ভেতরের দৃশ্য অতি সাধারণ এবং স্বাভাবিক। আর-পাঁচটা আলমারি যেমন হয়! সবক’টা তাকে জামাকাপড় আর কাগজপত্র ঠাসা। তবে একটা তাকে দুটো সাহেবি হ্যাট চোখে পড়ল। নিলয় মজুমদারের হ্যাটের শখ ছিল।
এসিজি একটা সিগারেট ধরালেন। ধোঁয়া ছেড়ে খোলা আলমারির দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলেন। এরকমই তিনটে হ্যাট বাইরের বাগানে পাওয়া গেছে। হয়তো মার্ডারার ও-দুটো ছুড়ে দিয়েছে ওখানে। দোতলার বারান্দার মুখ থেকে টুপিগুলো ফ্রিসবির মতো ছুড়ে দিলে ওগুলো বাতাসে ভেসে ওই জায়গায় গিয়ে পড়তে পারে।
এসিজি আলমারির লকের কাছটা একবার দেখলেন। না, আলমারিটা মোটেই জোরজবরদস্তি করে খোলা হয়নি। যে খুলেছে সে চাবি দিয়েই খুলেছে। হয় খুনি, নয়তো নিলয়বাবু নিজেই। খুনি যদি খুলে থাকে তা হলে কেন খুলেছে সেটা বোঝা যাচ্ছে না—কারণ, বাড়ির লোকের কথামতো আলমারি থেকে কিছুই খোয়া যায়নি। তা ছাড়া খুনি যে সেখানে কিছু খুঁজেছে আলমারির তাকগুলোর চেহারা দেখে সেরকমটাও মনে হচ্ছে না।
আলমারি ছাড়া ঘরে রয়েছে তিনটে কাঠের চেয়ার, একটা টেবিল, আর একটা শো-কেস। সিগারেটের ধোঁয়া ছাড়তে-ছাড়তে সেগুলো বেশ খুঁটিয়ে দেখলেন অশোকচন্দ্র।
রঘুপতির দেওয়া ফাইলের কাগজ ঘেঁটেঘুঁটে আর সব দেখেশুনে বৃদ্ধ গোয়েন্দার মনে হল, নিলয় মজুমদার বেশ ভালোরকম বড়লোক ছিলেন এবং ভালোরকম কিপটে ছিলেন। তার সঙ্গে ছিল খিটখিটে মেজাজ এবং বসগিরির দাপট। এসব মানুষকে খুন করার মোটিভ অনেক সময় স্রেফ বিরক্তি আর ঘেন্না থেকে দানা বাঁধে। ফলে যাঁরা ওঁর ক্লোজ এবং সাফারার তাদেরই কেউ হয়তো এই জঘন্য কাজটা করেছে।
খুনি বাইরের লোক হওয়ার পসিবিলিটি যে একেবারে নেই তা নয়। কারণ, এ-বাড়ির চৌহদ্দির পাঁচিল যথেষ্ট খাটো। সেটা টপকে কারও পক্ষে ভেতরে ঢোকা মোটেই কঠিন নয়। কিন্তু তারপর? তাকে দোতলায় ওঠার সিঁড়ি, বারান্দা, নিলয়বাবুর ঘর সবকিছু ঠিকঠাক চিনতে হবে। তারপর…তারপর…।
আবার সেই ‘লকড রুম পাজল’-এ এসে ঠোক্কর খেলেন অশোকচন্দ্র।
একটা জানলার শার্সি সরিয়ে বাইরে বাগানের দিকে দেখলেন। বাউন্ডারি গেটের খানিকটা অংশ গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে চোখে পড়ছে। গাছের ডালে দুটো কাঠবিড়ালি ছুটোছুটি করছে।
এসিজি আপনমনে বললেন, ‘নিলয়বাবু যে মারা গেছেন সে ব্যাপারে কনফার্মড হওয়ার জন্যে ব্লান্ট ইনস্ট্রুমেন্ট আর গ্যারোটিং। বুঝলে, রঘুপতি—’ রঘুপতির দিকে ফিরে তাকালেন এসিজি। ছোট হয়ে আসা সিগারেটে শেষ টান দিয়ে বললেন, ‘এই খুন শুধু বিরক্তি আর ঘেন্না থেকে নয়—তার সঙ্গে হয়তো রাগও মিশে ছিল। যদি দেখা যায় যে, এই খুনটার পেছনে মোটিভ শুধু টাকাপয়সা বা বিষয়আশয়, তা হলে আমরা সেই মোটিভটাকে বলি ”মার্ডার ফর গেইন”। কিন্তু আমি সবদিক অ্যানালিসিস করে দেখলাম, তার সঙ্গে ”মার্ডার ফর রিভেঞ্জ” অ্যাঙ্গেলটাও জড়িয়ে আছে—।’
সিগারেটের টুকরোটা নিভে গিয়েছিল। ঘরে কোনও অ্যাশট্রে না থাকায় সেটা জানলা দিয়ে নীচের বাগানে ফেলে দিলেন এসিজি।
রঘুপতি বলল, ‘সবই তো বুঝলাম, স্যার, বাট মার্ডারার?’
