আর তখনই ঊর্মিলার কথা মনে পড়ল। ও সামনে থাকলে কিছুতেই বাবাকে সিগারেট ধরাতে দিত না। ভাগ্যিস তিনবছর আগে ওর বিয়ে হয়ে গেছে!
সিগারেট খাওয়া নিয়ে এখন অশোকচন্দ্রকে বকাঝকা করার কেউ নেই। স্ত্রী মালিনী প্রায় এগারো বছর হল অসুস্থ কিডনির কাছে ইনিংসে হেরে গিয়ে আকাশের তারা হয়ে গেছে। মালিনী সিগারেট খাওয়া নিয়ে ছোট্ট-ছোট্ট কিন্তু মিষ্টি আপত্তি জানাত। এসিজি ওকে খুশি করতে বহুবার সিগারেটের নেশা ছাড়তে চেষ্টা করেছেন, কিন্তু ওই—যা হয়!
মালিনীর তুলনায় ঊর্মিলা ছিল একেবারে জঙ্গি সিগারেটবিরোধী। নেহাত অশোকচন্দ্র ওর বাবা বলে ঊর্মি শারীরিক শাস্তি দেওয়ার পদক্ষেপ নিতে পারেনি। নইলে কী যে হত কে জানে!
একেবারে ছাড়তে না পারলেও অশোকচন্দ্র সিগারেট খাওয়ার ব্যাপারটা পঁচাত্তর পার্সেন্ট কমিয়ে দিয়েছেন। একসময় দিনে তিনি আট প্যাকেট সিগারেট খেতেন, এখন মাত্র দু-প্যাকেট।
সিগারেট ধরিয়ে মনের সুখে গভীর টান দিলেন। ধোঁয়া ছাড়লেন এবং বুদ্ধির গোড়ায় ধোঁয়া দিলেন। চশমার কাচের ফাঁক দিয়ে রঘুপতি যাদবের মুখের দিকে ভাবনা-বিভোর চোখে দেখলেন একবার। চোখের চশমাটা একটু নেড়েচেড়ে নাকের গোড়ায় ঠিকঠাক করে বসালেন। তারপর তাকালেন খোলা জানলার দিকে। সেই সকাল থেকেই বৃষ্টি চলছে তো চলছেই। এখন বেলা এগারোটা দশ। বৃষ্টি আজ বারোটা বাজাবেই!
নিলয় মজুমদারের খুনের ঘটনাটা বেশ ইন্টারেস্টিং আর অন্যরকম। এতক্ষণ ধরে ইনস্পেকটর রঘুপতি যাদবের কাছে শোনা বিবরণ আর বর্ণনার কথাগুলো মনে-মনে রিক্যাপ করছিলেন অশোকচন্দ্র গুপ্ত। এই মার্ডার মিস্ট্রিটা এমন যে, লোকাল থানার পুলিশ বারবার হোঁচট খেয়ে আটকে গেছে। সেইজন্যই ব্যাপারটা গড়িয়ে গেছে লালবাজার পর্যন্ত—মানে, লালবাজারের হোমিসাইড স্কোয়াড পর্যন্ত। এবং সবশেষে এই খুনের সমস্যাটা এসে আশ্রয় নিয়েছে রঘুপতি যাদবের কোলে।
নিজের কোল থেকে সমস্যাটা এসিজি স্যারের কোলে ট্রান্সফার করবে বলে রঘুপতি আজ সকাল সাড়ে ন’টার পরপরই এসে হাজির হয়েছে ওর প্রাক্তন স্যারের শ্যামবাজারের ফ্ল্যাটে।
বৃদ্ধ নিলয় মজুমদার খুন হয়েছেন পঁচিশ দিন আগে—গত মাসের বাইশ তারিখে। কিন্তু পুলিশ এই খুনের কিনারা করা তো দূর অস্ত কাউকে অ্যারেস্ট পর্যন্ত করতে পারেনি।
রঘুপতির কোলে খোলা রয়েছে একটা মোটা ফাইল—নিলয় মজুমদারের কেস ফাইল। এতক্ষণ ধরে সেটা কনসাল্ট করেই গোটা কেস হিস্ট্রিটা ও এসিজি স্যারকে শুনিয়েছে।
ফাইলটা পড়ার জন্য রঘুপতি চোখে রিডিং গ্লাস লাগিয়েছে। বয়েসটা চল্লিশ পেরোলেও চেহারা ভীষণ শক্তপোক্ত। চোয়ালের রেখা এবং চোখ বলে দিচ্ছে, নিজের শারীরিক শক্তির ওপরে ওর আস্থা নেহাত কম নয়।
