভাবের প্রথম ধাক্কাটা সামলে নিয়ে এসিজি ওঁকে বসতে বললেন। লক্ষ করলেন, রঘুপতির ভুরু কুঁচকে গেছে। এবং সেই অবস্থাতেই ও ফ্রিজ শট হয়ে আছে।
রঘুপতি টুনিকে সবার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিল।
টুনি মজুমদারের বয়েস বত্তিরিশ কি তেত্তিরিশ হবে। কিন্তু সাজগোজ আর হাবভাবে কচি সেজে থাকার প্রাণপণ চেষ্টা বেশ নজরে পড়ছে।
রঘুপতির দেওয়া ফাইল খুঁটিয়ে পড়ে এসিজি টুনি মজুমদার সম্পর্কে যেটুকু বুঝেছেন সেটা হল, এই ফ্যাশনদুরস্ত মহিলা মজুমদারবাড়ির সাতেও নেই, পাঁচেও নেই, এমনকী সাত আর পাঁচের যোগফল বারোতেও নেই।
পুলিশের যে-কোনও কোশ্চেনের উত্তরে ওঁর স্ট্যান্ডার্ড রেসপন্সগুলো হল : ‘জানি না’, ‘দেখিনি’, ‘শুনিনি’ আর ‘মনে নেই’। সত্যি, তিন বানরকে হার মানানোর মতো।
ভদ্রমহিলা অকারণে নিজের বুটিক নিয়ে বকবক করে যাচ্ছিলেন। এ-বাড়ির মালিক নিলয় মজুমদার নামের মানুষটা যে বাইশ দিন আগে ব্রুটালি মার্ডারড হয়ে গেছে সেটা যেন ওঁর মাথাতেই কখনও ঢোকেনি। এই ভদ্রমহিলাকেই এসিজির সবার সেরা ব্লান্ট ইনস্ট্রুমেন্ট বলে মনে হল। তনয় মজুমদার এই অদ্ভুত ‘জিনিস’-টিকে নিয়ে কী করে দিনের পর দিন কাটাচ্ছেন সেটা ভেবে এসিজি শিউরে উঠলেন।
টুনি মজুমদারের কাছ থেকে সেরকম কোনও তথ্য পাওয়া গেল না। শুধু এটুকু জানা গেল যে, দিনের বেশিরভাগ সময়টাই তিনি বাইরে ব্যস্ত থাকেন। এত ব্যস্ত যে, তনয়ের সঙ্গে ওঁর দেখা-সাক্ষাৎ বা কথাবার্তা খুবই কম হয়। নেহাত একই বাড়িতে থাকেন বলে দেখা হয়। আর রোজ রাতে তিনি তনয় এবং প্রজেনবাবুর সঙ্গে তাস খেলতে বসেন। তখনই যেটুকু আড্ডা, হুল্লোড় কিংবা কথাবার্তা হয়।
এসিজি জানতে চাইলেন, নিলয় মজুমদার শ্বশুর হিসেবে কেমন ছিলেন।
