নিলয় খুন হয়েছেন রাত সাড়ে দশটা থেকে একটার মধ্যে। সেই সময় সাবি ঘুমিয়ে ছিল। আর তনয় মজুমদার, ওঁর স্ত্রী এবং প্রজেন বসু রায় তিনতলায় তাস খেলছিলেন। যেদিন নিলয় খুন হন তার পরদিন ভোর ছ’টা নাগাদ সাবি জানলার কাচের মধ্যে দিয়ে দেখতে পায় যে, নিলয় রক্তাক্ত অবস্থায় বিছানায় পড়ে আছেন। তখন ওর চেঁচামেচিতে তনয়, টুনি আর প্রজেন তিনতলা থেকে ছুটে আসেন। ওঁদের চেঁচামেচিতে তার পরপরই দু-চারজন প্রতিবেশী এসে জড়ো হন।
অশোকচন্দ্র নিলয়ের ঘরটা ঘুরে-ঘুরে দেখছিলেন। ঘরে একটা টেবিল, তিনটে চেয়ার। আর একটা ছোট্ট শো-কেস। সবই মামুলি স্ট্যান্ডার্ডের। রঘুপতি হাতের ফোল্ডারটা টেবিলে রেখে ওর স্যারের পাশে-পাশে ঘুরছিল আর খুনের বিষয়ে বকবক করে যাচ্ছিল।
এসিজি প্রথমে বিছানা পরীক্ষা করার পর জানলাগুলো খুঁটিয়ে দেখছিলেন।
ঘরে মোট তিনটে জানলা—দুটো বারান্দার দিকে, একটা বাইরের বাগানের দিকে। তিনটে জানলাই একরকম দেখতে। প্রতিটি জানলায় ঘরের ভেতরদিকটায় স্লাইডিং দুটো কাচের পাল্লা, আর তার বাইরে মোটা লোহার গ্রিল।
ঘরের বাগানের দিকের দেওয়ালে ফ্রেমে বাঁধানো চারটে রঙিন ফোটো ঝুলছে। ফোটোগুলো বেশ পুরোনো, আর তাদের বিষয় একই : মঞ্চে দাঁড়িয়ে নিলয় মজুমদার পুরস্কার জাতীয় কিছু একটা নিচ্ছেন।
নিলয় মজুমদার জানলা-দরজা সব বন্ধ করে ঘুমোতেন। ঘরে দশ বাই দশ ইঞ্চির তিনটে ভেন্টিলেটর বসানো থাকায় সাফোকেশানের কোনও ভয়-টয় ছিল না।
খুনের পরদিন ভোরবেলা তনয়বাবুরা দরজা ভেঙে নিলয়ের ঘরে ঢোকেন। তনয়, টুনি, প্রজেন এবং সাবিত্রী সবাই এটা কমফার্ম করেছে যে, ঘরের সব জানলা এবং দরজা ভেতর থেকে বন্ধ ছিল।
নিলয়বাবুর ঘরের দুটো দরজা। একইরকম দেখতে। শক্তপোক্ত। তার মধ্যে একটা দরজা ভাঙা। সেটা বাইরে থেকে ফিতে দিয়ে সিল করে দিয়েছে পুলিশ। অন্য দরজাটা দিয়ে এসিজি আর রঘুপতি যাদব নিলয় মজুমদারের ঘরে ঢুকেছেন।
রঘুপতি এবার ওর স্যারকে দরজা নিয়ে বলতে শুরু করল।
‘জানলার ডেসক্রিপশান তো আপনাকে আগেই দিয়েছি, স্যার।’ ভাঙা দরজাটার কাছে এগিয়ে যেতে-যেতে রঘুপতি বলল, ‘এবারে দরজার কেসটা দেখুন। যে-দরজাটা ভাঙা হয়েছে সেটা দিয়েই নিলয়বাবু অন্দর-বাহার করতেন। দেখুন, স্যার, এটার ছিটকিনিটা ভাঙা। মানে, রাতে শোয়ার সময় মিস্টার মজুমদার ছিটকিনি দিয়ে শুয়েছিলেন। বাইরে থেকে দরজা ভাঙার সময়ে এই ছিটকিনিটাও ভেঙে গিয়েছে।
‘অন্য দরজাটা—মানে, যেটা দিয়ে আমরা এ-ঘরে ঢুকলাম—সেটা মিস্টার মজুমদার ইউজ করতেন না। ওটা সবসময় বাইরে থেকে তালা দেওয়া থাকত। আর সেই তালার চাবি থাকত মিস্টার মজুমদারের কাছে। তো সেকেন্ড দরজাটা অ্যাজ ইউশুয়াল তালা দেওয়া অবস্থাতেই পাওয়া গিয়েছিল। ওটার চাবি পাওয়া গেছে বিছানায়, ডেডবডির পাশে।’
রঘুপতির কথায় সামান্য ফাঁক পেতেই এসিজি জানতে চাইলেন, ‘চাবিটা ভিকটিমের পাশে বিছানায় কেন পাওয়া গেল বলতে পারো? পুলিশ কি এর কোনও এক্সপ্ল্যানেশান খুঁজে পেয়েছে?’
