তনয় আর প্রজেন মিলে ‘নিলয় কনস্ট্রাকশনস’-এর কাজ দেখত। তবে নিলয়ের কাছ থেকে গ্রিন সিগন্যাল না নিয়ে কোম্পানির একটি কাজও করা যেত না।
‘বাবা ব্যবসা ছেড়েও দেবেন, আবার ছেড়েও দেবেন না।’
এটা একটা দম আটকানো অবস্থা ছিল। প্রজেন আর তনয় বলতে গেলে রোজ পালা করে নিলয়ের হাতে অপমানিত হতেন।
না, খুনি ধরা পড়ল কি পড়ল না এ নিয়ে তনয়ের কোনও ইন্টারেস্ট নেই। তনয়ের কথার ভঙ্গিতে ওঁকে বেশ বিরক্ত বলে মনে হল।
খুনের দিন রাতে নিলয় মজুমদার দুবার মহাভারত পড়েছিলেন কেন সে ব্যাপারে তনয়ের কোনও আইডিয়া নেই। তবে একই অংশ দুবার পড়েছেন শুনে তনয় একটু অবাক হল। তারপর তেতো হেসে বলল, ‘বাবার খেয়াল! এ নিয়ে কোনও কথা বলা যাবে না। হি ওয়জ দ্য বস।’
তনয় মজুমদার চলে যাওয়ার পর রঘুপতি প্রজেন বসু রায়কে খবর পাঠাল।
এমন সময় রঘুপতির মোবাইল ফোনে সুরেলা মিউজিক বেজে উঠল : ফোন এসেছে। রঘুপতি পকেট থেকে ফোনটা বের করে স্ক্রিনের দিকে তাকাল। ওর এক জুনিয়ার সহকর্মীর ফোন। বসুমিত্র জানা।
রঘুপতি কলটা রিসিভ করে বলল, ‘হ্যালো, জানা—আমি আজ একটা স্পেশাল ইনভেস্টিগেশানের কাজে নিউ আলিপুরে এসেছি। একটু বিজি আছি। কাল অফিসে গিয়ে তোমার সঙ্গে ডিসকাস করি?’
ওপাশ থেকে বসুমিত্র জানা কী বললেন সেটা শোনা গেল না। তবে রঘুপতি বারদুয়েক মাথা নাড়ল। শেষে ‘ও. কে.’ বলে রিসেট বোতাম টিপে দিল।
অশোকচন্দ্র গুপ্ত রঘুপতির মোবাইল ফোনটার দিকে তাকিয়ে ছিলেন। আধুনিক ডিজাইনের স্মার্টফোন। রঘুপতি অল্পসল্প শৌখিন মানুষ।
হঠাৎই এসিজি উত্তেজিত হয়ে রঘুপতিকে কী একটা বলতে গেলেন, কিন্তু প্রজেন বসু রায় ঘরে ঢুকে পড়ায় নিজেকে সামলে নিলেন।
প্রজেনের চেহারা লম্বা-চওড়া, রোদে জলে পোড় খাওয়া। বয়েস চল্লিশের খারাপ দিকে। রগের কাছে চুলে পাক ধরেছে। মাথায় কোঁকড়া চুল, চোখা নাক, চোখে চশমা, হাতে বেশ বড় মাপের মোবাইল ফোন। সেটা থেকে একটা তার বেরিয়ে ওঁর ডানকানে গিয়ে ঢুকেছে। অন্য কানের ফুটোটা দয়া করে খোলা রয়েছে এসিজিদের কথা শোনার জন্য।
প্রজেনের গায়ে গোলাপি রঙের একটা রাউন্ড নেক টি-শার্ট, পায়ে পাজামা আর প্যান্টের মাঝামাঝি একটা ক্যাজুয়াল উইয়্যার।
ওঁর হাবভাব অথবা চোখের দৃষ্টিতে কেমন যেন একটা উদ্ধত মাত্রা আছে।
এসিজি প্রজেনকে বসতে বললেন। আড়চোখে খেয়াল করলেন, রঘুপতির চোখে-মুখে একটা অপছন্দ অথবা বিরক্তির ছাপ।
ফাইলে দেখা ফোটোগ্রাফের সঙ্গে প্রজেন বসু রায়ের চেহারা মিলে গেলেও এই উদ্ধত ভাবভঙ্গিটা ফোটোগ্রাফে ধরা পড়েনি।
প্রজেন চেয়ারে বসে বললেন; ‘এতদিন পরে আবার পুলিশ! বলুন কী বলবেন।’
রঘুপতি বলল, ‘পহেলে কান কা তার খোল লিজিয়ে…।’
প্রজেন একটু অবাক হয়ে রঘুপতির দিকে তাকালেন। ভুরু কুঁচকে গেছে। প্রশ্ন জেগে উঠেছে ওঁর চোখে, যার অর্থ ‘হু দ্য হেল আর ইউ?’
