তনয় মজুমদারের বয়েস এখন সাঁইতিরিশ-আটতিরিশ মতন। বিয়ে করেছেন। স্ত্রীর নাম টুনি মজুমদার। বিয়ের আগে মডেলিং করতেন। এখনও সেই অভ্যাস ধরে রেখেছেন। ফ্যাশান নিয়ে বেশ ইন্টারেস্ট আছে। বড়লোকের বউ-টউ হলে যা হয়! রাসবিহারী অ্যাভিনিউতে একটা বুটিক আছে। সেখানে প্রিমিয়াম প্রাইস ট্যাগ লাগানো সব প্রিমিয়াম আইটেম বিক্রি হয়।
একটাই ফাঁকা জায়গা রয়েছে টুনি আর তনয়ের লাইফে—ওঁদের কোনও ছেলেমেয়ে নেই। যদিও দশবছর হল বিয়ে হয়েছে।
নিলয়বাবুর পার্সোনাল দেখাশোনার জন্য কাজের মেয়ে রয়েছে সাবি—মানে, সাবিত্রী। বিয়ে হয়ে গেছে বাট হাজব্যান্ড চারবছর ধরে লাপাতা। সাবির বয়েস তিরিশ-টিরিশ হলেও আরও ইয়াং দেখায়। তা ছাড়া দেখতেও বেশ সুন্দরী—মানে, কাজের মেয়ের পক্ষে। সাবি রাতে নিলয়বাবুর বাড়িতেই থাকে। নিলয় মজুমদারের ঘরের লাগোয়া লম্বা-চওড়া বারান্দা আছে। বারান্দাটা ওয়েল প্রোটেক্টেড—মোটা গ্রিল দিয়ে ঘেরা। সাবি রাতে সেখানেই শোয়।
নিলয়ের বাড়িটা তিনতলা। একতলায় রয়েছে দুটো গেস্টরুম আর কমন বাথরুম, তার সঙ্গে কলতলা।
দোতলায় নিলয়বাবুর দুটো ঘর—বেডরুম আর স্টাডি—পাশাপাশি। দুটো ঘরের মাঝে যাতায়াতের দরজা রয়েছে। স্টাডিতে ঢুকতে হলে নিলয়বাবুর বেডরুম দিয়ে ঢুকতে হয়। এ ছাড়া দোতলায় ছোট্ট একটা ড্রয়িংরুম মতন রয়েছে—সেটা কমন, সবাই ইউজ করে। ব্যস, দোতলায় নিলয়বাবু ছাড়া আর কেউ থাকে না। তনয়বাবু অনেকবার এই একা থাকা নিয়ে খিচিরখিচির করলেও নিলয় মজুমদার সেসব কথা কানে ঢোকাননি। তনয় এ নিয়ে কখনও জোরজবরদস্তি করতে পারেননি কারণ, নিলয় মজুমদার ওয়াজ দ্য বস। বয়েস চুয়াত্তর হলেও তাঁর কথাতেই সবাই চলত—মানে, চলতে হত। কারণ, বাড়ির মালিক তিনি, কোম্পানির মালিক তিনি। বরাবরই ওঁর বিহেভিয়ার একটু রুক্ষ, বস টাইপের—তার ওপর বছর দেড়েক আগে ওঁর ওয়াইফ এক্সপায়ার করার পর থেকে উনি আরও বেশি খিটখিটে হয়ে পড়েন। এ-কথা তনয় মজুমদার, টুনি মজুমদার যেমন জানিয়েছেন, তেমনই সাবিত্রীর কাছ থেকেও একই টাইপের কমেন্ট পাওয়া গেছে। মানে, বেসিক্যালি নিলয়বাবু বদমেজাজি ছিলেন। তাই সবাই ওঁকে খুব সমঝে চলত।
এরপর আসছে ও-বাড়ির লাস্ট মেম্বারের কথা। প্রজেন বসু রায়। বয়েস তেতাল্লিশ। ভেরি ইন্টারেস্টিং ক্যারেকটার। উনি নিলয়বাবুদের কোনও ব্লাড রিলেশান নন, বাট ও-বাড়িতে পারমানেন্টলি থাকতেন—আই মিন, থাকেন।
তিনতলায় তনয় মজুমদার আর টুনি মজুমদার থাকেন। প্রজেন থাকেন ওঁদের পাশের ঘরেই। আর উনি হলেন ‘নিলয় কনস্ট্রাকশনস’-এর ম্যানেজার এবং টুয়েন্টি পারসেন্টের পার্টনার। প্রজেনের বাবা-মা নেই। অরফ্যান। ওঁর বাবা ব্রজেন বসু রায় যাদবপুর ইউনিভারসিটিতে নিলয় মজুমদারের ক্লাস মেট ছিলেন। শুধু ক্লাসমেট নয়, খুব বন্ধু ছিলেন দুজনে।
