‘হ্যাঁ, তোমার কাছে সব শুনে-টুনে ইন্টারেস্টিং বলেই মনে হচ্ছে। তবে স্পট তো এখন আর হট নেই, ক্রাইমের এতদিন পর কোল্ড স্পট হয়ে গেছে।’
‘কী করব স্যার—ম্যাটারটা আমার হাতে এলই তো অনেক দেরি করে! এ ছাড়া…।’ কথার মাঝে থেমে গেল রঘুপতি।
‘এ ছাড়া কী?’ প্রশ্ন করলেন এসিজি।
‘এ ছাড়া মার্ডারটার মধ্যে একটা ”লকড রুম প্রবলেম” টাইপের ডায়মেনশন আছে…।’
‘বলো কী হে?’ অশোকচন্দ্রের চোখ জ্বলজ্বল করে উঠল আগ্রহে।
রঘুপতি জানে, কোন বিষয়ে ওর স্যারের স্পেশাল ইন্টারেস্ট।
‘স্যার, এবারে বলুন, কবে আপনার সময় হবে। সেইমতো লোকাল থানার ও. সি-কে আমি ইন্টিমেট করে রাখব।’
এসিজি ঘরের সিলিং-এর দিকে দেখলেন। ঘাড়ের পিছনে হাত নিয়ে ঝুলে পড়া চুলের গোছায় কয়েকবার টান মারলেন।
নিলয় মজুমদার হয়তো খিলখিটে দাপুটে অসৎ ব্যবসায়ী ছিলেন, কিন্তু ওঁর বেঁচে থাকার অধিকার ছিল। বরং মার্ডারারের ওঁর লাইফ টার্মিনেট করার অধিকার ছিল না। খুনের পদ্ধতি আর রঘুপতির বর্ণনা শুনে এসিজির মনে হয়েছে, খুনি যেন অহংকারে মদমত্ত হয়ে পুলিশ ডিপার্টমেন্টকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে বলছে, ‘কাম অন। সলভ দ্য মিস্ট্রি অ্যান্ড ক্যাচ মি ইফ ইউ ক্যান।’
এসিজি রঘুপতিকে বললেন, ‘রঘুপতি, সামনের রোববার সকাল ন’টা কি সাড়ে ন’টা নাগাদ আমরা মজুমদারদের বাড়িতে যাব। তুমি একটু আগাম খবর দিয়ে রেখো। সবাই যেন বাড়িতে থাকে। অবশ্য সানডেতে সবারই বাড়িতে থাকার কথা…।’
‘ও. কে., গুপ্তাসাব। তা হলে সেরকমই অ্যারেঞ্জমেন্ট করছি।’
রঘুপতি সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। ফাইলটা হাতে নিল।
সেটা দেখে বৃদ্ধ হুনুর বললেন, ‘উঁহু, উঁহু—ওই ফাইলটা রেখে যাও, রঘুপতি। ওটা উলটেপালটে দেখে আমি একটু হোমওয়ার্ক সেরে নেব। আমার কাজ হয়ে গেলে তোমাকে ফোন করে দেব। তুমি কাউকে পাঠিয়ে ফাইলটা নিয়ে যেয়ো—।’
‘ও. কে., স্যার।’ ফাইলটা টেবিলে আবার নামিয়ে রাখল রঘুপতি।
‘ওতে মজুমদার-বাড়ির সবার স্টেটমেন্ট আছে তো?’
‘বিলকুল হ্যায়, স্যার। সঙ্গে ইচ অ্যান্ড এভরিবডির ফোটোগ্রাফভি আছে।’
‘আর ক্রাইম সিনের ফোটো…?’
