‘আঃ, রঘুপতি, ডোন্ট বি ইমপেশেন্ট। আমি বুড়ো মানুষ। ওঁদের সঙ্গে একটু বকবক করতে ইচ্ছে হয়েছে তো করি না কেন?’
স্যারের কথায় রঘুপতি তিনটে চেয়ার আর একটা টেবিলকে বেডরুমের একদিকে সাজিয়ে নিল। তারই একটা চেয়ারে বসে স্যার প্রাক্তন ছাত্রকে জিগ্যেস করলেন, ‘আচ্ছা, মার্ডার ওয়েপন—মানে, ব্লান্ট ইনস্ট্রুমেন্টটা পুলিশ এখনও ট্রেস করতে পারেনি, না?’
‘না, স্যার—উও আভি তক মিলা নেহি।’ রঘুপতির গলায় হেরে যাওয়া সুর। ও একটু আনমনাভাবে একটা চেয়ার টেনে নিয়ে স্যারের পাশে বসে পড়ল।
‘অদ্ভুত ব্যাপার!’ আপনমনেই বললেন এসিজি, ‘রাবারের ফিতেটা নিলয়বাবুর গলায় এঁটে বসে রইল, অথচ মাথা ক্রাশ করার অস্ত্রটা খুনি সঙ্গে করে নিয়ে চলে গেল…!’ বৃদ্ধ মাথা নাড়লেন এদিক-ওদিক।
‘কিন্তু নিয়ে গিয়ে ওয়েপনটা সে লুকোবে কোথায়?’
‘গাছের পাতা লুকোনোর সেরা জায়গা হল বাগান অথবা জঙ্গল।’ এসিজি হেসে বললেন, ‘বই লুকোনোর সেরা জায়গা হল লাইব্রেরি অথবা বইয়ের দোকান। একটা লোহার রড লুকোনোর ভালো জায়গা হল কনস্ট্রাকশন সাইট।’
‘আপনি কি বলতে চাইছেন ব্লান্ট ইনস্ট্রুমেন্টটা একটা লোহার রড? আর তনয় মজুমদার, প্রজেন বসু রায় এঁরা তো কনস্ট্রাকশনের কাজ করে…!’
‘আমি কিছুই বলতে চাইছি না, মাই ডিয়ার, রঘুপতি। আই অ্যাম ওনলি থিংকিং লাউডলি। যাকগে, তুমি মিস্টার তনয় মজুমদারকে একবার এ-ঘরে আসতে বলো—একটু কথা-টথা বলি…।’
রঘুপতি যাদব চেয়ার ছেড়ে উঠতে যাচ্ছিল, এমন সময় সাবিত্রী একটা ট্রে হাতে ঘরে ঢুকল। ট্রে-তে দু-কাপ কফি, আর দুটো প্লেটে বিস্কুট, সিঙ্গাড়া আর সন্দেশ।
কাপ-প্লেটগুলো ট্রে থেকে নামিয়ে টেবিলে সাজিয়ে দিল সাবিত্রী।
‘এগুলো আপনারা খেয়ে নেবেন, স্যার।’
এসিজি সাবিত্রীকে দেখছিলেন।
বেশ সুন্দর দেখতে। দেখে ‘কাজের মেয়ে’ বলে মনেই হয় না। মাঝারি গায়ের রং। চামড়া বেশ সজীব, তেলেতেলে। গোল মুখ। সিঁথিতে জ্বলজ্বল করছে সিঁদুর। চোখ দুটো জ্যান্ত—যেন কথা বলছে।
সাবিত্রী একটা হলদে চুড়িদার পরেছে—তার ওপরে ছাপা রয়েছে ছোট-ছোট সাদা আর কালো ফুল। ওর মাথার চুল বেশ ঘন আর কোঁকড়ানো। তাতে একটা লাল রঙের ‘বো’ লাগানো রয়েছে।
‘তুমি সাবিত্রী?’ এসিজি ওকে জিগ্যেস করলেন। রঘুপতির ফাইলে ওর ফোটো আগেই দেখেছিলেন। সত্যিই ছবির মতো মুখ।
‘হ্যাঁ, স্যার—’ সাবিত্রী এসিজির দিকে সরাসরি তাকিয়ে জবাব দিল। ওর মধ্যে সংকোচের কোনও ছায়া খুঁজে পাওয়া গেল না।
রঘুপতি ওকে বলল, ‘আমাদের সঙ্গে যে আরও দুজন এসেছেন…।’
‘হ্যাঁ, ওনাদেরকেও কফি, সিঙ্গাড়া এসব দিয়েছি। ওনারা ড্রয়িং-এ বসেছেন।’
‘সাবিত্রী, তুমি একটু বোসো—তোমার সঙ্গেই আগে কথা বলি।’
