মহাভারত পড়া শেষ হয়ে গেলে সাবিত্রী বারান্দার আলো নিভিয়ে শুয়ে পড়ে। তখন ও তিনতলা থেকে কথাবার্তা হইচই শুনতে পাচ্ছিল। ছোটদাদাবাবুরা তিনজনে মিলে তাস খেলছিলেন। রোজ রাতে ওঁরা তাসের আসর বসান। কল ব্রে না কী যেন খেলেন। খেলা অনেক রাত পর্যন্ত চলে।
হয়তো এভাবে ঘণ্টাখানেক বড়জোর কেটেছিল, তারপরই সাবির হঠাৎ ঘুম ভেঙে যায়। ওর মনে হল কে যেন ওকে ডাকল। ঘুম চটে গিয়ে ও শুনতে পায়, দাদুবাবা মহাভারত পড়ছেন এবং ওই পাশা খেলার জায়গাটাই আবার পড়ছেন।
সাবিত্রীর ব্যাপারটা বেশ অদ্ভুত লাগে। কিন্তু ও ধরে নেয় যে, ওটা খিটখিটে বুড়োর অদ্ভুত খেয়াল। ও আধোঘুমে মহাভারত শুনতে থাকে।
আলো নেভালেও বারান্দাটা কখনও তেমন অন্ধকার হয় না, কারণ, এদিক-সেদিক থেকে রাস্তার কমলা রঙের আলো ছিটকে এসে দেওয়ালে পড়ে। সেই আবছা আলোয় সাবিত্রী হঠাৎ খেয়াল করে, ‘নতুন দাদাবাবু’—মানে, প্রজেন বসু রায়—দাদুবাবার দরজার কাছে দাঁড়িয়ে আছেন, দরজায় নক করবেন কি না ভাবছেন।
সাবি যে জেগে গেছে সেটা বুঝতে পেরে তিনি আপনমনেই বলেন, ‘না বাবা, এখন স্যারকে ডিসটার্ব করে লাভ নেই। হয়তো ব্যাপক চটে গিয়ে চেঁচামেচি করে বাড়ি একেবারে মাথায় তুলবেন…। যাই, তাস খেলায় বসি গিয়ে। যা বলার কাল বলব’খন…।’
এই কথা বলতে-বলতে প্রজেন বসু রায় চলে যান।
তখনও মহাভারত পড়া চলছিল। একটু পরেই হাঁচির শব্দ শুনতে পায় সাবি। ও ভাবছিল, দাদুবাবা এই বোধহয় ওকে ডাকবেন, হাঁচি-কাশির ওষুধ দিতে বলবেন।
কিন্তু না, দাদুবাবা ওকে ডাকেননি।
এরপর সাবিত্রী ঘুমিয়ে পড়েছিল। তারপর সকালবেলা…।
প্রজেন বা তনয় ব্যবসার নানান কাজে প্রায়ই নিলয়বাবুর ঘরে আসতেন। কারণ, ওঁকে জিগ্যেস না করে কোনও ডিসিশন নিলে উনি ভীষণ রেগে যেতেন। মুখে যা আসে তাই বলে অপমান করতেন। তাই প্রজেন এবং তনয় সবসময় খুব চাপে থাকতেন।
সেদিন রাতে ওঁরা দুজনে যে দাদুবাবার সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলেন সেটা সাবি পুলিশকে প্রথমেই জানিয়েছিল। পুলিশের রিপোর্টে সে-কথা লেখা আছে। যেটা নেই সেটা হল দুবার মহাভারত পড়ার পিকিউলিয়ার ব্যাপারটা।
এসিজি সেটা নিয়েই একটু ভাবছিলেন।
রঘুপতি আড়চোখে স্যারের দিকে তাকাল। লক্ষ করল, স্যারের ভুরু কুঁচকে গেছে। শূন্য নজরে তাকিয়ে আছেন একটা জানলার দিকে।
সাবিত্রীর আর কিছু বলার ছিল না। তাই এসিজি ওকে বললেন, ‘এবারে তুমি এসো, সাবি—।’
সাবিত্রী চলে গেল। যাওয়ার আগে প্লেটগুলোর দিকে ইশারা করে বলে গেল, ‘সব খেতে হবে কিন্তু—।’
‘গুপ্তাসাব, কিছু বোঝা গেল?’ রঘুপতি আলতো গলায় জিগ্যেস করল।
‘হুঁ..’ আনমনাভাবে বললেন এসিজি, ‘কিছু-কিছু তো বোঝা গেল অবশ্যই।’
একটু পরে বললেন, ‘আচ্ছা, রঘুপতি, একটা ব্যাপার তুমি নোট করেছ?’