‘সেও আছে, স্যার। একটা-দুটো ফোটো নয়, অনেক ফোটোগ্রাফ। ক্রাইম সিনের নানান অ্যাঙ্গেল থেকে ফোটো। এভিডেন্সের ফোটো। বাড়ির নানান পোরশানের ফোটো। প্রত্যেকটা রুমের পিকচার—সব আছে, স্যার।’
‘গুড—ভেরি গুড।’
‘তা হলে ওই কথাই রইল, স্যার। নেক্সট সানডে।’
‘ইয়েস—নেক্সট সানডে।’
‘এই চিড়িয়াটাকে যে করে হোক খাঁচায় ঢোকাতে হবে, স্যার।’
এসিজি খুনি কিংবা অপরাধীকে প্রায়ই পাখির সঙ্গে তুলনা করেন। সেইজন্যই রঘুপতি পাখিকে খাঁচায় ঢোকানোর কথা বলল।
অশোকচন্দ্র হেসে বললেন, ‘সিনসিয়ার চেষ্টা তো করব, রঘুপতি। কিন্তু জানো তো, খুন অতি জঘন্য কাজ—বাট খুনি ধরার কাজটা আরও জঘন্য…।’
নিলয় মজুমদারের বাড়ির নাম যদি ‘নিলয় নিবাস’ হয় তা হলে টেকনিক্যালি আপত্তি করার কিছু না থাকলেও গ্র্যামাটিক্যালি বোধহয় আছে। তা ছাড়া নামকরণের প্রবণতা দেখে এটা মনে হওয়াটা কিছু অস্বাভাবিক নয় যে, নিলয় মজুমদার আত্মপ্রচার ভালোবাসতেন। সেইজন্যই ওঁর প্রতিষ্ঠানের নাম ‘নিলয় কনস্ট্রাকশনস’ এবং বাড়ির নাম ‘নিলয় নিবাস’। ভদ্রলোক বোধহয় কম-বেশি মেগালোম্যানিয়াক ছিলেন।
রং চটে যাওয়া লালচে-গোলাপি তিনতলা বাড়িটার দিকে তাকিয়ে এসিজি মনে-মনে এইসব কথাই ভাবছিলেন।
বেশ উঁচু বাউন্ডারি ওয়াল দিয়ে ঘেরা বনেদি ঢং-এর বাড়ি। বাড়ির লাগোয়া মাঝারি মাপের বাগান। বাগানে কয়েকটা বড়-বড় গাছ অগোছালোভাবে দাঁড়িয়ে রয়েছে। এ ছাড়া ছোট-ছোট দু-চারখানা ফুলগাছ। লাস্ট একমাস ধরে বলতে গেলে রোজই এক-দু পশলা বৃষ্টি হচ্ছে। ফলে বাগানের মাটি ভিজে স্যাঁতসেতে। বাগান পেরিয়ে বাড়ির দিকে যাওয়ার যে-সিমেন্ট বাঁধানো রাস্তা সেটা বেশ সরু এবং বাটিক প্রিন্টের মতো ফাটল ধরা।
বাগানের একপাশে পাঁচিল ঘেঁষে তিনটে ছাতারে পাখি চঞ্চলভাবে লাফিয়ে বেড়াচ্ছিল। এসিজিদের চারজনকে ঢুকতে দেখে চট করে উড়ে পালাল। সেখানে অনেকগুলো গাছের ডাল কেটে লম্বালম্বিভাবে স্তূপের মতো করে সাজিয়ে রাখা ছিল। ছাতারে পাখিগুলোর লাফালাফিতে দুটো ডাল গড়িয়ে পড়ল নীচে। এই ডালগুলো দিয়ে হয়তো বেড়া দেওয়া হবে অথবা ওগুলোকে জ্বালানি হিসেবে কাজে লাগানো হবে।
বাড়িটাকে দেখে বেশ শান্ত স্নিগ্ধ মনে হচ্ছিল। রোববারের সকালে যেন ছুটির দিনের আলসেমি গায়ে জড়িয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে।
বাউন্ডারি ওয়ালে গাঁথা প্রমাণ মাপের লোহার মেন গেট। তার একদিকের পিলারে সাদা পাথরের ফলক বসানো। তাতে কালো হরফে লেখা ‘নিলয় নিবাস’।
মেন গেট পেরিয়ে বাড়ির সদর দরজা। সদর দরজা ভেজানো থাকলেও খোলাই ছিল। তা ছাড়া সেখানে কোনও দারোয়ান বা সিকিয়োরিটি গার্ড মোতায়েন ছিল না। হয়তো সেরকম প্রয়োজন নেই বলেই।
সবার প্রথমে রঘুপতি যাদব দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকল। ওর পিছন-পিছন অশোকচন্দ্র গুপ্ত। তারপর ঢুকলেন নিউ আলিপুর থানার ও. সি. নিজামুল হক। আর তাঁর সঙ্গী থানার একজন কনস্টেবল ভগবান মিস্ত্রি।
ভগবান উর্দি পরে থাকলেও রঘুপতি এবং নিজামুল হক সাদা পোশাকে এসেছেন। রঘুপতির হাতে একটা প্লাস্টিকের ফোল্ডার—তার মধ্যে নিলয় মজুমদারের মার্ডার ইনভেস্টিগেশানের জরুরি কাগজপত্র আর ফোটোগ্রাফ। তবে ও. সি. হকসাহেবের হাত খালি, কারণ, তাঁর কাগজপত্রের ফাইলটি ভগবান মিস্ত্রি বহন করছেন। সেটা দেখে এসিজির মনে হয়েছে, সত্যিই ভাগ্যবানের বোঝা ভগবান বয়!
