গাড়িতে করে আসার সময় নিজামুল হক তাঁর ভিউপয়েন্ট থেকে গোটা কেসটার একটা সংক্ষিপ্ত রিক্যাপ অশোকচন্দ্র গুপ্তকে শুনিয়ে দিয়েছেন। এও বলেছেন, সরাসরি প্রমাণ-টমান না পেলেও তাঁর বিশ্বাস, এই মার্ডারের পিছনে প্রজেন বসু রায়ের ইনভলভমেন্ট আছে।
এ-কথায় অশোকচন্দ্র হেসে মাথা নেড়েছেন, বলেছেন, ‘পুলিশের ইনস্টিংট একটা ইমপরট্যান্ট ফ্যাক্টর। আপনার সন্দেহটা আমি মাথায় রাখলাম।’ মনে-মনে ভাবলেন, প্রজেন মজুমদার ফ্যামিলির ব্লাডকিন নয়—সেইজন্যই কি এই সন্দেহ?
এসিজিদের রিসিভ করার জন্য তনয় বাড়ির সদর দরজায় দাঁড়িয়ে ছিলেন। রঘুপতি ওঁকে এই স্পেশাল ভিজিটের দিনক্ষণ আগে থেকেই জানিয়ে দিয়েছিল। তা ছাড়া আজ গাড়ি থেকে নেমেই ওঁকে ফোন করে জানিয়েছে, ‘আমরা এসে গেছি—।’
টুকটাক পাখির ডাক শোনা যাচ্ছিল। অশোকচন্দ্র মুখ তুলে গাছের পাতা আর ডালপালার দিকে তাকিয়ে পাখিগুলোকে খুঁজছিলেন। ডাক শুনে অবশ্য কয়েকটাকে চিনতে পেরেছেন তিনি। শালিখ, বসন্তবৌরী আর বুলবুলি।
অশোকচন্দ্রের পাখি খোঁজার আগ্রহ দেখে নিজামুল হক একটু অবাক হচ্ছিলেন। সেটা লক্ষ করে রঘুপতি বলল, ‘চিড়িয়া স্টাডি করা স্যারের হবি। ফিজিক্স নিয়ে পড়াশোনা না করলে উনি অবশ্যই অরনিথোলজিস্ট হতেন…।’
হকসাহেব ভদ্রতার হাসি হেসে বললেন, ‘ভালো, ভালো। ডিটেকটিভদের দু-একটা স্পেশাল হবি থাকা দরকার।’
অশোকচন্দ্র হকসাহেবের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘জানেন তো, কোনও-কোনও হবি ইনভেস্টিগেশানে খুব হেলপ করে…।’
তনয় মজুমদার এইসব টুকরো কথা চুপ করে শুনছিলেন। ঠোঁটে একচিলতে হাসি। একটু ফাঁক পেতেই নিজের পরিচয় দিয়ে সৌজন্য বিনিময় করলেন। ও. সি. নিজামুল হকের দিকে তাকিয়ে পরিচিতের হাসি হাসলেন। হকসাহেবও পালটা হাসিতে জবাব দিলেন। বোঝা গেল, হকসাহেব তদন্তের খাতিরে এ-বাড়িতে বেশ কয়েকবার আসা-যাওয়া করেছেন।
নিজামুল হক উচ্চতায় খাটো গোলগাল মানুষ। মাথায় টাক, গালে কাঁচাপাকা চাপদাড়ি। গায়ের রং বেশ ময়লা। মুখে সবসময় হাসি লেগে আছে। ফলে ময়লা রঙের অন্ধকার হাসির আলো দিয়ে পুষিয়ে দিয়েছেন।
অশোকচন্দ্রের দিকে তাকিয়ে তনয় বললেন, ‘আপনার কথা ইনস্পেকটর যাদবের কাছে অনেক শুনেছি। আপনি তো ফিজিক্সের প্রফেসার…রাজাবাজার সায়েন্স কলেজে ছিলেন…।’
‘হ্যাঁ—’ সায় দিয়ে বললেন এসিজি, ‘কয়েকবছর হল রিটায়ার করেছি।’
‘ফিজিক্স খুব কঠিন সাবজেক্ট।’
এসিজি মোটেই বিনয় করে বললেন না, ‘না, না, কী আর এমন কঠিন!’ বরং বললেন, ‘হ্যাঁ, একটু কঠিন তো বটেই!’ তারপর মনে-মনে ভাবলেন, ‘যে কমার্স নিয়ে পড়াশোনা করে বি. কম. পাশ করেছে, তার কাছে ফিজিক্স তো লোহা কিংবা পাথরের মতো কঠিন হবেই!’