‘না, স্যার—পায়নি।’ ডাইনে-বাঁয়ে মাথা নড়ল রঘুপতি।
ঘরে ঢোকার সময় অশোকচন্দ্র দেখেছেন, দ্বিতীয় দরজাটার বাইরে হাঁসকল লাগানো। তাতেই সবসময় ভারী তালা ঝোলানো থাকে। এখনও তাই ছিল। তবে সেই বন্ধ তালাটা কাপড় জড়িয়ে গালা দিয়ে সিল করা ছিল। ও. সি. নিজামুল হক একটু আগে সেই সিল ভেঙে দরজাটা এসিজিদের জন্য খুলে দিয়ে গেছেন। এখানকার তদন্তের পাট চুকে গেলে আবার সিল করে দেবেন।
‘তা হলে ব্যাপারটা কী দাঁড়াল?’ এসিজি মনে-মনে নিজেকে প্রশ্ন করলেন।
একটা দরজা ভেতর থেকে বন্ধ—যেটা ভেঙে সবাই ঘরে ঢুকেছে এবং নিলয়বাবুর মৃতদেহের মুখোমুখি হয়েছে।
দ্বিতীয় দরজাটা বাইরে থেকে বরাবর যেরকম হাঁসকল এঁটে তালা ঝোলানো থাকে সেরকমই ছিল। চাবি ছিল নিলয়বাবুর কাছে।
ঘরের তিনটে জানলারই স্লাইডিং কাচের পাল্লা আটকানো ছিল। শুধুমাত্র ঘরের ভেতর থেকে সেগুলো খোলা-বন্ধ করা যায়।
এই অবস্থায় মার্ডারার ঘরে ঢুকল কেমন করে? যদি নিলয়বাবু তাকে দরজা খুলে ঘরে ঢুকিয়ে থাকেন তা হলে ওঁকে খুন করার পর খুনি ঘর থেকে বেরিয়ে গেল কেমন করে? সব জানলা-দরজা ভেতর থেকে বন্ধ রেখে?
এইজন্যই রঘুপতি বলেছিল, খুনটাতে একটা ‘লকড রুম প্রবলেম’-এর ডায়মেনশন আছে।
এসিজি মনে-মনে ধাঁধাটা নিয়ে নাড়াচাড়া করতে লাগলেন আর একইসঙ্গে ঘরের অন্যান্য জিনিসপত্র খুঁটিয়ে দেখতে লাগলেন।
ঘরে একটা বড়সড় স্টিলের আলমারি। তার পাল্লা দুটো সামান্য খোলা। নিলয় মজুমদার মার্ডার হওয়ার পর এই আলমারিটা খোলা অবস্থায় পাওয়া গেছে। ইচ্ছে করে সেই অবস্থাতেই রেখে দেওয়া হয়েছে—যাতে ক্রাইম সিন ডিসটার্বড না হয়। এই আলমারি থেকে কিছু খোয়া গেছে বলে বাড়ির লোকেরা দাবি করেননি।
এসিজি পকেট থেকে একটা পেন নিয়ে সেটা দিয়ে খুব সাবধানে আলমারির একটা পাল্লা আরও একটু ফাঁক করলেন।
সেটা দেখে রঘুপতি হেসে বলল, ‘অত কেয়ার নেওয়ার দরকার নেই, স্যার। ফোরেনসিকের লোকজন অনেকদিন আগেই ওদের ডাস্টিং আর ফিঙ্গারপ্রিন্টের কাজ শেষ করে গেছে।’
পেন পকেটে রেখে দু-হাতে আলমারির দুটো পাল্লাই হাট করে খুলে দিলেন বৃদ্ধ গোয়েন্দা।