রঘুপতির ঠোঁটের ওপরে কাঁচাপাকা গোঁফ। মুখে বসন্তের দাগ। মাথার চুল ছোট করে ছাঁটা। রাজাবাজার সায়েন্স কলেজে ফিজিক্স নিয়ে এম. এসসি. পড়ার সময় ও ‘স্যার’ হিসেবে এসিজিকে পেয়েছিল। তখন থেকেই স্যারের অ্যানালিটিক্যাল বুদ্ধির সঙ্গে ওর সরাসরি পরিচয়।
এখন স্যারের ফ্ল্যাটের ড্রয়িংরুমে ওরা দুজনে দুটো সোফায় মুখোমুখি বসে রয়েছে। ওদের মাঝখানে নীচু টি-টেবিল। টেবিলে দুটো খালি কফির কাপ আর স্ন্যাক্সের প্লেট। প্লেটে কয়েকটা লেফট ওভার বিস্কুট পড়ে রয়েছে।
রঘুপতির গায়ে সাধারণ পোশাক—তাতে কোনও পুলিশি ছাপ নেই। ওর প্যান্টের নীচের দিকটা ভেজা। গাড়ি থেকে নেমে স্যারের বিল্ডিং-এ ঢোকার সময় বৃষ্টির ছাট এই কাণ্ডটা করেছে। হাতের ছাতা মাথা বাঁচালেও পা পুরোপুরি বাঁচাতে পারেনি।
রঘুপতি যাদব ওর প্রাক্তন স্যারের দিকে তাকাল। স্যার এখন পুরোদস্তুর ‘মিস্টার হোয়াইট’। গায়ে সাদা রঙের পাঞ্জাবি-পাজামা। মাথায় লম্বা-লম্বা সাদা চুল। আর স্যারের মাথা ঘিরে ভেসে বেড়াচ্ছে সিগারেটের সাদা ধোঁয়া।
অশোকচন্দ্র রঘুপতি যাদবের দিকে চোখ খুলে এক-একবার দেখছেন, আবার কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ করে আপনমনে কী ভাবছেন।
এসিজি রঘুপতির বর্ণনা আর বিবরণের কথাই ভাবছিলেন। শুরু থেকে শুরু করে কেস হিস্ট্রিটা মনে-মনে খতিয়ে দেখছিলেন। রঘুপতি যাদবের কথাগুলো যেন আবার শুনতে পাচ্ছিলেন।
কলকাতার নিউ আলিপুর অঞ্চলে নিলয় মজুমদারের তিনতলা বাড়ি। জায়গাটা নিউ আলিপুর হলেও অঞ্চলটা নিতান্তই মধ্যবিত্ত এলাকা।
নিলয় মজুমদার সেলফ মেড ম্যান। ছোটবেলায় বাবা-মা-কে হারিয়েছেন। কাকার কাছে মানুষ। অনেক কষ্ট সহ্য করে, পরিশ্রম করে, পড়াশোনা করে বড় হয়েছেন। যাদবপুর ইউনিভারসিটি থেকে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করেছেন সসম্মানে, ভালো রেজাল্ট করে। প্রথম জীবনে আট বছর মতন চাকরি করার পর ‘নিলয় কনস্ট্রাকশনস’ নামে নিজের কনস্ট্রাকশন কোম্পানির শুরুওয়াত করেন। সময়ের সঙ্গে-সঙ্গে তাঁর কোম্পানি ধাপে-ধাপে বড় হয়েছে। অনেক বড়-বড় টাউনশিপ তৈরি করেছেন। রেলওয়ের গুরুত্বপূর্ণ নানান প্রজেক্টের দায়িত্ব পেয়েছেন। প্রায় তিরিশ বছর ধরে রাজ্য সরকারের কনট্রাক্টরদের তালিকায় ‘নিলয় কনস্ট্রাকশনস’ একজন নামিদামি বিল্ডার।
চৌষট্টি বছর বয়েসে নিলয়বাবুর হঠাৎ হার্ট অ্যাটাক হয়। তখন তিনি একটু ভয় পেয়ে যান। তাই স্ত্রীর পরামর্শে ব্যবসা থেকে সরে দাঁড়ান। ওঁদের একমাত্র ছেলে তনয় মজুমদার—তাঁর কোনও বোন-টোন নেই। তনয় সাধারণ বি. কম. পাশ। কিন্তু পঁচিশ-ছাব্বিশ বছর বয়েস থেকেই নিলয় ওঁকে ব্যবসায় টেনে নেন। তনয়ের ব্যবসাবুদ্ধি নিয়ে নিলয়বাবুর সিরিয়াস অভিযোগ ছিল, বাট উপায় কী—হাজার হলেও ছেলে এবং ওনলি চাইল্ড!