‘হুঁ—মার্ডারার।’ এসিজি জানলার ফ্রেমের দিকে তাকালেন : ‘আচ্ছা, গলায় ফাঁস দেওয়া হয়েছে এই রাবার দিয়ে, তাই না?’ প্রশ্নটা করার সময় স্লাইডিং উইন্ডোর ফ্রেমের কিনারায় লাগানো রবারের ফিতের গায়ে আঙুল ছোঁয়ালেন।
‘হ্যাঁ, স্যার। মার্ডারের ব্যাপারটা হওয়ার রাফলি ফিফটিন ডেজ আগে এ-ঘরের তিনটে খিড়কিতে স্লাইডিং উইন্ডো লাগানোর হুকুম দেন মিস্টার মজুমদার। তো মিস্তিরিরা এসে সেই কাজ করে যায়। তারই স্পেয়ার রাবার টেপ হয়তো এ-ঘরে কোথাও পড়ে-টরে ছিল। তারই একটাকে মার্ডারার ইউজ করেছে…।’
এরপর স্টাডিরুমটা ঘুরেফিরে দেখলেন অশোকচন্দ্র।
ঘরটা মাপে ছোট। একটামাত্র জানলা—বাগানের দিকে। বাইরে বেরোনোর আর কোনও দরজা নেই।
ঘরে তিনটে বুক কেস। তাতে ভরতি বই। বেশিরভাগই সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং-এর বই—কংক্রিট, স্ট্রাকচার, কনস্ট্রাকশন ইত্যাদি বিষয় নিয়ে লেখা। তবে একটা বুক কেস নানান ধর্মগ্রন্থে ঠাসা। তার মধ্যে ভারতের সাধক, কৃত্তিবাসি রামায়ণ, কাশীদাসি মহাভারত ইত্যাদি বই রয়েছে।
রঘুপতির ফাইল থেকে জানা গেছে, নিলয় মজুমদার রোজ রাতে নিয়ম করে রামায়ণ অথবা মহাভারত সুর করে পাঠ করতেন। খুন হওয়ার দিনও তিনি মহাভারত পাঠ করেছিলেন। সাবিত্রী সেটা শুনেছে। ও তখন সারাদিনের কাজ সেরে বারান্দায় বিশ্রাম করছিল। আলো নিভিয়ে নিজের মোবাইল নিয়ে খুটুরখাটুর করছিল, এক তুতো বোনকে ফোন করছিল, এ-কথা সে-কথা বলছিল। তারই মধ্যে ও সেই সুর তুলে পাঠ করা শুনেছে। দাদুবাবা তখন পাশা খেলার জায়গাটা পড়ছিলেন। মাঝখানে পড়া থামিয়ে দিয়েছিলেন, কিন্তু পরে আবার পড়ছিলেন। নিলয় মজুমদারকে সাবিত্রী ‘দাদুবাবা’ বলে ডাকত।
‘চলো, রঘুপতি—এ-ঘরে আর দেখার কিছু নেই।’ হাতে হাত ঘষতে-ঘষতে নিলয় মজুমদারের বেডরুমে ফিরে এলেন বৃদ্ধ হুনুর। তারপর বললেন, ‘এবারে এ-বাড়ির চার বাসিন্দার সঙ্গে একটু কথা বলা যাক…।’
রঘুপতি বলল, ‘লেকিন গুপ্তাসাব, পুলিশ তো চারজনকে ভালোমতন ইনটারোগেট করেছে। সেসব ইনটারোগেশানের হার্ড কপি তো আমার ফাইলে ছিল—আপনি পড়িয়েছেন ভি…।’