এ রকম সময়ে রঘুপতি যাদবের কাহিনির স্রোতকে বাধা দিয়েছিলেন অশোকচন্দ্র।
‘এই ব্যাপারটা কি ভীষণ আনইউশুয়াল নয়, রঘুপতি?’ রঘুপতির দিকে প্রশ্নভরা চোখে তাকালেন এসিজি। ভুরু উঁচিয়ে সেরকম ইশারাও করলেন : ‘যতই বন্ধুর ছেলে হোক, যতই অনাথ হোক, তাকে সরাসরি নিজের বাড়িতে নিয়ে এসে পারমানেন্টলি থাকতে দেওয়াটা বেশ বেসুরো লাগছে…।’
রঘুপতি হেসে বলল, ‘গুপ্তাসাব, এই কাহানিটাই আপনাকে বলতে যাচ্ছিলাম। নিলয় মজুমদার যখন নিজের কোম্পানি খোলেন তখন ব্রজেন বসু রায়কে ডেকে নিয়ে এসে এইটি-টুয়েন্টির পার্টনার করে নেন। ওঁদের কাজকর্ম ভালোই চলছিল। কিন্তু বাইশ-তেইশ সাল পহেলে একটা হাদসা হয়। তখন ওঁরা কাশীপুর এরিয়ায় একটা ছোট ফ্লাইওভার বানাচ্ছিলেন। কনস্ট্রাকশন যখন ফিফটি কি সিক্সটি পার্সেন্ট মতন হয়েছে তখন একদিন লগভগ রাত এগারোটার সময় ওটা সাডেনলি ভেঙে পড়ে। ওই অ্যাক্সিডেন্টে তিনজন মারা গিয়েছিল। তাদের মধ্যে একজন ছিলেন ব্রজেন বসু রায়। তিনি সেসময়ে সাইটে ছিলেন। ব্যাড লাক। তখন ওঁর ছেলে প্রজেনের বয়েস অ্যাবাউট টুয়েন্টি ইয়ার্স।
‘ওই অ্যাক্সিডেন্টটা নিয়ে এফ. আই. আর. হয়েছিল। পুলিশ-কেসও হয়েছিল। কিন্তু নিলয় মজুমদার শেষ পর্যন্ত রিহা হয়ে যান। ইনভেস্টিগেশানে এটা জানা গিয়েছিল যে, ফ্লাইওভার কনস্ট্রাকশনের মেটিরিয়াল ”বি” গ্রেডের ছিল। বাট সেটার জন্যে নিলয়বাবুর কোম্পানি যে ডিরেক্টলি রেসপনসিবল সেটা প্রূভ করা যায়নি। কারণ, বিল্ডিং মেটিরিয়াল পারচেজের যেসব পারচেজ বিল উনি দেখিয়েছিলেন সেগুলো সবই ছিল ”এ” গ্রেড মেটিরিয়ালের বিল। কিন্তু পাবলিকের সন্দেহ যায়নি। এর পরেও নিলয় মজুমদারের কোম্পানির নামে কখনও-কখনও কনস্ট্রাকশনে চিটিং-এর রিপোর্ট হয়েছে…।’
‘তার মানে, প্রজেন বসু রায়কে এরকম একটা ফেভার দেওয়া হয়েছে অ্যাজ কমপেনসেশান?’
‘শুধু কমপেনসেশান নয়, স্যার—তার সাথ-সাথ গিল্ট কমপ্লেক্সও হয়তো আছে। সেটা এখন আর আমরা প্রূভ করতে পারব না। আওয়ার ব্যাড লাক।’
আরও অনেকক্ষণ ধরে রঘুপতির সঙ্গে কথা বললেন এসিজি। রঘুপতি বারবার যেটা ইমপ্রেস করতে চাইল সেটা হল, এই মার্ডার মিস্ট্রিটা বেশ কমপ্লেক্স আর ইন্টারেস্টিং।
‘আপনার মতো ”থিংকিং মেশিন”-এর এটা ক্র্যাক করতে বেশ মজা লাগবে, স্যার।’ সবকিছুর শেষে রঘুপতি যাদব মন্তব্য করল। তারপর : ‘আমার সঙ্গে একদিন চলুন, স্যার। স্পটটা একটু ঘুরেফিরে দেখবেন, ক্যারেকটারগুলোর সঙ্গে বাতচিত করবেন, ওদের নেড়েচেড়ে দেখবেন…।’