এসিজি তনয়কে লক্ষ করছিলেন।
ফরসা। একটু থলথলে চেহারা। বয়েস সাঁইতিরিশ কি আটতিরিশ। চোখে কালো ফ্রেমের আধুনিক চশমা। চশমার কাচের পিছনে থাকা চোখজোড়া যেন কিছু বলতে চায়। রঘুপতির ফাইলে তনয়ের ফোটোগ্রাফ দেখেও এসিজির ঠিক একই কথা মনে হয়েছিল।
তনয়ের পরনে সাদা পাজামা আর গাঢ় নীল রঙের টি-শার্ট। টি-শার্টের বুকের ওপরে বড়-বড় করে লেখা ‘Being Human’।
তনয়ের গা থেকে সিগারেটের হালকা গন্ধ পাচ্ছিলেন এসিজি। মনে-মনে হেসে ভাবলেন, ‘তনয় তা হলে আমারই মতো—স্মোকার। কিন্তু ও কোন ব্র্যান্ড খায়?’
এসিজি রঘুপতির দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘রঘুপতি, আমি নিলয়বাবুর বেডরুমে প্রথমে যেতে চাই। শুধু তুমি আর আমি। বাকিরা অন্য কোথাও ওয়েট করতে পারে…।’
নিজামুল হেসে বললেন, ‘মিস্টার গুপ্ত, আমাকে একটু আপনাদের সঙ্গে দোতলায় যেতে হবে—নিলয়বাবুর ঘরের দরজার সিলটা খুলে দেওয়ার জন্যে।’
‘অবশ্যই। চলুন।’ নিজামুলকে কথাগুলো বলে তনয়ের দিকে তাকালেন এসিজি : ‘আপনি আপনার রুমে গিয়ে ওয়েট করুন, তনয়বাবু—আমি দরকার মতো আপনাকে ডেকে নেব…।’
তনয় ‘থ্যাংক ইউ’ বলে দোতলায় যাওয়ার সিঁড়ির দিকে হাঁটা দিল।
হকসাহেব ভগবানকে সদর দরজায় মোতায়েন থাকতে বললেন। ওঁর হাত থেকে ফাইলটা চেয়ে নিলেন। রঘুপতির দিকে তাকিয়ে হেসে বললেন, ‘এটা আমার কাছে থাক। জাস্ট ইন কেস…।’
নিলয়বাবুর ঘরটা থেকে খুনের গন্ধ বেরোচ্ছিল। অন্তত অশোকচন্দ্রের তাই মনে হল।
বেশ বড় মাপের সাজানো-গোছানো ঘর। একদিকের দেওয়াল ঘেঁষে খাট। তার ওপরে বিছানা। এই বিছানাতেই নিলয়বাবুর বডি পড়ে ছিল। বৃদ্ধের পরনে ছিল সাদা স্যান্ডো গেঞ্জি আর ডোরাকাটা নীলচে পাজামা।
বিছানার চাদর ছিল রক্তমাখা। নিলয়ের গেঞ্জিতেও রক্ত লেগে ছিল। ওঁর মাথার পিছনে ভারী কোনও জিনিস দিয়ে আঘাত করেছিল খুনি। পরিভাষায় যাকে বলে ব্লান্ট ইনস্ট্রুমেন্ট। সেটার আঘাতে ওঁর মাথার পিছন থেকে এবং মুখ দিয়ে যথেষ্ট ব্লিডিং হয়েছে।
এ ছাড়া খুনি নিলয়ের গলায় রবারের ফিতের ফাঁস এঁটে মরণটান দিয়েছিল—স্লাইডিং উইন্ডোয় যে-রবারের ফিতের লাইনিং দেওয়া হয়, সেই ফিতে। তার টানে কোনও মানুষের দমবদ্ধ হয়ে মারা যাওয়াই স্বাভাবিক।
ফোরেনসিক অ্যানালিসিস আর পোস্ট মর্টেমের রিপোর্টে যা পাওয়া গেছে তাতে মাথার পিছনের আঘাত, নাকি গলার ফাঁস—ঠিক কোনটার জন্য নিলয় মজুমদার মারা গেছেন সেটা শতকরা একশো ভাগ নিশ্চিতভাবে বোঝা যায়নি। দুটোর যে-কোনও একটার জন্যই কোনও মানুষের মৃত্যু হতে পারে। যেমন, স্ট্র্যাংগুলেশানের জন্য হাইঅয়েড বোন ভেঙে গেছে, ল্যারিংস ড্যামেজ হয়েছে। অবশ্য বয়স্ক মানুষদের ক্ষেত্রে হাইঅয়েড ব্রিটল হয়ে যায় বলে মডারেট প্রেশারেই ভেঙে যায়।