রঘুপতি অশোকচন্দ্র গুপ্তর পরিচয় দিল। তারপর নিজের পরিচয় দিল : ‘ইনস্পেকটর রঘুপতি যাদব। হোমিসাইড স্কোয়াড, লালবাজার। নাউ টেক দ্য ব্লাডি ইয়ার প্লাগ অফ।’
কথার সুরে এসিজি বুঝলেন, রিখটার স্কেলে রঘুপতির টেম্পার চড়ছে।
এসিজি তাড়াতাড়ি প্রজেনকে বললেন, ‘ইনস্পেকটর যাদবের ধৈর্য খুব কম। কানের ছিপিটা জলদি খুলে ফেলুন…নইলে রঘুপতি ওটা টান মেরে খুলে দেবে। সেটা আপনার ভালো লাগবে না।’
এ-কথায় প্রজেন কেমন যেন ঘাবড়ে গেলেন। তাড়াতাড়ি ইয়ার প্লাগটা খুলে ফেললেন।
প্রজেনের স্টেটমেন্ট এবং ইনটারোগেশানের ট্রানস্ক্রিপশান এসিজি রঘুপতির দেওয়া ফাইল থেকে পড়েছেন। খুনের দিন রাতে প্রজেনও সেরকম কিছু দেখেননি বা শোনেননি।
সত্যি, এঁদের সবারই অবস্থা সেই বিখ্যাত তিনটি বানরের মতো : একজনের চোখে হাত চাপা দেওয়া, একজনের ঠোঁটের ওপরে, আর একজনের দু-কানে আঙুল গোঁজা।
এসিজি প্রজেনকে জিগ্যেস করলেন, ‘আপনি তো ”নিলয় কনস্ট্রাকশনস”-এর ম্যানেজার এবং টুয়েন্টি পারসেন্টের পার্টনার…?’
প্রজেন চুপ করে রইলেন।
‘কী, কিছু বলুন…।’
‘এটা কি কনফার্ম করতে হবে নাকি? আগে তো বহুবার বলেছি যে, হ্যাঁ।’
‘আপনি যে এই মজুমদার বাড়িতে থাকেন তাতে আপনার অস্বস্তি হয় না, খারাপ লাগে না?’
‘কেন? খারাপ লাগবে কেন? এটা তো আমার রাইট—অধিকার। কেন, আপনারা জানেন না, আমার বাবা ব্রজেন বসু রায় কী ভাবে অ্যাক্সিডেন্টে মারা গেছেন? এবং হু ওয়জ রেসপনসিবল ফর দ্যাট ব্লাডি অ্যাক্সিডেন্ট?’
‘এখন তো নিলয় মজুমদার মারা গেছেন। হি ডায়েড ভায়োলেন্টলি।’ একটু চুপ করে রইলেন এসিজি। তারপর : ‘এখন আপনি কী করবেন ভাবছেন? এ-বাড়িতে থাকার ব্যাপারটা কনটিনিউ করবেন, নাকি অন্য কোনও অ্যারেঞ্জমেন্টের কথা ভাবছেন?’
‘হঠাৎ এ-কথা জিগ্যেস করছেন? অন্য কোনও অ্যারেঞ্জমেন্টের কথা ভাবতে যাব কেন? এখন তো এ-বাড়িটা অনেক বেশি পিসফুল। সবচেয়ে বাজে লোকটাই তো চলে গেছে।’
‘এভাবে কথা বলাটা কি ঠিক হচ্ছে? একজন বয়স্ক রেসপেক্টেবল মানুষ…ওরকম ব্রুটালি খুন হয়ে গেলেন…।’
‘অনেক আগেই ওঁর ব্রুটালি খুন হওয়া উচিত ছিল। আর রেসপেক্টেবল! রেসপেক্ট মাই ফুট! আপনি জানেন, নিলয়বাবু ডেইলি বেসিসে আমাকে কী রেটে ইনসাল্ট করতেন? ছোট-বড় যে-কোনও কাজ করতে গেলেই ওঁর কাছ থেকে আগে পারমিশান নিতে হত!’