‘কী, স্যার?’
‘এই মার্ডার কেসটায় বড্ড বেশি ক্লু। আর তার সঙ্গে আনন্যাচারাল সব কাণ্ড।’
‘মতলব?’
‘মতলব, রঘুপতি, টু মেনি ক্লুজ। টু মেনি পয়েন্টার্স। দ্যাখো, প্রথমেই হচ্ছে, মালটিপল মার্ডার মিনস : গলায় ফাঁস দেওয়া, আর তার সঙ্গে মাথার পেছনে ভারী কিছু দিয়ে জোরে হিট করা। অথচ নিলয়বাবু ওয়জ অ্যান ওল্ড ম্যান—চুয়াত্তর বছর বয়েস ছিল ওঁর। তারপর, রাবার স্ট্রিপটা ডেডবডির গলায় শক্ত করে এঁটে রইল, বাট ব্লান্ট ইনস্ট্রুমেন্টটা মার্ডারার সঙ্গে নিয়ে চলে গেল। নেক্সট হচ্ছে, লকড রুম মিস্ট্রি। একটা দরজা ভেতর থেকে ছিটকিনি আঁটা, আর অন্য দরজাটা বাইরে থেকে হাঁসকল এঁটে তাতে প্যাডলক ঝোলানো—সেই প্যাডলকের চাবি আবার নিলয়বাবুর বিছানায়। ঘরের তিনটে জানলাতেই গ্রিল দেওয়া এবং জানলার স্লাইডিং গ্লাস উইন্ডো ঘরের ভেতর দিকে থেকে আটকানো। নিলয় মজুমদারের আলমারি খোলা, কিন্তু কিছু খোয়া যায়নি। শুধু আলমারি থেকে তিনটে টুপি নিয়ে খুনি বাইরের বাগানে ছুড়ে ফেলে গেছে।
‘এসবের মানে কী, রঘুপতি? এতগুলো ব্যাপারকে আমরা যুক্তি দিয়ে সাজিয়ে কোরিলেট করব কেমন করে? তার ওপর তো সাবিত্রীর বলা পিকিউলিয়ার ব্যাপারটা আছেই। নাঃ, কিছু একটা উত্তর বের করতেই হবে।’ চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন এসিজি। মাথার পিছনের সাদা চুলের গোছা ধরে কয়েকবার টান মারলেন। মাথা ঝুঁকিয়ে ঘরের মধ্যে পায়চারি করতে লাগলেন।
রঘুপতি ওর প্রাক্তন স্যারের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। তারপর হাতঘড়ির দিকে একপলক চোখ রেখে স্যারকে জিগ্যেস করল, ‘স্যার, তনয় মজুমদারকো বুলায়ে কেয়া?’
‘হ্যাঁ, ডাকো—।’
তনয় মজুমদার নিলয়ের ঘরে এলেন মিনিট-পাঁচেক পরেই। সকালে যে-পোশাক পরে তিনি এসিজিদের মুখোমুখি হয়েছেন এখনও সেই পোশাকই পরে আছেন।
তনয় থিতু হয়ে বসার পর এসিজি বললেন, ‘সবকথাই তো পুলিশকে আপনি বলেছেন। সেসব রিপোর্ট আমি দেখেছি। আপনার নতুন কিছু বলার থাকলে বলুন…।’
‘নতুন কথা আর কী বলব!’ একটা লম্বা শ্বাস ফেলে তনয় বললেন। ওঁর কিছু জানা নেই, আর কে ওঁর বাবাকে খুন করতে পারে সে-বিষয়ে ওঁর কোনওরকম ধারণাও নেই। খুনটা যে-সময়ে হয়েছে বলে পুলিশের আইডিয়া, সেসময়ে তিনি তাস খেলায় বিজি ছিলেন। ওই তাসই ওঁর একমাত্র নেশা।
বাইরে থেকে কেউ এসে নিলয়বাবুকে খুন করতে পারে কি না, এ-প্রশ্নের জবাবে তনয় বলেছেন, এ-বাড়ির বাউন্ডারি ওয়ালটা খাটো। বাইরে থেকে কোনও আততায়ী সহজেই পাঁচিল ডিঙিয়ে বাড়িতে ঢুকে পড়তে পারে। না, নিলয়ের কোনও শত্রু ছিল বলে ওঁর জানা নেই। তবে নিলয় খুব মাথাগরম রগচটা মানুষ ছিলেন। হয়তো নিজের ব্যবহারের জন্য কোনও শত্রুর জন্ম দিয়ে থাকতে পারেন।