এসিজির কথায় সাবিত্রী সহজভাবে একটা চেয়ারে বসে পড়ল।
অশোকচন্দ্র সিঙ্গাড়ায় কামড় দিলেন এবং চুমুক দিলেন কফির কাপে।
রঘুপতিও ‘স্যার’-কে অনুসরণ করল। বিড়বিড় করে বলল, ‘পেট মে চুহা দওড় রহা থা…।’
খুনের দিন সন্ধে থেকে রাত্রি পর্যন্ত ঠিক কী-কী হয়েছিল সেটা এসিজি জানতে চাইলেন সাবিত্রীর কাছে।
উত্তরে সাবিত্রী যা-যা বলে গেল সেসব ইনস্পেকটর যাদবের ফাইলে আগেই পেয়েছেন অশোকচন্দ্র। তবুও ওর প্রতিটি কথা মনোযোগ দিয়ে শুনলেন।
সাবিত্রী বারান্দায় শুয়েছিল। খুন নিশ্চয়ই হয়েছে অনেক রাতে। তখন ও ঘুমিয়ে পড়েছিল। একবার ঘুমিয়ে পড়লে তারপর ওর আর কোনও হুঁশ থাকে না। সকালে উঠে দাদুবাবাকে ডাকাডাকি করে সাড়া না পেয়ে ও জানলার শার্সি দিয়ে উঁকি মারে। তখনই ওই ভয়ংকর দৃশ্য ও দেখতে পায়। বিছানায় একেবারে রক্তারক্তি কাণ্ড।
সাবিত্রী কথা বলতে-বলতে শিউরে উঠল।
‘তুমি কি এখনও ওই বারান্দাতেই শুচ্ছ?’ এসিজি জিগ্যেস করলেন, ‘তোমার ভূতের ভয় নেই?’
সাবি ঘাড় নেড়ে যেন লজ্জা পেয়ে হাসল : ‘হ্যাঁ, স্যার—ওখানেই শুই। আমার কোনওদিনই ভূত-পেতনির ভয়-টয় নেই। তা ছাড়া দাদুবাবা আমাকে খুব ভালোবাসত। আমি আগে বারান্দায় যেমন শুতাম, ওই মার্ডারের পর ছ’দিন শুইনি। পুলিশ বারণ করেছিল। তারপর থেকে আবার ওখানে শুই।’
‘আচ্ছা, সাবি, তুমি তো পুলিশকে সবই বলেছ…’ স্নেহময় বাবা যেভাবে মেয়ের সঙ্গে কথা বলে ঠিক সেই সুরে বলতে শুরু করলেন অশোকচন্দ্র, ‘এমন কিছু কি তোমার মনে পড়ছে যেটা তোমার একটু অদ্ভুত মনে হয়েছে? ভালো করে ভেবে দ্যাখো। এমন কোনও ব্যাপার যেটা স্রেফ এলেবেলে মনে হতে পারে, বাট পিকিউলিয়ার…।’
সাবি হেসে বলল, ‘ভালো করে ভাবতে হবে না, এমনিই মনে আছে। ব্যাপারটা তেমন কিছু নয় ভেবে পুলিশকে আর বলিনি। আপনি, স্যার, যখন জানতে চাইছেন তখন বলছি…।’
রাত্রি তখন ন’টা কি সওয়া ন’টা হবে। সাবি বারান্দায় শুয়ে রেস্ট নিচ্ছিল। হঠাৎ ও শুনতে পায় দাদুবাবা মহাভারত থেকে সুর করে পাঠ করছেন। চুপচাপ শুয়ে সেই পাঠ শুনতে বেশ লাগছিল। তারপর, যুধিষ্ঠির যখন দ্রৌপদীকে পাশা খেলায় বাজি ধরলেন তখন হঠাৎই দাদুবাবা পাঠ থামিয়ে দুবার হাঁচলেন, তারপর আবার পড়তে শুরু করলেন।
‘এবারে, স্যার, পিকুলিয়ার ব্যাপারটার কথা বলি…।’
একটা সময়ে দাদুবাবা মহাভারত পড়া শেষ করেছিলেন। তার পরপরই সাবি ছোটদাদাবাবুকে—মানে, তনয়কে—দাদুবাবার ঘর থেকে বেরিয়ে আসতে দ্যাখে। সাবির দিকে চোখ পড়তেই অপ্রস্তুতভাবে তনয় বলেন, ‘বাবা এখন ব্যস্ত। মহাভারত পড়ছেন। তার মাঝে ডিসটার্ব করলেই তো আবার খেপে যাবেন! যা-তা বলতে শুরু করবেন। যাকগে, পরে আসব’খন।’
